হায়রে আমার দেশের ‘বখে’ যাওয়া শিশুরা

জেসমিন চৌধুরী: গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছি সোশাল ওয়ার্কারের জন্য। পুলিশ বিভাগের একজন প্রতিনিধি ইতিমধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছেন। বিপথগামী এক কিশোরীকে শোধরানোর জন্য চলছে আমাদের সযত্ন এবং নিরলস প্রচেষ্টা। এই নিয়ে দু’বার ডাক পেয়েছি এই পরিবারের জন্য ভাষান্তরের কাজ করতে, আরো কতবার আসতে হবে কে জানে!

বিকেলের মিঠে রোদের ওম আর রাস্তার পাশের লোহার বেড়ার উপর দিয়ে নুয়ে পড়া ওক গাছের ছায়ায় বসে অপেক্ষা করতে করতে দূরের খাড়া হয়ে থাকা পপলার গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনটা কেমন যেন করে উঠে। ম্যানচেস্টার নগরীর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরটাও এতো সাজানো, এতো সুন্দর, চারপাশের চকচকে সবুজে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বাচ্চা মেয়েটার কথা ভাবি। এতো সুন্দরের মাঝে থেকেও কারো জীবন এতো অসুন্দর হয়ে যায় কী করে?

Jesmin Chowযে বাসায় কাজ করতে এসেছি তার দরজার ঠিক সামনেই ফুলে ফুলে নুয়ে পড়া বিশাল ম্যাগনোলিয়া গাছটা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে। যেন বলতে চায়, বেশি ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলেই কি হবে? আমার অবিশ্বাসী বাঙ্গালী মন মানতে চায় না।  

কী অসভ্য একটা মেয়েরে বাবা! আবারও তার মুখোমুখি হতে হবে ভাবতেই গা শিউরে উঠে আমার। অবশ্য মুখোমুখি বলছি কেন, গতবার পুলিশ, সোশাল ওয়ার্কার, ফ্যামিলি ওয়ার্কার আর আমি ইন্টারপ্রেটার- চারজন মিলেও তাকে তার শোবার ঘর থেকে বের করে আনতে পারিনি। সেখানে বসেই সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে তার মাকে গালিগালাজ করছিল আমাদেরকে ঘরে ঢুকতে দেয়ার জন্য, ‘আই নো হোয়াই ইউ লেট দেম ইন। ইউ ডোন্ট ফ*** কেয়ার এবাউট মাই এডুকেশন। ইউ জাস্ট ডোন্ট ওয়ান্ট টু পে দ্য ফাইন’।  

মাত্র পনেরো বছরের মেয়েটি। তার বাবা জেল খেটে খেটেই পার করেছেন জীবনের বেশির ভাগ সময়, এখন কোথায় আছেন কেউ জানে না। এই পনেরো বছরের জীবনে হেন কাজ নেই যা এই মেয়ে করেনি। তাকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান তার আপাতঃ শান্ত স্বভাবের বেচারি গোছের মা। হিমশিম খায় পুলিশ আর সোশাল ওয়ার্কাররাও। মা মনে করেন, বাংলাদেশে থাকলে পিটিয়ে ঠিক করে ফেলা যেতো এই মেয়েটাকে, এখানের কড়া আইন কানুনের জন্য কিছু করা যাচ্ছে না। সোশাল ওয়ার্কাররা ভাবে মায়ের দুর্বলতা, অসঙ্গত আচরণ আর ‘পুওর প্যারেন্টিং’ ই মেয়ের এই পরিণতির কারণ।   

তো দোষ যারই হোক, আর আমি ম্যাগনোলিয়ার মুচকি হাসি উপেক্ষা করে যতই নেতিবাচক কথা ভাবি না কেন, আমিও জানি এই মেয়েও সম্ভবতঃ ঠিক হয়ে যাবে। তাকে সাহায্য করার জন্য এই যে সবার এতো প্রচেষ্টা, তা বৃথা না যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ এই প্রচেষ্টার পেছনে রয়েছে একটি সুপরিকল্পিত এবং পরীক্ষিত ব্যবস্থা।

Japan 1এখানে পিটিয়ে বাচ্চাদেরকে ঠিক করার চেষ্টা করা হয় না। আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হয় বাচ্চাগুলোকে বেশি বেশি আহ্লাদ দিয়ে নষ্ট করা হচ্ছে, কিন্তু এদের উপর নীতিবোধ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় না বলেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সত্যিকারের নীতিবোধ জন্ম নেয় একসময়।  যদিও দেখা যায় টিনএজাররা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ উশৃংখল, বড় হতে হতে তাদের বেশির ভাগই ভাল-মন্দের ব্যবধান শিখে যায়, নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শেখে।

এ দেশের সরকার স্কুলের প্রতিটি বাচ্চার শিক্ষার জন্য বছরে গড়ে পাঁচ থেকে দশ হাজার পাউন্ড খরচ করে। লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়া বা স্পেশাল নিড বাচ্চাদের জন্য খরচ হয় আরো অনেক বেশি। আর আমাদের ভাষায় ‘বখে যাওয়া’ বাচ্চাদের জন্য বখে যাওয়ার মাত্রা অনুযায়ী মাথা পিছু খরচ হয় তার দ্বিগুণ, তিনগুণ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মা-বাবাকে সহযোগিতা করতে গিয়ে খরচ হয় আরো বহু অর্থ, সময় এবং প্রচেষ্টা। তার ফলে তাদের অনেকেই আবার এক পর্যায়ে সঠিক পথে ফিরে আসতে পারে, মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।

যা’ই হোক, সোশাল ওয়ার্কার আসার পর আমরা দুরু দুরু বুকে দরজায় নক করি। মা দরজা খুলে দিলে ভেতরে গিয়ে বসি। মা জানান মেয়ে বাড়ি নেই। সে জানতো আমরা আসছি, কিন্তু আমাদের সাথে কথা বলে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চায় না, তাই বেরিয়ে গেছে।

সোশাল ওয়ার্কার মা’কে কুশলাদি জিজ্ঞেস করার পর ডায়েরির কথা জানতে চায়। সে আগের বার মা’কে বলেছিল উল্লেখযোগ্য  সব দৈনন্দিন ঘটনা ডায়েরিতে লিখে রাখতে। মা বেচারি ইংরেজি তো পারেনই না, বাংলাও লিখেন অনেক কষ্টে।

তার সেই হিজিবিজি বাংলার যেটুকু সম্ভব আমি ইংরেজিতে পড়ে শোনালাম। শুনে সোশাল ওয়ার্কার জানতে চাইলো,

‘সবই তো দেখছি সমস্যার কথা। ভাল কিছুই কি ঘটেনি গত দুই সপ্তাহে?’

মা আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘ভালগুলাও কি লিখতে হবে?’

সোশাল ওয়ার্কার বলল, ‘অবশ্যই। ভালগুলাই বেশি করে লিখতে হবে। তোমার মেয়েটা এতো সমস্যায় আছে, নিজে কষ্ট পাচ্ছে, সবাইকে কষ্ট দিচ্ছে, এর মধ্যে যদি সে ভাল কিছু করে থাকে, তা যতো সামান্যই হোক, তা আমাদেরকে এপ্রিশিয়েট করতে হবে। তাকে এভাবেই জানাতে হবে আমরা তার ভালো চাই।’

মা বললেন, ‘ভাল কিছু তো সে কখনো করে না।’

সোশাল ওয়ার্কার আশ্চর্য হয়ে বললো, ‘এটা তো হতে পারে না। সে যদি শান্ত হয়ে একবেলা টেবিলে বসে ভাত খায়, বা মায়ের সাথে পাঁচ মিনিট চিৎকার না করে কথা বলে, সেটাকেও ভালো কাজ হিসেবে এপ্রিশিয়েট করতে হবে।’

তারপর পুলিশের মহিলাটি মা’কে জানালেন ঊনার সাথে এক একান্ত সাক্ষাতে বলা তার মেয়ের কিছু গভীর অনুভূতির কথা। মেয়েটিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তার জীবনের ভাল আর মন্দ দিকগুলো কী, সে উত্তর দিয়েছিল, ভালো কোনো দিকের কথা সে মনে করতে পারছে না, কিন্তু ঘরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বাবার টুকটাক জিনিসগুলো তাকে বাবার হাতে মার খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়, সে ভাবে তার অনুভূতির প্রতি তার মায়ের কোনো শ্রদ্ধা নেই, কিন্তু সব কিছুর পরও মা তার জীবনে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। মায়ের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকলে তার ভালোই লাগতো।

শুনে মা আঁচল তুলে চোখ মুছলেন। কী অসাধারণ ভাবে পুলিশ মহিলাটি মা আর মেয়েকে কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করছে দেখে আমারও চোখ ভিজে উঠলো।

একটা ভীষণভাবে বখে যাওয়া মেয়ের গভীর অনুভূতির কথাও এখানে কী গুরুত্বের সাথে শোনা হয়, তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তার নিজেরই বক্তব্য। তার হাজারো অগ্রহণযোগ্য কাজের ভীড়ে প্রশংসার অজুহাত খোঁজা হয়। সবকিছুর পরও সে যে একটা মানুষ, সেকথা মনে রাখা হয়।

অনুবাদ করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস লুকোলাম।

আমার দেশের ‘বখে যাওয়া’ বাচ্চাদের কথা মনে হলো। হায়রে আমার দেশের অসহায় শিশুরা, কী ভাগ্য নিয়ে তারা জন্মেছিল। তাদের জীবনে সবকিছুই অধিকের খাতায়। আদরের আধিক্য, যত্নের আধিক্য, শাসন আর অপবাদেরও আধিক্য। অভাব শুধু ব্যালান্সের।

মা-বাবার জিপিএ ফাইভের স্বপ্ন পূরণ করতে দিনরাত ভারী ব্যাগ বয়ে টিচারের বাসায় ছুটাছুটি করে বেড়ানো বাচ্চাগুলো জিপিএ কথাটার মানে শেখারই সুযোগ পায় না। তা নিয়েও জাতির হাতে গঞ্জনা সইতে হয়। মা-বাবার মনমতো ভাল মানুষ হতে মসজিদ-মন্দিরে যায় তারা, আরবী পড়ে। কেউ কেউ সংস্কৃতিবান হতে গোমড়া মুখে গান, নাচ, আবৃত্তি শিখতে যায়। কিন্তু তারা নিজেরা কী চায় জীবনের কাছ থেকে, তা কেউ জানতে চায় না।

মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ আর নিজেদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার পথ পাকা করতে নিজেদের বর্তমানের পুরোটা সময়, শৈশবের আনন্দ, কৈশোরের উত্তেজনা বলী দিতে হয় তাদেরকে। তারপর যখন কিছু একটা ভুল হয়ে যায়, তাদেরকে সইতে হয় অপমান আর নির্যাতন। তাদের ভালোটা নিয়ে যখন কথা হয়, গৌরব হয় মা-বাবার আর শিক্ষকদের, কিন্তু ব্যর্থতার বোঝাটুকু বইতে হয় তাদেরকে একাই।  

এসব বাচ্চারা আত্মহত্যা করবে না তো কে করবে?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.