মনে নিতে, মনে রাখতে হবে যাকে

নবনীতা চৌধুরী: তখন একেবারে সদ্য কৈশোরে পা ফেলেছি। সালটা ১৯৯৪। ভিসিআর-ভিসিপির যুগ। ফিল্মফেয়ার থেকে বাড়ি এলো ‘ঊনিশে এপ্রিল’ নামে এক বাংলা সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট। পরিচালক কে, কী, তার চেয়ে বড় খবর- অপর্ণা সেন, দেবশ্রী আছেন এতে।

দেখার শুরুতেই চমক; প্রতিটি ঘর সুন্দর, চায়ের কাপ সুন্দর, ঘরে ঝোলানো পর্দা সুন্দর, তার সঙ্গে অদ্ভুত সৌন্দর্যের ঐক্য হয়তো বিছানায় পাতা চাদরটার। এতো সুন্দর করে তৈরি বাংলা ছবি কি দেখেছি কখনো আগে? কিন্তু কিছু বাড়াবাড়ি নয়, আরোপিত নয়। এমন বাড়িটা যেন হতে পারতো আমাদেরও। অতবার দ্যাখা অপর্ণা সেন বা দেবশ্রীকেও যেন একদম অন্যরকম করে পেলাম। নায়িকার বদলে তারা হয়ে উঠলেন দু’জন সুন্দর, সাবলীল, নিজস্ব মত আর বোধসম্পন্ন মানুষ।

Rituporno 4এক ভীষণ সুন্দর আর স্নিগ্ধ প্রেক্ষিতে একটা জটিল গল্প চলতে থাকল ‘ঊনিশে এপ্রিল’-এ। ক্লাস সেভেনে পড়া আমি একদম বদলে গেলাম ওই এক ছবি দেখে। ছবিতে যে অপর্ণা (সরোজিনী) নাচ এতো ভালোবাসেন, এতো ভালো পারেন, যার জন্যে এতো খ্যাতি, এতো ভালোবাসা – শুধু প্রকৃতির বিচারে মেয়ে হয়েছেন, আর মা হয়েছেন বলে সব ছেড়েছুড়ে শুধু সংসার আর সন্তান লালন করতে হবে তাকেই?

বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা আমি ততদিনে এ খুব ভালো জানি যে, আমাদের সমাজ-সংসার কোনো নিয়মের একটুও এদিক-সেদিক পছন্দ করে না। বাঙালি মেয়ে হয়েছো- নাচ শিখতেই পারো, কিন্তু কৈশোরে পা দিতে না দিতেই তা ছেড়ে প্রয়োজনে গান শেখো, না হলে ছবি আঁকো আর বিয়ে হলে এসব নিয়ে সংসারে ঝামেলা হলে সব ছেড়েছুড়ে হাসিমুখে ঘরকন্না কর।

এমন কঠোর সমাজে বড় হতে থাকা আমি ‘ঊনিশে এপ্রিল’ দেখে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেই- প্রয়োজনে আমিও সরোজিনী হবো, করবো তাই, যা করতে ভালো লাগে বলে বিশ্বাস করি আমি নিজে। অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা, সমাজের বাঁকা চোখ, কখনো পরিবারের সদস্যদের হতাশা- এ সবকিছুর বিনিময়ে যে একজন সফল শিল্পী সরোজিনীকে আমি দেখি- বড্ড ভালো লেগে যায় সেই তাকে।

Rituporno 1
ঋতুপর্ণ ঘোষ

তখনো পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষকে চেনার সুযোগ হয়নি। সারাক্ষণ সিনেমার খোঁজখবর রাখি, এমন ছবি-পাগলও ছিলাম না কখনই। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের ‘দহন’ পড়েছি কলেজে থাকতে। মধ্যবিত্ত সমাজের এই যে টানাপোড়েন, লোকে কী ভাবলো তা নিয়ে ঝামেলা এড়াতে নীরবে অন্যায়, অপমান সয়ে যাওয়ার মধ্যেই যুক্তি খুঁজে পাওয়া – এর সে কী প্রাণস্পর্শী বাস্তবতা সেই উপন্যাসে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে যাওয়া একদল মেয়ে আমরা একসঙ্গে বসে এক দুপুরে ঋতুপর্ণের তৈরি ‘দহন’ দেখে থমকে যাই। আমরা বুঝে পাই না আমরা প্রতিবাদী ঝিনুক হবো, নাকি নির্যাতিতা ঋতুপর্ণা হবো। বুঝে পাই না পরিবারের সম্মান রাখবো, নাকি অন্যায়ের প্রতিকার করবো!

বাংলা সিনেমায় যে দারিদ্র্যের কষাঘাত, বেকারত্বের যন্ত্রণা কিংবা কুঞ্জবনে প্রেমিক-প্রেমিকার যুগল আনন্দ সঙ্গীত শুনে এসেছি – তার সঙ্গে আমার বা আমাদের বাস্তবতার মিল পাইনি কখনো। নিজেদের খুঁজতে উপন্যাস পড়েছি আর সিনেমা দেখেছি অন্য কোনো জগৎকে দূর থেকে একটু পরখ করে দেখতে।

Rituporno 2দু’দুটো ঋতুপর্ণ অভিজ্ঞতা হওয়ার পর হঠাৎই টের পেলাম, তিনি একদম আমাদের টিপিক্যাল বাঙালি মধ্যবিত্তের কথা বলছেন, আর কোথায় যেন বিশেষভাবে বলছেন সব আগল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা শিক্ষিত, রুচিশীল, মধ্যবিত্ত মেয়েদের কথা – যারা নিত্যদিন আবার এই সমাজেই নানা অরুচিকর বাস্তবতায় টিকে থাকতে শক্তিক্ষয় করছে।

এরপর বিশেষ বিরতির কথা মনে পড়ে না আমার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পুরোটা সময় ঋতুপর্ণ সবখানে তার প্রতিটি সৃষ্টিতে আমাদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। বছর বছর তার ছবি আসতে থাকলো। মোটা দাগের কোনো বক্তব্য নেই কিন্তু, মিডল ক্লাস সাইকি বা মধ্যবিত্তের মানসিকতার এফোঁড়-ওফোঁড় বিশ্লেষণ আছে সেসবে। ভাতের সঙ্কটের বাইরে এই শ্রেণীর আরো বৃহৎ যে মনের সঙ্কট- তার স্বীকৃতি আছে। আছেন সর্বব্যাপী রবীন্দ্রনাথ- এই টিপিক্যাল বাঙালি মধ্যবিত্তের সব অনুভবের ঠিকানা হিসেবেই। ঋতুপর্ণ মনে হলো তুলে আনছেন আমাদেরই কথা, লিখছেন পরতে পরতে আমাদেরই আত্মজীবনী।

এরই মধ্যে ব্যক্তি ঋতুপর্ণের সঙ্গেও পরিচয় হতে শুরু করেছে। পরিচালক ঋতুপর্ণ কেন এমন মেয়েলিভাবে কথা বলেন, হাত নাড়েন তার ‘এবং ঋতুপর্ণ’ নামে সেলিব্রিটি টক শোতে, কেনই বা সানন্দায় অমন জমকালো কুর্তা পরে পোজ দিয়েছেন তিনি- এসব নিয়ে খুচরো আলাপ বাড়তে থাকে, তার চলচ্চিত্রের খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গেই। কিন্তু ঋতুপর্ণ বদলান না।

তাঁর খ্যাতি বাড়ে, সমাজের চোখও বাড়ে তাঁর ওপর; কিন্তু তিনি কথার ভঙ্গি বদল করেন না, তাঁর সাজ-পোশাক বদলান না, বরং ছবি দিয়ে তো বটেই, টেলিভিশন উপস্থাপনায় তার জ্ঞানের গভীরতা দিয়ে, নানান সাময়িকীতে ক্ষুরধার লেখালেখির মাধ্যমে এই সময়ের সেরা সৃষ্টিশীল বাঙালিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন।

ওই যে বলেছিলাম, একটুও এদিক-সেদিকে আপত্তি করা মধ্যবিত্ত বাঙালি আর তাকে ইগনোর করতে পারে না। ‘মেয়েলিপনা’ বাড়তে থাকে ঋতুপর্ণের, বাড়তে থাকে সর্বত্র উপস্থিতিও, কিন্তু সমাজ তাকে একঘরে করতে পারে না, তার মুখ বন্ধ করতে পারে না, তাকে নিয়ে হাসি-মশকরা করেও আর তেমন আরাম পায় না।

১৯৯২ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ২১ বছরে ২০টি ছবি বানিয়েছেন তিনি। আমাদের মতো যাদের বয়স ত্রিশের এদিকে বা ওদিকে তাদের একটা বড় অংশের মন-মনন সমাজচিন্তা গড়ে ওঠার অংশ হয়ে উঠেছিল ঋতুপর্ণের ছবি।

সমাজে ঋতুপর্ণের অবস্থান বদলেরও সাক্ষী হয়ে উঠি আমরা। ক্রিয়েটিভ লোকজন, চলতি ভাষায় মিডিয়ার লোক কয়েকটা বিয়ে করবেন, পুুরুষ চিত্রপরিচালক এদিকে-ওদিকে নায়িকা বানানোর কথা দিয়ে প্রেম করবেন, সুবিধা নেবেন- এসবে সমাজ অভ্যস্ত হয়ে গেলেও ঋতুপর্ণের আলাদা যৌনতা এবং তা নিয়ে অকপট ‘নির্লজ্জতা’ মেনে নিতে মধ্যবিত্তের টানাপোড়েনের অভিজ্ঞতার ভুক্তভোগী আর সাক্ষী আমরা।

আমরা যারা নিজের মতো থাকবার, বাঁচবার অধিকারটুকুকে অনেক স্বস্তি আর শান্তির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছি- তাদের আদর্শ বিপ্লবী হয়ে ওঠেন ঋতুপর্ণ।

আপন মনে কাজ করে যান, তাক লাগিয়ে দেন, আরো বেশি করে নিজের ইচ্ছেমতো বাঁচেন। এই তো বছর কয়েক আগেই মধ্যবিত্তের জনপ্রিয় কৌতুক উপস্থাপক মীর, ঋতুপর্ণের যৌনতার বিষয়টি নিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় নিয়মিত মশকরা ফেঁদে বসলে উপস্থাপক ঋতুপর্ণ তার বাড়ির বৈঠকখানায় ‘ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’ টক শোতে আসামি হাজির করেন। জনপ্রিয় টেলিভিশন তারকা মীরকে চোখে কাজল দেয়া, গয়না পরা ঋতুপর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দ্যান, ‘তুমি যখন আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করো, তখন কি আমাকে নিয়েই করো, নাকি নারীসুলভ সব পুরুষকে নিয়ে করো?’ মীর উত্তর দিয়েছিলেন, তার কৌতুক শুধুই ঋতুপর্ণকে নিয়ে। ঋতুপর্ণ তখন ড্রইংরুমে বসে টিভির পর্দায় চোখ সেঁটে রাখা এপার-ওপারের কোটি বাঙালিকে একটা শক্ত বার্তা দ্যান। বলেন, ‘তুমি কি ভেবেছ, যখন তুমি আমাকে ভ্যাঙ্গাও, তখন আমার মতো আরো কতো মেয়েলি পুরুষ কষ্ট পান, লজ্জিত হন!’ ওই অনুষ্ঠানে ঋতুপর্ণ মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি তার মতোই বাঁচতে পারেন। লম্বা কুর্তা পরতে পারেন, দোপাট্টা ঝোলাতে পারেন, গয়না পরেন, সাজতে পারেন, কিন্তু তাঁর মতো আরো অনেকে বাঁচেন লজ্জায়-দ্বিধায়।

ওই অনুষ্ঠানের ক্লিপ এরপর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ইউটিউবে। একবার ছাড়া সমাজকে এমন সরাসরি কড়া কথা বলে বা কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ঝাঁকি দেননি ঋতুপর্ণ।

Nobonita
নবনীতা চৌধুরী

কিন্তু এই বাঙালিকেই ঋতুপর্ণ নিজে অভিনয় করে (মেমোরিজ ইন মার্চ, আরেকটি প্রেমের গল্প) আর ছবি বানিয়ে (চিত্রাঙ্গদা) সইয়ে নিয়েছেন সমলিঙ্গের প্রেমের বাস্তবতা। বাঙালি মনে না নিলেও মেনে নিয়েছে ওই প্রেমও মানবিকই বটে- তাতেও হাসি-কান্না আর হৃদয়ের যোগ আছে।

যে সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করে, কিছুটা পাল্টে দিয়ে চলে গেলেন ঋতুপর্ণ সেখানেই তো তার বেড়ে ওঠা, বড় হওয়া। তাই বোধহয় জানতেন সৃষ্টিশীলতা আর গুণের কাছে বাঙালি জাতটার অসহায়ত্বের কথাও। মাত্র ৪৯ বছরের জীবনের ২১ বছর কাজ করে এমন মাতিয়ে দিলেন সবাইকে যে সমকামিতা, লিঙ্গ বদলের অস্ত্রোপচার, বাহ্যিক-শারীরিক পরিবর্তন- সবকিছু করেও সমাজ তার সৃষ্টিশীলতার গুণই গাইতে থাকলো শেষ ক’বছর ধরে।

যা ইচ্ছে তাই করার মধ্যেই যে আমাদের সমাজ-সংসার খারাপ কিছু দ্যাখে তার প্রমাণ যাচ্ছেতাই শব্দটির নেতিবাচক দ্যোতনা (কনোটেশন)।

নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করার আরেক মানে দাঁড়ায় আমাদের ভাষায় একেবারে যা-তা করা। যা ইচ্ছে তাই করেই জীবন পার করেছেন ঋতুপর্ণ আর চলে গেছেন যাচ্ছেতাই তাড়াতাড়ি। আমরা ভাগ্যবান আমাদের জীবদ্দশার একটা বড় সময়ের প্রামাণ্য দলিল উঠে এসেছে এমন এক প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকারের সৃষ্টিতে। সব প্রজন্মের সে সৌভাগ্য হয় না। আর ভাগ্য এ সমাজের-সমকামিতা, ট্রান্সজেন্ডার মানুষ- (দুঃখিত এর কোনো বাংলা প্রতিশব্দ পেলাম না অভিধানে!) এসব নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছেন এ মানুষটি। হয়তো এক সময় সমাজ সংস্কারক সাংস্কৃতিক বিপ্লবী হিসেবে গণ্য করে ঋতুপর্ণের কাছে বারবার ফিরে আসতে হবে বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গবেষকদের। আর সামনে বহু বছর তার ছবি, লেখা, সাক্ষাৎকার না পাওয়ার কষ্টে এক রকম শূন্যতার বোধ তাড়া করে ফিরবে আমাদের, তা নিশ্চিত।

নিজ সৃষ্টির গুণে প্রভাবশালী হয়ে, সুবিধাবঞ্চিত সমাজের অংশী না হয়েও যৌনতার বিচারে একেবারে প্রান্তিক ছিলেন বলেই কী ঋতুপর্ণ এমনভাবে পড়তে পেরেছিলেন বাঙালি নারীর মন? নাকি তা সবসময় নারী হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন বলে?

‘বনমালী তুমি পরজনমে হইও রাধা’ নারীজনমের সুখ-শোক-গৌরব আর বঞ্চনার সবটুকু অভিজ্ঞতা হোক কোনো এক জনমে প্রাণপণ নারী হতে চাওয়া আর পুরুষ হয়ে ওঠার দায় প্রত্যাখ্যান করা মানুষটির।

২০১৩ সালের জুলাইয়ে এ লেখাটি ছাপা হয়েছিল ‘চারবেলা চারদিক’ এ

শেয়ার করুন:
  • 204
  •  
  •  
  •  
  •  
    204
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.