চিৎকার করো মেয়ে, গালি দাও

নায়না শাহরীন চৌধুরী: আত্মহত্যা করতে যে যাই বলুক, বুকের পাটা লাগে। বোকামি বলেন, পাপ বলেন অথবা স্বীকার করেন আর নাই করেন, আত্মহত্যার চিন্তা জীবনে একবার না একবার সবাই করে। যখন সব কিছু আপনার বিপরীতে।

হ্যাঁ, সেই চিন্তাটাকে টেনে সবাই বাস্তব রূপ দেয় না, বা দিতে পারে না নানান কারণে। দিলে পৃথিবীতে কয়জন লোক অবশিষ্ট থাকতো কে জানে। জীবন চলমান, আর নিজের চেয়ে বড় প্রেমিক আর কেউ নয়। তাই সবকিছুর সাথে সমঝোতা করে বেঁচে থাকি। জীবন যেমনই হোক, প্রাণ থাকা দেহ নিষ্প্রাণ পচা গলা শরীরের থেকে ভাল।

IWD 7সাবিরার মৃত্যুতে অনেকেই অনেক মতামত দিচ্ছেন। আমি ঠিক ভুল বিচারে যাবো না। আমার লেখার প্রসঙ্গ আলাদা।

আমি সাবিরাকে চিনি না। আমি ওর পরিস্থিতিগুলো ওর চেয়ে ভাল অনুধাবনও করতে পারবো না। তবে ও যে একটা মেয়ে ছিল এবং মেয়েদের শরীরটা বাঙালি সমাজে বিয়ে বা সত্যি প্রেমের প্রলোভন ছাড়া ছেলেরা সাধারণত পায় না এটুকু জানি। এখনকার জেনারেশন সবকিছু জলদি চায়।

অনলাইনে ‘হাই’ বলার পর চিনুক না চিনুক, তারপরের বাক্য হয় ‘সেক্স করবা?’ মেয়ে রাজি হলে তো ভাল, না হলে অনেক উপায় আছে। ছবি ফটোশপ করে ব্ল্যাকমেইল, ইমশোনাল ব্ল্যাকমেইল, ‘জান, আমাকে বিশ্বাস কর না!’ বিয়ের স্বপ্ন দেখানো, স্বপ্নের লক্ষ্যে যেতে মই হতে চাওয়া বোঝানো ইত্যাদি ইত্যাদি। লক্ষ্য কিন্তু একটাই, শরীর।

এই বেপরোয়া শরীরাকাঙ্খী পুরুষের সংখ্যা অগনিত। এদের আবার ক্লাসিফিকেশন আছে। একদল আছে, ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানে না টাইপ। এরা বাইরে কিছুই প্রকাশ করবে না। কাউকে জানাবে না, জানাতেও দেবে না এরা কী চিজ! ভদ্রবাবু হয়ে থাকবে এবং বিয়ের সময় প্রেমিকা ফেলে ভার্জিন মেয়ে খুঁজবে। আমার এক আত্মীয়ের ছেলে খুবই ধর্মপরায়ণ। তো, সেই ছেলে তার দীর্ঘদিনের প্রেমিকাকে বিয়ে করেনি। কারণ যে মেয়ে বিয়ের আগে প্রেম করে তাকে সে বিয়ে করবে না।

Feminisimআরেক দল আছে, গিভ অ্যান্ড টেক গ্রুপ। তাদের মোটো, অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস চাই? চাকরি চাই? প্রোগ্রাম চাই? প্রমোশন চাই? বিপদে পড়েছো, টাকা চাই? দিব, আগে করতে দাও। এই দল বরং প্রথম দল থেকে ক্লিয়ার। এরা যৌনকর্মীর মতো তাদের চাহিদা আগে থেকে জানিয়ে দেয়। চোরের মতো মাঝপথে ফেলে পালায় না। তবে সামাজিক প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে দুই দলই গোপনীয়তা বজায় রাখে।

মেয়েদের যতই ‘স্লাট’, ‘হোর’ ‘বেশ্যা’, ‘খানকি’ গালি দেওয়া হোক, ছেলেদেরকে দেওয়ার মত যৌনতা বিষয়ক কোন গালি নেই। যা আছে তাতেও কোন নারী চরিত্রকে কলঙ্কিত করা হয়। হোক সে নীল ছবির মুখ ঢাকা চলমান শক্তি, অথবা কু প্রস্তাব দেওয়া সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, বিখ্যাত মুরুব্বী, অথবা মেরুদণ্ডহীন চোর প্রেমিক, আমরা তাদের নাম পরিচয় ঢেকে রাখি।

রাখতে হয়। নইলে, আমাদের পরিবার কলঙ্কিত হয়, সমাজে মুখ দেখানো যায় না। ব্লা ব্লা ব্লা…। আর সেই সুযোগে আরও বেপরোয়া হতে বাধা কোথায়।

Naina
নায়না শাহরীন চৌধুরী

যখনই কোন মেয়ে মুখ খোলে, তখন সবাই মেয়েটির দিকে চোখ তুলে আগা গোড়া দেখে, পুরুষদের চোখে সে আরও লক্ষণীয় হয়ে ওঠে, আর সমাজের চোখে কলঙ্কিনী। অপমান, অবহেলা সহ্য করে করে যখন না পারে তখন আত্মহত্যার চেষ্টা করে মেয়েটি। অনেকে সফলও হয়। পত্রিকায় হেডলাইন হয়। আমরাও কিছুদিন লেখালেখি করি। তারপর আবার আরেকটা ঘটনা। এই তো চলছে, এবং চলবে।

জানি, সময়টা এখন অন্যরকম, হাত বাড়ালেই সব কিছু পাওয়া যায়। ছুরি, দড়ি, ঘুমের ওষুধ। কিন্তু এগুলো নিজের উপর অ্যাপ্লাই না করে ভাবো যে বদমাশ তোমার জীবন ধ্বংস করে দিল, তার কি প্রাপ্য না? চিৎকার করে গালি দাও, সত্যিটা জানাও সবাইকে। কে, কী ভাবলো তা নিয়ে ভেবো না মেয়ে। তোমার মনে যে ঝড় বইছে তার আন্দাজ কারো নেই। যুদ্ধটা নিজেরই করতে হয় সব সময়। হারা জেতা পরের ব্যাপার। বুকটা হালকা হবে, বিশ্বাস কর।

লেখক ও সংগীত শিল্পী

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.