একটি মেয়ে, তার পেশা, বিয়ে এবং প্রশ্নবিদ্ধ নারীবাদ!

ইশরাত জাহান ঊর্মি: সম্ভবত: তসলিমা নাসরিনের লেখায় পড়েছিলাম। এক মেয়ে খুব ভালো গান করে। কোনো এক অনুষ্ঠানে মেয়েটার গান শুনে প্রেমে পড়ে যোগ্য পাত্র। তারপর বিয়ের কথাবার্তা। বিয়ের প্রধানতম শর্ত বিয়ের পর মেয়েটা গান গাইতে পারবে না। বা গাইলেও ঘরোয়া কোন অনুষ্ঠানে শুধু গাইতে পারবে। পরে ক্রমে ক্রমে ঘরোয়া অনুষ্ঠানও বাদ। তসলিমা নাসরিন লিখেছিলেন, সম্ভবত মেয়েটি এখন তার স্বামীর কানে কানে গান শোনায়!

13115325_10207873053117082_679485265_nআচ্ছা বলেন, ঐ মেয়েটার দোষ কী? কতগুলি নাম বলি, মিলিয়ে নেন। শ্রীদেবী, মাধুরী দীক্ষিত, কাজল, কারিশমা কাপুর। বলিউডের সুপার স্টার সব। শুধু নায়িকা বলতে যা বোঝায় তা নয়, এরা সবাই জাত অভিনেত্রী, বা বলতে পারি, দিনে দিনে নিজেদের পেশাদার গুনী অভিনেত্রীতে কাজ আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তারা তৈরি করে নিয়েছিলেন।

কী হলো দেখেন, তারা বিয়ে করলেন বা বসলেন, এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা দিলেন, বিয়ের পর আর অভিনয় করবেন না। পরিবারের সাথে সময় কাটানোর মতো মধুর নাকি আর কিছু নেই, মাতৃত্বের মহত্বের ঠ্যালা তারা সামলাতে পারলেন না। একে একে সবাই “মেরা ঘর মেরা সাপনা” বুলি তুলে আড়ালে চলে গেলেন। এবং তাদের নায়ক অথবা পরিচালক স্বামীরা কিন্তু নিজেদের পেশা থেকে এতোটুকুও সরে আসেননি। আর তাদের আবেগী ইন্টারভিউ যদি স্টারডাস্ট বা এরকম কোন পত্রিকায় পড়েন তো নারীবাদ জিনিসটাই আপনি গুলিয়ে ফেলবেন।
আমার খুব মনে হয়, যে কাজটা এরা এতো যত্নের সাথে, এতো যুদ্ধের সাথে এতো বছর ধরে নিজেকে আক্ষরিক অর্থেই ক্ষয়ে এবং খুইয়ে করে গেছেন, আসলেই কি সে পেশা বা কাজের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা বা মমতা ছিল? বা থাকে?

এইসব ক্ষেত্র্র্র্রে স্বামীরা ঠিক কতোটা বাধা হন, তা আমার জানা নাই, মুম্বাই এর সমাজ তো আমার পরিচিত নয়, কিন্তু ধরেন যদি এসব অভিনেত্রীর কারও স্বামী তাদের কাজ করার ক্ষেত্রে বাধা হয়েও থাকেন, তাহলে তারা তা মানেন কোন যুক্তি আর ভিত্তিতে?

ঘর আর সংসারের যে সুখী সুখী অতি প্রাচীন ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশের নারীদের মাথায় সেট করে দেওয়া হয়, এইসব আপাত: শিক্ষিত এবং আধুনিক নারীরা কি তার থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন?
খুবই আশার কথা, মুম্বাই এ এখন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, কঙ্কনা রৌণাত এর মতো অভিনয় শিল্পীরা উঠে আসছেন। যারা এসবের ধার ধারেন না। কাজকে সম্মান করেন। কারণ কাজটা তাদের রক্ত-ঘামের, পরিশ্রমের।

girls 2বাংলাদেশে মাহিয়া মাহির বিয়ের নিউজ দেখে আমার এসব ভাবনা মাথায় এলো। একটা অনলাইনের নিউজ দেখলাম, তিনি বলেছেন, তিনি কোনো রান্নাবান্না পারেন না, বিয়ের পর সবার আগে ভাত রান্না শিখবেন। আচ্ছা বলেন তো, ভাত রান্নার মতো একটা দৈনন্দিন কাজ বিয়ের পর কেন শিখতে হবে? আর ধরেন, ধরেই নিলাম, তিনি ভাত রান্না জানেন না, বিয়ে করতে হলে তাকে স্বামীর ভাত রাঁধতে হবে- এই কথাটা তার মতো পাবলিক ফিগারের বলার দরকারটা কি? এতে তার মতো মাকাল ফলদের প্রেমে যেসব মেয়েরা পড়ে, তাদের কাছে কি ম্যাসেজ পৌঁছায়?

তারপর নিউজে দেখলাম, তিনি বলছেন, “আমার ইচ্ছে ছিল যখন লোকে আমাকে মোটামুটি চিনবে, তখনই বিয়ে করবো। আমি এরপর সিনেমা আর করবো না, খুব ভালো প্রজেক্ট হলে দু্একটা করতে পারি, কিন্তু এর বেশি না।”  
সিনেমা করে নিজেকে চেনানোর প্রজেক্ট ছিল তার এবং তারপর আরও ভালো প্রজেক্ট পেলে তিনি সিনেমা করবেন, তা না হলে না। পুঁজির জঘণ্য গন্ধভরা এই কথাগুলি টেলিভিশনের পর্দায় আমরা দেখলাম আর শুনলাম। আর পাশ থেকে তার অদ্ভুত চেহারার বরটি ভুল উচ্চারণে বললেন, ‘ও চাইলে অভিনয় করবে আমার দিক থেকে কোন আপত্তি নাই (বিরাট লায়েক!)’
শুধু মাহি কেন, যত নাটক-সিনেমার মেয়েদের দেখি সবারই এক অবস্থা। যারাই বিয়ে বসেন, গদগদ হয়ে বলেন, “আমি এখন কাজ করা কমিয়ে দেবো, পরিবারকে সময় দেবো।”

অথবা বলেন, “আরে আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন খুবই আধুনিক, আমার কাজ করার বিষয়ে তাদের কোন আপত্তি নেই!” অর্থাৎ শ্বশুরবাড়ির লোকজন দয়া করলে ঐ মেয়ে কাজ করতে পারবে, তা না হলে নয়। এই ধরনের পেশার ধাতটা আলাদা, পারিবারিক জীবন কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্থ হয়, সময়ের কোনো ঠিক-ঠিকানা থাকে না। তো এই দৃষ্টিকোণ থেকেও কিন্তু মেয়েরা ইন্টারভিউ দিতে পারে, কিন্তু তা নয়, তারা কথা এমনভাবে বলেন যেন তারা অত্যন্ত গর্হিত কোন কাজ করেন, অস্বাভাবিক কোন কাজ করেন, সেখান থেকে ফিরে আসতে চান।

সমাজ হয়তো এভাবেই দেখে। কিন্তু সমাজকে বদলানোর কাজটাও তো অগ্রসরমান মানুষদেরই করতে হয়।
আসলে শিল্পের বেদনা ধারণ করার জন্য যে মনন আর মণীষা থাকা দরকার, তা এদের থাকে না। শিল্পের সাথে যুক্ত থাকা তো শুধু ফ্যাশন নয়, প্যাশনও। আবেগমিশ্রিত ভালোবাসা। এই মেয়েগুলার সেই বোধ থাকে না। তা না থাকুক, তা নিয়ে কথা বলে আমি সময় নষ্ট করতে চাই না।

আমার আপত্তি হলো, এইসব কথা ইন্টারভিউতে বলে শিল্পচর্চা সম্পর্কে নারীর অবস্থান নিয়েই যে নেতিবাচক ধারণাটি তৈরি হয়, সে ধারণা তৈরি করার কোনো অধিকার এই মেয়েদের দেওয়া উচিত নয়। আমি জোর আপত্তি করছি এইসব কলের পুতুলমার্কা তুলতুলে পোশাকে স্মার্ট আর ধ্যান-ধারণায় প্রাগৈতিহাসিক মেয়েগুলার “বিয়ের পরের ইন্টারভিউ” ছাপানোতে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.