ফেইল ফেইল, শেইম অন আস

তাসলিমা আক্তার: ফেইল ফেইল-নয় মিনিটের ভিডিওতে কান্না জড়ানো ক্ষীণ কন্ঠের শেষ কথাটি ছিল এই। নিঃসঙ্গ এক তরুণী কি নিদারুণ ব্যাথায় প্রতিটি শব্দ উচ্চারণ করছিল! কমার্শিয়াল মডেল বললেই চোখে যে ছবি ভাসে তা হলো ফর্সা, টিকোলো নাক, মোহময়ী রুপ, উন্নত নিতম্ব-বক্ষদেশ। এই সংজ্ঞা সাবিরার সাথে খুব একটা মেলে না। মেয়েটির ভারী মায়াকাড়া একটা মুখ, ছোটখাটো গড়ন একলা ঘরে মেয়েটি কাৎরাচ্ছিল, তার পাশে কেউ নেই।

Sabira 1আমি সাবিরা নামের মেয়েটির কোনো টেলিভিশন কমার্শিয়াল দেখিনি কখনো, কিন্তু নিষ্ঠুরের মতো তার মৃত্যু চেষ্টা দেখেছি। হতে পারতো মেয়েটি ভবিষ্যতে কোনো একজন প্রতিষ্ঠিত মডেল। হতে পারতো কোনো বিখ্যাত উপস্থাপক। কিন্তু হয়নি। তার শেষ কথাগুলোর মতই সে হয়েছে, ফেইল ফেইল।

কিছু কিছু মেয়ে ভাগ্যান্বেষণে পা রাখে কিছু সাহসী পেশায়। রুপালী জীবন হাতছানি দিয়ে ডাকে। সবাই বলে, “হবে মেয়ে, তোমাকে দিয়ে হবে।“ মেয়েটি আশার মুখ দেখে। প্রডিউসার বলে, “তোমাকে হিট মডেল বানায়ে দেবো” মেয়েটি ভরসা পায়। প্রডিউসার হাসে আর বলে, “বুজলানা দুনিয়াটা হইলো গিয়া গিভ এন্ড টেক এর। আমি তোমারে মডেল বানায়া দিবো, আর তুমি আমারে খুশী কইরা দিবা”। বোকা মেয়েটি উঠেপড়ে লাগে খুশি করে দিতে। কিন্তু দিনশেষের প্রাপ্তিতে সে নিজে খুশি হতে পারে না।

আমার খুব প্রিয় একটা উপন্যাস বঙ্কিম চন্দ্রের কৃষ্ণকান্তের উইল। সেখানে দুটি প্রধান নারী চরিত্র। এক, অপাপ বালিকা বধু ভ্রমর আর অপরজন অকাল বৈধব্যকে অস্বীকার করা রোহিনী। ভ্রমর বেঁচে থাকে তার স্বামীর জন্য আর মরে গেলেও যায় স্বামীর জন্য। কিন্তু সেই স্বামীর একবার মনে হলো, “ভ্রমরকে অনেক ভালোবাসিয়াছি, এইবার কাঁদাইবো।“

ভ্রমরকে কাঁদাতে গিয়ে স্বামী দেব রোহিনীকে নিয়ে ঘরছাড়া হয় শেষতক। উপন্যাসের শেষে রোহিনীকে বাঁচিয়ে দেয়া যেতো হয়তো, কিন্তু তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছিল। কারণ রোহিনী বেগানা পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছে। কারণ রোহিণী রীতি রেওয়াজ আর প্রথার বাইরে গিয়েছে। মেয়েদের রেওয়াজ ভাঙ্গতে নেই। মেয়েদের প্রথার বাইরে যেতে নেই।

Taslima Akter
তাসলিমা আক্তার

হত্যা কিংবা আত্মহত্যা কখনোই কাম্য হতে পারে না। কিন্তু কি পরিস্থিতিতে কোন একজন মানুষ আত্মহননের পথ বেঁছে নেয় অবস্থাটা শুধু ভুক্তভোগীই জানে। এটা স্বভাবতই বোঝা যায়, কোমল হৃদয়ের মানুষগুলোই নিজেকে সামলাতে না পেরে আত্মহননের পথ খুঁজে ফেরে। মেয়েটির ভিডিও দেখে মনে হলো মেয়েটি বেশ কোমল হৃদয়ের। সাফল্য আসতে শুরু করেছিলো তার জীবনে, কিন্তু ভালোবাসা তাকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

নির্ঝর নামের কোনো এক তরুণ মেয়েটির স্বপ্নভঙ্গ করেছে। মেয়েটির কথা থেকে জানা যায় নির্ঝরের সাথে তার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিলো এবং সেই সাথে দৈহিক। কিন্তু বিয়ের কথাতেই পিছটান দিয়েছিল নির্ঝর। এই চিত্রটি আজকাল অহরহ দেখা যাচ্ছে। প্রেম আর দেহজ সম্পর্কের সময় ছেলেটি ভাবছে না, কিন্তু যখন বিয়ের কথা আসছে তখন তারা পরিবার আর সমাজের দোহাই দিচ্ছে। আর বোকা মেয়েগুলো কেউ মানসিক বৈকল্যে ভুগছে, নয়তো নিজেকে মেরে ফেলছে।

লেখক, কবি এবং অভিনয়ের সাথে জড়িত তারা একটু বেশি আবেগী হয়, আবেগ নিয়েই তাদের কারবার। সাহিত্যে কিংবা সিনেমাগুলোতে শিখানো হয়, “মেয়ে তুমি ভুক্ত তাই মরে যাওয়া ছাড়া গতি নেই”। ইতি মৃণালিনীর “মৃণালিনী” ডার্টি পিকচারের “সিল্ক” অথবা ফ্যাশনের “মেঘনা” এরা কেউ মরে যায় অথবা মানসিক বৈকল্যে ভুগে। নেশাসক্ত মেরিলিন মনরোর পরিণতি কারো অজানা নয়। সাবিরা নামের কোমল হৃদয়া মেয়েগুলো এই চরিত্রগুলো থেকে উদ্বুদ্ধ হয়।   

Sabira nd Oishiএকটা একটা ইস্যু সামনে আসে আর আমাদেরকে সেই ইস্যু নিয়ে প্রতিবাদের ভাষায় লিখতে হয়। শাজনীন, ঐশী কিংবা সাবিরার ইস্যুতে দায়ী করা হয় তাদের অসংযত জীবনাচরণকে। আদতে কি তাই? একা একাই কি মেয়েগুলো এমন হয়ে যায়?

এ ধরনের আর কোনো ইস্যু নিয়ে যেন লিখতে না হয়। বাগানে ফুল ফুটিল, পাখিরা গান করিল আর রাজারানী মহাসুখে দিন কাটাইতে লাগিল। এই রকম লিখতে চাই। তার আগে মেয়ে, তোমার সস্তা আবেগকে ভুলে যেতে হবে। “ছায়ারুপেণু” না হয়ে দেবী যেদিন “শক্তিরুপেণু” হতে পারবে সেদিন থেকে আর কোনো সাবিরাকে বলতে হবে না ফেইল ফেইল। আর আমরা যারা জড়ের মত জীবিত আছি, তারাও বেঁচে যাবো এই লজ্জা থেকে।  

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.