শিক্ষার পাশাপাশি সন্তানকে আস্থা দিন

জেসমিন চৌধুরী: আমি একজন স্বার্থপর মানুষ, স্বার্থপর মা। ঐশী বা সাবিরার করুণ চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজের মেয়ের কথাই ভাবি আমি, যে মেয়ের আমি একাধারে মা এবং বাবা, যার শারীরিক, মানসিক এবং আবেগিক বৃদ্ধির জন্য আমি একাই দায়ী। খুব যে অসাধারণ মা হতে পেরেছি তা বলবো না। পেছন ফিরে তাকিয়ে শুধু ভুল আর ভুলই দেখি। আবার সেইসব ভুলের আঁধারে দু’এক ছটা আলোর ঝলকানিও যে দেখি না তা নয়।

baba 3আমার মেয়ের বয়স যখন চৌদ্দ তখন বারো বছর পর তাকে নিয়ে ইউকে’তে ফিরে আসি আমি।

ছেলে দূরের এক শহরে ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গেলে আমরা মা-মেয়ে লন্ডন শহরে ছোট একটা বাসা ভাড়া করে জীবন সংগ্রামে নামি।

আমার মেয়ের জন্য সময়টা সহজ ছিল না। বাংলাদেশী সামাজিক ধ্যান-ধারণার মধ্যে শৈশব-কৈশোরের প্রায় পুরোটাই পার করে আসার পর এখানের সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে তার মানিয়ে নেয়ার যুদ্ধের পুরোটা আমি নিজেও জানতাম না।

তবে মাঝে মধ্যে তার অদ্ভুত সব প্রশ্নে এদেশের মিশ্র সংস্কৃতিতে তার বেড়ে উঠার সমস্যার জগতে টুকটাক উঁকি মারার সুযোগ ঘটতো আমার।

Jesmin Chowdhuryচমকে উঠতাম, ভয় পেতাম, কিন্তু সবকিছুর পরও আমরা প্রচুর কথা বলতাম, যা সুদূর প্রবাসে আমাদের মা-মেয়ের আত্মীয় বান্ধবহীন দিনযাপনকে কিছুটা হলেও সহজ করে তুলতো। একদিন প্রশ্নোত্তরের ম্যারাথনে পড়লাম তার সাথে।

কথোপকথনটা ছিল এরকম,

আচ্ছা মা, আমি যদি একদিন এসে বলি আমি প্রেগন্যান্ট, তুমি কি করবে?

(মনে মনে শঙ্কিত কিন্তু শান্ত গলায়) তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।

রাগ করবে না?

না।

মন খারাপ হবে না?

তা কিছুটা হবে।

কেন, মন খারাপ হবে কেন?

ঠিকমতো তোমার খেয়াল রাখতে পারিনি, নিজের ভাল-মন্দ কীসে হয় তা শেখাতে পারিনি ভেবে মন খারাপ হবে। নিজেকে একজন খারাপ মা ভেবে মন খারাপ হবে।

(হেসে) আমার দিকে ওমন করে তাকিয়ো না মা। আমি প্রেগন্যান্ট না, হবার প্ল্যানও নেই। মেয়েদের হয়তো এসব, তাই জিজ্ঞেস করলাম।

জবাবে আমিও হাসি, তাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খাই। তার প্রশ্ন কিন্তু এখানেই শেষ হয় না।

আচ্ছা মা, ভাইয়া যদি হঠাৎ করে এসে বলে সে গে, তুমি কি করবে?

এটা কি ধরনের প্রশ্ন?

বল না মা, কি করবে?

কী আবার করবো? মেনে নেবো।

মেনে তো নেবেই। কিন্তু মন খারাপ হবে?

তাতো হবেই।

ছি: মা! তুমিও? মানুষ গে হলে তাতে মন খারাপ করার কী আছে? এই যে আমি গে না, তুমি গে না, এটা নিয়ে কি তোমার মন খারাপ? তাহলে ভাইয়া গে হলে মন খারাপ করবে কেন?

সব মা’ই চায় তার সন্তান স্বাভাবিক হোক।

তার মানে তুমি গে মানুষকে স্বাভাবিক ভাবো না? ছি: মা, আমি তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি।

সত্যি কথা বলতে কী, মেয়ের কাছে একটা ভাল শিক্ষা পেয়েছিলাম সেদিন। মনের একটা বন্ধ জানালা খুলে গিয়েছিল। আমার মেয়ের বয়স এবছর একুশ হবে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, একা থাকে, নিজেকে নিজেই দেখাশুনা করে, পৃথিবীর প্রাণীকুলের প্রতি অসম্ভব মমতা থেকে নিরামিষভোজী হবার চেষ্টা করছে।

আমি মেয়েকে নিয়ে ভীষণ গর্বিত। কিন্তু আমরা ইউকেতে আসার পর গত কয়েক বছরে তার পা যে একবারেই ফসকায়নি তা হলফ করে বলতে পারবো না। আমাদের দেশীয় মূল্যবোধের হিসেবে সে যে প্রচুর ভুলভাল করেনি তাও নয়। কিন্তু সে সবসময় জানতো ভুলই জীবনের শেষ কথা নয়। তদুপরি আমার দৃষ্টিতে যা ভুল ছিল, তার দৃষ্টিতে তা সবসময় ভুল ছিল না। জানতো আমি কষ্ট পাবো, তবু নিজের ভুলগুলো কখনো লুকোয়নি আমার কাছে। মা’কে নিজের ভুলগুলোর কথা বলা যায়, সেই আস্থাটুকু তার ছিল।

বহুবার তার উল্টাপাল্টা কাজ কারবার নিয়ে চেঁচামেচি করেছি, দু’জনে মিলে গলাগলি করে কেঁদেছি, আবার শুরু করেছি, আবার ভুল হয়েছে। এভাবে পথ চলতে চলতে একসময় এমন একটা অবস্থানে এসে পৌঁছেছি যখন আমার মনে হয়েছে সে আমার চেয়ে অনেক বেশি ভাল একজন মানুষে পরিণত হয়েছে, যাকে আমার শেখানোর কিছু নেই, বরং তার কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।

ঐশী আর সাবিরার কথা লিখবো বলেই বসেছিলাম। ঐশীর জীবন তছনছ হয়ে গেছে, সাবিরার সব সম্ভাবনার ইতি ঘটেছে, তবুও আজ আমরা ঐশীর করুণ পরিণতি নিয়ে ভাবছি। আমরা সাবিরার জন্য কাঁদছি।

অথচ ঠিক এই মুহুর্তে ঐশী আর সাবিরার মত হাজারো ছেলেমেয়ে অস্তিত্বের দ্বন্দ্বে ভুগছে, তাদের কেউ ঐশীর মতো মা-বাবার সাথে মানসিক যোগাযোগের অভাবে, আবার কেউ সাবিরার মত মা-বাবার স্নেহ এবং সাহচর্যের অভাবে দিশেহারা হয়ে শেষপর্যন্ত ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে।

ঐশী আর সাবিরার জন্য হাহাকার করা ছাড়া এখন আমাদের আর করণীয় কিছু নেই, কিন্তু যাদের সমস্ত সম্ভাবনার এখনো ইতি ঘটেনি তাদেরকে নিয়ে ভাবতে হবে আমাদেরকে। আমি প্রায়ই শুনি এই প্রজন্মের সমস্ত সমস্যার জন্য তাদের নৈতিক অবক্ষয়কে, নৈতিক শিক্ষার অভাবকে দায়ী করা হয়। কিন্তু আসলেই কি তাই?

IWD 3নীতিবোধ অবশ্যই জরুরি, কিন্তু আমার মনে হয় তার চেয়েও বেশি জরুরি আস্থা। বিশ্বায়নের প্রভাবে ছোট হয়ে আসা আজকের পৃথিবীতে আমাদের সন্তানদের পরিচিতি ঘটছে বিভিন্ন নতুন ধ্যান ধারণার সাথে, তাদের মধ্য সৃষ্টি হচ্ছে এক নতুন ধরনের মূল্যবোধ যার খোঁজ হয়তো আমরা রাখি না, অথবা রাখলেও তার  সঠিক মূল্যায়ন করতে পারি না। আমরা সময়ের চাহিদাকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, এবং শুকনো নীতিবোধ সৃষ্টির চেষ্টায় আস্থাহীনতার মধ্যে বড় করে তুলছি আমাদের নতুন প্রজন্মকে।

এইসব ভিন্নমুখী নীতি আর মূল্যবোধের দেয়ালগুলো আরো বেশি সংকীর্ণ আর অন্ধকার করে তুলছে আমাদের জগতকে। সৌভাগ্যক্রমে  আমাদের সন্তানদের অনেকেই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠে জীবনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, আবার অনেকেই অকালে ঝরে পড়ছে। তাদেরকে বাঁচাতে হলে আমাদেরকে কিছু জানালা খুলে দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলতে হবে, তারা কী ভাবছে তা জানার এবং বুঝার চেষ্টা করতে হবে।

নীতিবোধের পাশাপাশি তাদের মধ্যে আস্থাবোধের সৃষ্টি করতে হবে যেন নিজের ভুলগুলো নিয়ে তারা আমাদের কাছেই ফিরে আসতে পারে। আর তা যদি না করতে পারি, আরো অনেক ঐশী আর সাবিরাকে হারাবো আমরা।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

A very good piece of writing! As a mother of 2 teenagers I feel the most important thing while raising them is communication. I always tell them ” I might get angry or upset or annoyed but come what may, I would be on your side, I will fight for you, I am on your side”.
I will request every parent to give their daughters self esteem, self respect. just let go of people who does not understand your worth, life is much bigger and beautiful than one particular person or event.

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.