সাবিরার মৃত্যু: অবদমিত যৌনতা আর রক্ষণশীলতার পরীক্ষা

শারমিন শামস্: আমার পরিচিত একটি মেয়ে মডেলিং করতো। কোন এক ফ্যাশন শো’তে তাকে দেখে ভালো লেগে গিয়েছিল আমারই পরিচিত আরেকটি ছেলের। ছেলেটি মেয়ের প্রেমে দিওয়ানা হয়ে রইলো বছর চারেক। তারপর যখন তারা বিয়ের কথা ভাবছে, ছেলেটা মেয়েটাকে জানালো, এবার তাকে মডেলিং ছাড়তে হবে। মডেল বৌ তার পরিবার মেনে নেবে না।

Sabira 2, মেয়ে মডেলিং ছেড়েছে এবং এখন তিনহাত লম্বা ব্লাউজের সাথে পাতলা শিফনের শাড়ি আর হিজাব পরে। ছেলে তার বৌ নিয়ে যখন এখানে ওখানে যায়, সবাই তার সুন্দরী বৌকে দেখছে, এটা বুঝতে পেরে গর্বে তার চেহারা চকচক করে, কিন্তু কখন্ও কারো কাছে ভুলেও উল্লেখ করে না যে, তার বৌ একসময় বেশ নামকরা মডেল ছিল। অনেক ভালো ক্যারিয়ার ছেড়ে-ছুড়ে সেই মেয়ে এখন ওই ছেলের বৌ পরিচয় নিয়েই বেঁচে আছে।  

সাবিরা হোসাইন নামের মডেল মেয়েটির আত্মহত্যার ঘটনাটা ঘটার পর আমার এই ঘটনার কথা মনে পড়লো। পুরো বিষয়টা দেখে শুনে আর সাবিরার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে যা বুঝলাম, সাবিরা মেয়েটা মডেলিংয়ের মতো একটি ভীষণ আধুনিক পেশা বেছে নেয়া সত্ত্বেও মনে ও মননে, চিন্তায় ও জীবনবোধে ভীষণই প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটি মেয়ে ছিল।

তবে আত্মহত্যার জন্য তার এই প্রাচীন মানসিক কাঠামোই একমাত্র দায়ী নয়, তার একাকিত্ব, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার বেদনা, বিষন্নতা, শোবিজ জগতের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সর্বোপরি প্রেমিকের জন্য বয়সোজনিত কারণে তীব্র আকর্ষণ আর আবেগও এই আত্মহত্যাকে প্ররোচনা দিয়েছে।

মেয়েটি নিশ্চয়ই হঠাৎ করে আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত নেয়নি। নানা ঘটনাপ্রবাহ এর পেছনে আছে, এবং সাবিরাকে বুঝতে নির্ঝর নামের ছেলেটির অক্ষমতা আর অবশ্যই সেই ছেলের পরিবারের সাবিরার প্রতি দুর্ব্যবহার এই আত্মহত্যাকে উৎসাহ যুগিয়েছে।

সাবিরার শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে নির্ঝরের ভাই তার সাথে বাজে ব্যবহার করে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে। এই বয়সে এ ধরনের অভিজ্ঞতা বুকের খুব গভীরে গিয়ে লাগে, বুঝতে পারি। মেয়েটা একা, একটা হোস্টেলে অথবা বাসায় একা থাকতো। মা-বাবা-ভাই-বোন-বন্ধু-আত্মীয় কেউ নেই, যাকে সে মনের কথা খুলে বলতে পারে। অথচ ফেসবুকে তার গণ্ডাখানেক ফ্রেন্ড-ফলোয়ার সবই আছে। তার আত্মহত্যার চেষ্টার ভিডিওতে তারা হাজারখানেক লাইক দিয়েছে এবং কমেন্ট বারে নানা ধরনের অলস ফালতু কমেন্ট করেছে।

ফালতু এই কারণেই যে, ওই সময় তার বন্ধুদের উচিত ছিল তার কাছে ছুটে যাওয়া, তার পরিবারকে খবর দেয়া। আমি বিশ্বাস করি, একজন সত্যিকার সহমর্মী বন্ধুর বাড়িয়ে দেয়া হাত অবশ্যই মানুষকে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর কাজ থেকেও দূরে রাখতে পারে।

কিন্তু আর বলে লাভ নেই। আজ আমাদের নব্য তরুণ প্রজন্মের চেহারাটা অনেকটাই এই। তারা চার অক্ষরের একটি শব্দ সেটাও পুরোটা লিখতে পছন্দ করে না। সেই শব্দকে তারা দুই বা তিন অক্ষরে নামিয়ে এনে লেখার এক অদ্ভুত ভাষা সৃষ্টি করেছে। বাংলা ইংলিশ হিন্দি মেশানো সেই ভাষা সাবিরাকেও ব্যবহার করতে দেখলাম।

সাবিরা সেই তরুণ প্রজন্মকে ধারণ করেছে, সে ঢুকে পড়েছিল এমন এক শোবিজ জগতে, যেখানে নেশা আর যৌনতা হাত ধরাধরি করে চলে। এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি, এটাকেই তারা মনে করে আধুনিকতা, এটাই তাদের চোখে একটি ঝলমলে জীবন। চোখে মুখে মেকাপে পোশাকে একটি অত্যাধুনিক তরুণীর প্রতিনিধিত্ব করলেও মাত্র ২২ বছর বয়সে প্রেমিককে বিয়ে করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল মেয়েটি।

কেন? আমার ধারণা, একাকীত্ব, নিরাপত্তাহীনতা, পরিবারের প্রতি আজন্ম তৃষ্ণা আর আবেগ হয়ে উঠেছিল সবকিছুর মূল। সাবিরা হয়তো বিয়ে করে একটা পরিবার চাইছিল, যে তাকে খাইয়ে দেবে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে, যত্ন করবে।

এই জায়গায় এসেই ঠেকে যাই। কষ্ট হতে থাকে রোগা-পাতলা ছোট্ট সুন্দর মেয়েটার জন্য। জীবন আর বয়স একসময় আমাদের এই অভিজ্ঞতা দেয় যে, পৃথিবীতে আসলে মেয়েদের যত্ন কেউ করে না। মেয়েদের মাথায় হাত কেউ রাখে না। নিজের মাথাতে নিজেকেই রাখতে হয় হাত। আর যে পুরুষটিকে ঘিরে মেয়েরা স্বপ্ন দেখে জীবন যাপনের, সেই পুরুষের পরিবার তখন মেয়েটির পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অব্দি যাচাই বাছাই করে। মেয়েটা উগ্র না লক্ষী, মেয়েটা ভদ্র না অসভ্য, মেয়েটার পরিবার ধনী না গরীব, শিক্ষিত না অশিক্ষিত?

এইসব যাচাইয়ের কাজকর্ম করে ছেলের মা বাপ বোন ভাই চাচী দাদী সকলেই। এবং আমি হলফ করে বলতে পারি, এদেশের কোন ছেলের পরিবারই এর থেকে আলাদা কিছু না। কিন্তু এই যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটা মেয়ের জন্য কষ্টকর, বেদনাদায়ক, অভিমানের আর অপমানের। সে না পারে কিছু বলতে, না পারে সইতে।

ছেলের বাড়ির লোক তো মেয়ের দোষ গুন ঠাওরাতে ব্যস্ত, ছেলে কিন্তু বসে নেই। সে কিন্তু তার যৌনতার লাগামও পরায় না। প্রেমিকার সাথে যৌনসম্পর্কেও যায় সে। অবশ্যই দুজনের সম্মতিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। ছেলের বাপ-মা এটা টেরও পায়। কিন্তু এইবেলা তারা চুপ। কারণ তারা জানে, এক্ষেত্রে অবশ্য অবশ্যি নিজের ছেলের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তাই চুপ মেরে থাকে। এই হলো তাদের সামাজিক চেতনা আর রক্ষণশীলতার আসল রূপ।

যাচাই বাছাই করে নির্ঝরের মা-বাপ ভাই নিশ্চয়ই জেনেছিল, সাবিরা মডেলিং করে, সাবিরা একা থাকে, সাবিরা অত্যাধুনিক পোশাক পরে। ব্যস, তারা বেঁকে বসেছে। আর ছেলে তখন মায়েরে রাখে, না প্রেমিকাকে, সেই নিয়ে পড়েছে বেকায়দায়।

যতোই মডেল ফটোগ্রাফি করুক, গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরুক আর ভীষণ আধুনিক শোবিজ জগতে হাঁটাহাটি করুক, ছেলে তো পয়দা হয়েছে সেই রক্ষণশীলতার বীজ থেকেই। সে কীভাবে নিজের প্রেমিকার হয়ে শক্ত পায়ে দাঁড়াবে? অতএব সে নানা তালবাহানা করেছে।

এসব কিছুর পরেও, আত্মহত্যার মত চূড়ান্ত অপরাধ ও মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্তটির পুরো দায়ভার একা সাবিরার। যে কঠিন কঠোর জীবনের পথে তুমি হেঁটে গেছো মেয়ে টানা বাইশ বছর, সেইখানে আরো অনেক কিছু যুক্ত হবার ছিল। তার পুরোটাই কষ্টের বেদনার অথবা যন্ত্রণার নয়। আজ যে অপমান তুমি নিতে বাধ্য হয়েছিলে, তোমার মেরুদন্ডহীন প্রেমিক, তার ভাই বা আত্মীয়র কাছ থেকে, একদিন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেই সেই অপমানের বদলা তুমি নিতে পারতে।

এটাই সত্য। এটাই ঘটে এই জগতে। আর আজ যাকে ছাড়া জীবন অচল আর অসম্ভব মনে হয়েছিল, একদিন হয়তো নিজের বোকামিতে নিজেই হাসতে তুমি। অথচ সেই সময়টা নিজেকে দিলে না। জীবন সুন্দর, কিন্তু দুনিয়াদারি বড্ড কঠিন। আরো বিচ্ছিরি এই আমাদের সমাজ, আমাদের সমাজে তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা। এই  কর্পোরেট  জগত তোমাকে ব্যবহার করবে, কিন্তু তোমার পাশে কক্ষনো দাঁড়াবে না বন্ধু হয়ে। এইখানে কেউ কারো বন্ধু নয়। এই সহজ সত্য জেনে এবং বুঝেই এই জগতে পা ফেলা উচিত ছিল তোমার।

আর প্রেমিক? মনে রেখো, মেয়ের জীবনের আসল প্রেমিক সে নিজেই। নিজেকে ভালোবেসে, নিজের প্রেমে পড়তে পারলেই, কোন নির্ঝর নামের সেক্স স্টার্ভড এর পাল্লায় পড়তে হয় না। নিজের মূল্য নিজে দিতে জানলেই সমস্ত রক্ষণশীলতার মুখে লাথি মেরে জীবনকে ভরে তোলা যায় আনন্দে, ভালোবাসায় আর সফলতায়।

                     

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটা পড়ার পর মন খারাপ হলো খুব।লেখককে ধন্যবাদ। পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় যতদিন না পুরুষের মানসিকতা মানুষের মানসিকতা হবে অর্থাৎ মানবিক হবে ততদিন নারী এমন করেই নিগৃহীত হবে। তাই নারীকে হতে হবে সাহসি। আত্মহত্যা করে ভীরুরা- আত্মহত্য কোন সমাধান নয় কোন নির্যাতনের।

আমিও আপনার শেষদিকের কথার সাথে সহমত। এতো কঠিন একটা শোবিজ জগত সে লালন করছে, তবুও সে মনের দিক থেকে সেই ছোট্ট মেয়েই ছিলো।
শেষে আসলে একাকিত্ততার কাছেই সে পরাজিত।

সাবিরার মৃত্যু কথাকথিত আধুনিক নারীদের মুখে চপোটাঘাত । এটা অবশ্যই দু:খজনক এবং কারো জন্য কাম্র নয় কিন্তু বুঝতে হবে যে নারী অধুনিকতার নামে নিজেকে খুলে দেয় জীবন যৌবন তাতে ওরা ধুধু মধু খাবে, কিন্তু ঘরে তুরবেনা, সাবিরা পারেনি, হ্যাপী পারেনি ।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.