জীবনের টুকরো গল্প: ২

সাকিনা হুদা: পরীবানু নামটা কেন রেখেছিল ওর মা-বাবা, ভেবে পাইনা। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা। চুলগুলো তেমনি ঘনকালো। সবচেয়ে অদ্ভুত কী জানো? ওর বড়বড় কালো কালো বিশাল দুটি চোখ। ঘন কালো চিকন ভুরু। চোখ বন্ধ করলে পাপড়ি যেন পাখনা মেলে।

ওকে সবাই বলে, পেত্নী। সেই পরীবানু, ঘন কালো যার চুল, কুচকুচে কালো যার গায়ের রঙ, লোকে যাকে কালো পেত্নী বলে, সেই কালো মেয়েটির কথাই তো আজ বলবো।

Sakina Hudaপরীবানুর বাবার জমিজমা চাষ করে দিন কাটে। পাঁচ ভাই, তিন বোন, সবচেয়ে ছোট পরীবানু। বড় দু’বোনের বিয়ে হয়ে গেল। ভাইয়েরা নানা কাজেকর্ম জড়িয়ে পড়লো। মা ছিলেন চিররুগ্ন। বাড়িতে লেখাপড়ার ছোঁয়া ছিল না। সেই পরিবেশে পরীবানু কেমন করে যেন নবম শ্রেণিতে উঠে গেল। বাপ চমকে উঠলো।

একী, মেয়ে তো সেয়ানা হয়ে গেল। গ্রামে কানাকানি। বাপ-ভাইয়েরা ব্যস্ত হলো। ‘না’ বলেছিল পরীবানু। বলেছিল, আমাকে তোমরা পড়তে দাও। আমি লেখাপড়া শিখবো। বড় হবো।

ভাইয়েরা বললো, বড় হবি? কত বড় হবি? বড় তো হয়েছিস, ঐ তালগাছটার চেয়েও বড়। আরো কত বড় হতে চাস?

পরীবানুর বিয়ে হয়ে গেল পাশের গ্রামের জমির শেখের সঙ্গে। ওর গোয়াল ভরা গাই-বলদ আছে। পুকুর ভরা মাছ। আরো অনেক অনেক কিছু। জমির শেখের বয়স ৪০ বা ৪২ হবে। কালো কুচকুচে গায়ের রং। চোখ দুটো সর্বদা জ্বলছে ভাটার মতো। পরীবানু ভয় পেয়েছিল।

কিন্তু ভয় পেলে কি চলবে? সংসার করতে হবে তো। তাই পরীবানু সংসারে পা রাখলো। এক নতুন পরীবানু জন্ম নিল। পান থেকে চুন না খসতেই পিঠের ওপর পড়তো কিল চড় ঘুষি।

কোন কাজে চলবে না হেলাফেলা- জমির শেখ ঘোষণা দিল। পরীবানু নিষ্পেষিত হলো। অত্যাচার সয়ে সয়ে মানিয়ে নিল অত্যাচারের সঙ্গে। যেন এটাই স্বাভাবিক, এটাই নিয়ম। চারটি মেয়ে সন্তান জন্মানোর অপরাধে অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেল দ্বিগুণ।

দিন ফুরায়। মেয়েরা চলে গেল পরের ঘরে। ক্লান্ত পরীবানু, শ্রান্ত পরীবানু স্বামীর সেবায় রত। জমির শেখের সেই শক্তি আর নেই। তবুও একটু এদিক-সেদিক হতে পারে না পরীবানুর। ধুপধাপ মারো, কিল, লাথি সব সয়ে সয়ে নির্বিকার পরীবানু। পরীবানুর অতীত নেই, বর্তমান নেই, ভবিষ্যত নেই। তবুও পরীবানু বেঁচে থাকে।

একদিন হঠাৎ করে পরীবানুর আর্তনাদ। ঘুম ভাঙ্গলো পাড়া পড়শির। রাতদুপুরে সবাই এলো, কী ঘটলো, কী হলো? জমির শেখ মারা গেছে। হৃদযন্ত্রের স্পন্দন আচমকা থেমে গেছে। তাই পরীবানু কাঁদছে। চিৎকার করে কাঁদছে। কেউ থামাতে পারছে না। আলুথালু বেশ, মধ্যবয়সী পরীবানুর সদ্য স্বামী হারানোর আর্তনাদ। আর্তনাদ গগনবিদারী, আর্তনাদ মর্মভেদী।

কিন্তু পাশের বাড়ির রহিমার মনে অজস্র বিস্ময়। যে স্বামী মারতো, যার অত্যাচারে পরীবানু বিপর্যস্ত, কখনো কখনো রহিমার মনে হতো, জমির শেখ মরে যায় না কেন? পরীবানু তো বাঁচে! পরীবানুর বেঁচে থাকার ঐ একটি মাত্র পথ। সেই পরীবানু কাঁদছে স্বামীর জন্য। রহিমাও তাই পরীবানুর দুঃখে কাঁদে।

দিন চলে যায়। কান্না ফুরিয়ে আসে। পরীবানু বোরখায় মুখ ঢাকে। হাতের চুড়ি খুলে ফেলে। নাকফুল পুকুরের পানিতে ছুঁড়ে মারে। নিরাভরণ পরীবানুকে অপরূপ দেখায়।

ভাইদের কথা ভুলে গেছে পরীবানু। মনে করতেও চায় না। শুধু মেয়ে কটির মুখ মনে পড়ে। পরীবানু একা থাকতে চায়। কেউ যেন দেখতে না পায়। পরীবানুর জগতে কেউ নেই। সবাই ভাবে, পরীবানু স্বামীকে অনেক ভালোবাসতো। তাই পরীবানুর এত কৃচ্ছতাসাধন। শুধু বিধাতা অলক্ষ্যে হাসেন। (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.