রংচটা প্রাণের দল

শাশ্বতী বিপ্লব: অতঃপর ঈশ্বর নতুন প্রাণ সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করিলেন। সকলে যে তাঁহার মুখপানে চাহিয়া আছে। নষ্ট করিবার মতো সময় একদম নাই।

নিত্য নতুন সৃষ্টির নেশায় এতদকাল তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ব্যাপ্তিই বাড়াইয়াছেন কেবল, কিন্তু পুরাতন সৃষ্টিগুলির ছোটখাটো খুঁত সারাইবার প্রয়োজন বোধ করেন নাই। এইবার করিলেন।

Shaswati 5পৃথিবী হইতে ফিরিয়া গিয়া (লিংক দ্রষ্টব্য) ঈশ্বরের মন ভারী হইয়া রহিল। হাজার হউক নিজের সৃষ্টি, তিনি ভুলিয়া থাকিতে চাইলেও পারিলেন না। তাঁহার মন খচখচ করিতে লাগিল। কি করিলে এই রোগ সারিবে, এতো বিশৃঙ্খলার কারণই বা কি – তিনি ভাবিতে বসিলেন। সম্মুখে রাখিলেন আপাতত তাঁহার নিকট রক্ষিত প্রাণগুলোকে।

এই প্রাণগুলিকে তিনি সৃষ্টির শুরুতে তৈয়ার করিয়াছিলেন। তাহারা শিশু হইয়া জন্মগ্রহণ করে এবং মৃত্যুর মাধ্যমে পুনরায় ঈশ্বরের নিকট ফিরিয়া যায়। ঈশ্বর সেগুলিকে ধুইয়া মুছিয়া আলমিরাতে তুলিয়া রাখেন এবং প্রয়োজনমতো পুনরায় পৃথিবীতে পাঠাইবার ব্যবস্থা করেন। সৃষ্টির আদি হইতে এরূপ নিয়মই চলিয়া আসিতেছে, কখনো কোন ব্যাঘাত ঘটে নাই।

বিষন্ন নয়নে চাহিয়া থাকিতে থাকিতে ঈশ্বরের হঠাৎ খটকা লাগিল। তিনি সবিস্ময়ে আবিস্কার করিলেন, প্রাণগুলিতে কিসের যেন দাগ লাগিয়া রহিয়াছে। তিনি চোখ রগড়াইলেন, ভাবিলেন ভুল দেখিতেছেন না তো!!

নাহ্, ভুল নহে। প্রাণগুলিতে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কালো – হরেক রকমের দাগ লাগিয়া রহিয়াছে। এরূপ তো হইবার কথা ছিল না!! দাগগুলি যেন ঈশ্বরের দিকে তাকাইয়া ব্যঙ্গ করিতে লাগিল।

তিনি শংকিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমাদের গায়ে দাগ কেন? যতদুর মনে করিতে পারি, আমিতো ভালোমতোই ধুইয়াছিলাম।”

একটি প্রাণ বলিয়া উঠিলো, “দাগ নেই তো শেখাও নেই”, জানোনা!! ইহা আমাদের পূূর্বজন্মের দাগ। ট্যাটু বানাইয়া পোক্ত করিয়া লাগাইয়া লইয়াছি। ধুইলেও যাইবে না।”

ঈশ্বর যারপরনাই বিরক্ত হইলেন। বলিলেন, “তোমরা এমনটা করিতে পারো না। পূর্বের জন্মের সকল স্মৃতি মুছিয়া নতুন জন্ম নেয়াই নিয়ম।”

ঈশ্বর পুনরায় পরিস্কার করিবার উদ্যোগ লইতেই কতিপয় প্রাণ প্রতিবাদ করিয়া উঠিলো। তাহারা পূর্বের জন্মের স্মৃতি মুছিতে চায় না। বলিল, “তুমি চাহিলেও এই দাগ উঠিবে না। একটিবার ভালোমতো তাকাইয়া দেখো আমাদের কী হাল। এই রদ্দি মাল দিয়া আর কতদিন চালাইবে? তুমি আমাদের আর নিষ্পাপ প্রাণ বানাইতে পারিবে না। আমাদের “ডেইট এক্সপায়ার্ড” হইয়া গিয়াছে, দেখিতে পাওনা?”

এইবার ঈশ্বরের নিকট সবকিছু পরিস্কার হইয়া গেলো। প্রাণগুলি বহু ব্যবহারে জীর্ণ হইয়া পরিয়াছে। জায়গায় জায়গায় রং চটিয়া গিয়াছে আর পূর্বের জন্মের দাগ শক্ত করিয়া আটকাইয়া গিয়াছে। আর এই রং চটা প্রাণগুলাই দলবল লইয়া পৃথিবীটার রং চটাইয়া ফেলিতেছে।

ঈশ্বর বুঝিলেন সবটুকু। তাঁহাকে নতুন প্রাণ তৈরি করিতে হইবে। পুরাতন গুলি দিয়া আর কাজ চলিবে না, আর তাঁহার প্রিয় পৃথিবীও বাঁচিবে না।

যতদিন পর্যন্ত না নতুন প্রাণ তৈরি সমাপ্ত হইতেছে ততদিন পৃথিবীতে শান্তি আসিবে না। পৃথিবী নতুন প্রাণের জন্য পথ চাহিয়া রহিল। নতুন করিয়া ভরসা স্থাপন করিল সৃষ্টিশীল ঈশ্বরের উপর – যে ঈশ্বর সকলের।

(লিংক: ঈশ্বর ফিরিয়া গেলেন https://womenchapter.com/views/14304 )

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.