শ্যামল কান্তি স্যারকে বাঁচান প্লিজ

সুমন্দভাষিণী: দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পরও সেলিম ওসমানদের দম্ভ এতোটুকু কমেনি। তা তার একটি ভিডিও কথোপকথন থেকেই বোঝা গেল, মানুষের ভাষা এতো খারাপ হতে পারে, বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্যের, তা ওই ভিডিও না দেখলে বোঝার সাধ্যও ছিল না। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তাঁকে এই ভিডিওটি শোনানোর ব্যবস্থা করবে নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট মহল। নইলে ধরে নেবো সবাই ওসমান গংদেরই লোক। ঊনি তা শুনে দেখি কী ব্যবস্থা নেন তাঁর প্রিয় আত্মীয়দের বিরুদ্ধে।

Shaymol Kantiএদিকে কিছুক্ষণ আগেই একটা স্বস্তির খবর পাওয়া গেল যে, নারায়ণগঞ্জে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছিতের পর বরখাস্ত করা পিয়ার সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল ঘোষণা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। এর ফলে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি স্ব পদে বহাল থাকবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

যেইমাত্র একটু স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছিলাম শিক্ষামন্ত্রীর কথা শুনে, পরক্ষণেই আরেকটি ভিডিও এসে মনে ত্রাস সৃষ্টি করলো। কোথাকার কোন ভূঁইফোড় একটি সংগঠন তাহরিকে খতমে নবুয়্যত বাংলাদেশ। তারা সেলিম ওসমানের হয়ে শ্যামল কান্তি স্যারের ফাঁসির দাবিতে মিছিল করছে। তাদের বক্তব্য:

” সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে যারা নেমেছেন তারা ধর্ম বিরোধী-রাষ্ট্র বিরোধী l বামপন্থী নাস্তিকদের আমি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলছি, বর্তমান এমপির সাথে যে দ্বন্দ্ব, তা সিটি কর্পোরশনের সাথে দ্বন্দ্ব নয়, এটা হচ্ছে মোছলমানের সাথে নাস্তিকদের দ্বন্দ্ব’। যারা এই কথা বলতে পারে, তারা অনায়াসেই লাশ ফেলতে পারে দিনে-দুপুরে, আর আমরা তো জানিই এখানে ধর্মের (ইসলাম) নামে লাশ ফেললে কোনো বিচার হয় না।

দেশজুড়ে শ্যামল কান্তি স্যারের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় যেভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে, তাতে করে ওসমান গংরা যে বসে থাকবে না, তারা যে এর প্রতিশোধ নেবে না, তাতো বলাই বাহুল্য। তবে চাপটা কোনদিক থেকে আসবে, সেটা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

যেহেতু শ্যামল কান্তি স্যার নারায়ণগঞ্জেই আছেন, ওসমানদের নখের ডগাতেই আছেন, কাজেই তাঁর জীবনের ঝুঁকিটা এখন আর উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমরা ঢাকায় বসে হাজার হাজার প্রতিবাদ করতে পারি, ফেসবুকে প্রতিবাদের বন্যা বইয়ে দিতে পারি, কিন্তু স্যার, স্যারের পরিবার, স্যারের তিন মেয়ে, তাদের নিরাপত্তা কে দেবে?

এইদেশে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে সহজ তরিকা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ। এরই মধ্যে টাঙ্গাইলের একজন দর্জিকে খুন করা হয়েছে প্রকাশ্যে তিনবছর আগে কথিত অবমাননার অভিযোগে। স্যারকেও ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরাতে গিয়ে সেই তরিকাটাই বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেখানে যোগ হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ইন্ধন, কাজেই গত দুবছরে এই ধর্মের নামে যতগুলো খুন হলো দেশে, সেইভাবেই যে শ্যামল কান্তি স্যার নাই হয়ে যাবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

মূলত নারায়ণগঞ্জের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওই এক ঘটনার মধ্য দিয়েই বর্তমান বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। যেমন আছে সংখ্যালঘু ইস্যু, ধর্মানুভূতি অবমাননার ইস্যু, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়া, ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র বেয়াদবি।

সুতরাং শ্যামল কান্তি স্যারকে পুনর্বহালের আশ্বস্তিতেও শান্তি মিলছে না মনে, স্যার বেঁচে থাকবেন তো? মসজিদের মাইকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ শুনে আশেপাশের চিরপরিচিত মানুষজনই তো নেমে এসেছিল স্যারকে মারতে, ওরা তো থাকবে এখনও। সেই ২২ বছরের পুরনো এলাকাটিকে স্যার কি আর আগের মতো আপন ভাবতে পারবেন?

অধ্যাপক কাবেরী গায়েন লিখেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশের খবরটি আংশিক ভালো খবর। জনগণের জাগরণের বিজয়। কিন্তু শুধু এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট না। এই যে খতমে নব্যুয়তের মিছিল বের হলো, এই ধাক্কা সামলাবে কে? তাই আন্দোলন বহমান রাখা জরুরি।

১। শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভদ্র ও তাঁর পরিবারকে পুলিশী নিরাপত্তা দেয়া হোক।

২। সেলিম ওসমানকে আইনপ্রণেতা হয়েও আইন নিজের হাতে তুলে নেবার জন্য প্রাপ্য শাস্তি দিতে হবে। তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল ঘোষণা করা হোক। ১৪ দল থেকে মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, তিনি সাংসদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছেন।

৩। উন্মুক্ত জনপরিসরে যে অপমান করা হয়েছে, সেজন্য ক্ষতিপূরণের মামলা করা হোক সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে। আইনজীবীরা ভূমিকা রাখতে পারেন।

৪। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, দেশের প্রচলিত আইনে তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

জানি না কাকে বললে কী লাভ হবে। তবুও বলছি, যার যতোটুকু ক্ষমতা আছে, তাই দিয়েই স্যারকে প্রাণে বাঁচান এখন। এতোকিছুর পর স্যারের কিছু হলে বাংলাদেশই হেরে যাবে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.