ধর্মের বর্ম

তামান্না ইসলাম: আমার মেয়ের জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যেই একদিন সকালবেলা আমার পাঁচ বছরের ছেলের স্কুল থেকে ফোন পেলাম, সে কী যেন দুষ্টামি  করেছে, এখনই যেতে হবে স্কুলে প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলতে।  আমার সিজারিয়ানের সেলাই তখনো ঠিকমতো শুকায় নাই, সেই নিয়েই ছুটলাম স্কুলে। আমার মা তখন বাসায়। যাওয়ার সময় কিছু বললেন না, মুখটা দেখলাম থমথমে। আসার পর আমাকে বসিয়ে ঠাণ্ডা গলায় ঊনি কিছু কথা বললেন।

Old Home 1ঊনি দীর্ঘ ত্রিশ বছরের উপরে শিক্ষকতা করেছেন। কানাডায় এসে ঊনি দেখছেন এখানে শিক্ষক-শিক্ষিকারা কথায় কথায় বাচ্চাদের বাবা-মায়ের কাছে নালিশ করে, নিজেরা বাচ্চাদের চরিত্র গঠনে কোন দায়-দায়িত্ব নিবে না। সেই নালিশ শুনে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়, রেগেমেগে উল্টা ছেলেকেই বকতে থাকি।

আমার ছোটবেলায় আমি তো কখনই দেখি নাই বাসায় কোনো নালিশ আসতে,  শুধু আমার না, আমার ভাইদেরও। আমার মায়ের এক কথা “শিক্ষক শিক্ষিকা ছাত্রদের দ্বিতীয় বাবা-মা। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে ছাত্রদের চরিত্র গঠন করা। সব ছেলে, মেয়ে এক রকম হয় না। একজন শিক্ষককে জানতে হবে কী ভাবে তাদের সবার সাথে আলাদাভাবে চলতে হবে। একজন ভালো ছেলে বা ভালো ছাত্রকে পড়িয়ে ভালো ফলাফল পাওয়ায় শিক্ষকতার সার্থকতা না, একটা  দুষ্টু, অমনোযোগী বা দুর্বল ছাত্রকে টেনে তোলাই হলো শিক্ষকদের দায়িত্ব।”

তিনি আমার চোখ খুলে দেন। “তাইতো, আমার ছেলেকে মানুষ করার একটা বিরাট দায়িত্বই তো আমি সঁপে দিয়েছিলাম ওর শিক্ষকদের কাছে।”

আমি বলবো এই একটি ব্যাপারে আমাদের দেশ অনেকখানি এগিয়ে ছিল পাশ্চাত্যের তুলনায়।  বিদেশে আসার পর থেকে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের ব্যবধান জিনিসটা আমাকে খুব পীড়া দিত। আমি সারা জীবন দেখেছি আমার মায়ের ছাত্র- ছাত্রীরা তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে, সে হিন্দুই হোক, মুসলিমই হোক। নিজের ছাত্রদের কথা বলতে গেলেই আমার মায়ের মুখে এক অদ্ভুত আলো খেলা করে, অহংকার আর তৃপ্তি মেশানো আলো।

Teacher Student 2মাঝে মাঝে হিংসা হতো, ওদেরকে নিয়েই মার বেশী অহংকার আমাদের চেয়েও। আমার স্মৃতিতে আম্মুর অসংখ্য ছাত্রের চেহারা মনে আছে, যাদের কথা আমরা জানতাম বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাণ্ডা। কিন্তু আম্মুর কাছে দল, মত নির্বিশেষে সব ছাত্রই “বাবা”। বাংলাদেশের যে কোন প্রান্তেই যাই না কেন, কোথা  থেকে যেন এসে হাজির হয় কোন এক বাবা বা মা। হাসিমুখে সালাম করে বলবে “আপা আমি আপনার অমুক ব্যাচের ছাত্র। এখন পুলিশে আছি।…এখন কলেজে পড়াই। আপা আমার ওয়াইফ, বাচ্চা। এই তোমরা এদিকে আসো, তোমাদেরকে সালমা আপার কথা বলেছিলাম না। আপা আমাদের মায়ের মতো।”  

আমার বিদেশে এসে মনে হতো, বুয়েটের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিলাম, আসলাম এই দেশে, এই অসাধারণ সম্মানতো জীবনে কখনই পাবো না অন্য কোনো পেশায়, আর এই দেশে তো কোন কিছুর বিনিময়েই এই সম্মান জুটবে না। এখানে শিক্ষকরা মানুষের জীবন গড়ার কারিগরও না, আর শিক্ষকদের আলাদা কোন সম্মানও আমার চোখে পড়ে নি।

এতো গেলো আমার মায়ের কথা, এবার একটু নিজের কথা বলি। না শিক্ষক হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা না, আমার প্রিয় কিছু শিক্ষক শিক্ষিকার কথা যারা আমার জীবনে না আসলে আজকের এই আমির কোন অস্তিত্বই হয়তো থাকতো না। ক্লাস সিক্সের ক্লাস টিচার ছিলেন ইসমত আপা, বাংলা পড়াতেন।  

শুদ্ধ বাংলা বলা, লেখা, সাহিত্যর প্রতি আগ্রহ এইসব শেখানোর সাথে সাথে মানুষ হিসাবে আমার চিন্তার বিকাশ, আচরণে, কথায়, চলায় যত ধরনের মানবিক সৌন্দর্য হতে পারে সব কিছুর উপরে ভীষণ জোর  দিতেন। নতুন স্কুলে, নতুন পরিবেশে আমাকে সত্যিকারের মায়ের স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন তিনি। সেই স্নেহটা আমাকে সারাজীবন এমনকি আজও ঘিরে আছে।

বিয়ের দাওয়াত নিয়ে আপার বাসায় গেছি দেখা করতে। আপার স্বামী কিছুদিন আগেই মারা গেছেন। সদ্য বৈধব্যের প্রবল শোকের মাঝেও উনি আলমারি থেকে যত্ন করে বের  করলেন কোন এক বিশেষ দিনে ওনার প্রয়াত স্বামীর উপহার দেওয়া একটা শাড়ি। সেই শাড়িটার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে আমার জন্য কতো না স্নেহ আর নতুন জীবনের জন্য প্রাণ ভরা দোয়া। এখনো দেশে গেলে ওনার সাথে আমি একবার দেখা করবোই।

আরেকজন ছিলেন ক্লাস সেভেনের বিজ্ঞানের শিক্ষিকা। দুর্দান্ত ছাত্রী ছিলেন আবার বেজায় রসিক। ওনার কাছে বিজ্ঞান পড়েই আমি বিজ্ঞানের প্রেমে পড়ি। আর আমার উপরে ওনার অগাধ আস্থা আমাকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। আমাদের দেশের আমাদের জেনারেশনের আশেপাশের সব ছেলে মেয়ের জীবনেই এমনি কোন ইসমত আপার অবদান আছে।

কিন্তু দিন বদলাচ্ছে। এই মা, বাবার মত শিক্ষক শিক্ষিকাদের উপরেও নেমে আসছে অপমান, নির্যাতন, লাঞ্ছনা। গতবছর ময়মনসিং এর একজন শিক্ষককে দিগম্বর করে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে রাজশাহীর একজন শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে আর সম্প্রতি শ্যামল কান্তির কান ধরে উঠ বস করানোর ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে।

শিক্ষকদের  অপমানের ঘটনাটি একদম নতুন নয়, কিছুদিন ধরেই চলছে। তবে পার্থক্য যেটা সেটা হোল ধর্মকে বর্ম করে যা ইচ্ছা তাই করার অপকৌশলটি। অবস্থাটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যার প্রতি যার যত রাগ আছে, ক্ষমতা থাকলে এবং কোন মতে ধর্মের সাথে সংযুক্ত একটা বানোয়াট  ঘটনা দাঁড় করাতে পারলেই আর কিছু চাই না, মানুষ মার, দিগম্বর কর, নাকে খত দেওয়াও, কান ধরাও, বেত মার, এসিড মার, জ্বালাও, পোড়াও।

শুধু ঢালটিকে সুকৌশলে ব্যবহার করতে পারলেই হলো। অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, আবেগ প্রবণ মানুষের ইমোশনকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির এই কৌশলকে না রুখলে দেশ কিছুদিনের মধ্যেই এক গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে যাবে। তখন কিন্তু কোন বর্মই আর রক্ষা করতে পারবে না কাউকে, সে হিন্দুই হোক, মুসলিমই হোক, নাস্তিকই হোক বা অন্য কিছু।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.