মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান

তাসলিমা আক্তার: যুগটা ইন্টারনেটের। সারা বিশ্ব এখন মুঠোর ভেতর। খবরগুলোও শুয়ে বসে গাড়িতে কিংবা হাঁটার সময় ফোনের মনিটরে দেখতে পাই। নিউজ পোর্টালগুলো আর বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াগুলো আমাদেরকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে।

Taslima Akterপ্রতিদিন খবরের তাজা শিরোনাম হয়, কাটা গলা ফুঁড়ে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের কথা কিংবা তরুণ-তরুণীর বীভৎস মৃত্যুদৃশ্য, লাল মশুরদানার মত মরণ নেশা ইয়াবা ধরা পড়ার কাহিনী। ভিডিও ক্লিপে দেখি শ্যামল কান্তি নামের কোনো এক প্রবীণ শিক্ষকের কানে ধরে উঠ-বসের দৃশ্য। তিনি শাস্তি নিতে নিতে ঢলে পড়ে যান, আবার তাঁকে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু দু’তিন দিন আগে দেখলাম একটি অন্যরকম ভিডিও ক্লিপ। অনেকদিন এতো সুন্দর কোনো দৃশ্য দেখিনি।

ভিডিওটিতে ভালোবাসার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে দুমিনিটেরও বেশি সময় ধরে। শুদ্ধতম ভালোবাসা। নয়জন কলেজ ড্রেস পড়া তরুণ-তরুণী কাঁধে ব্যাগপ্যাক। হাতে হাত রেখে তারা ঘিরে রেখেছে দুজন প্রেমিক প্রেমিকাকে। দুলে দুলে আনন্দ প্রকাশ করছে। মাঝে দাঁড়িয়ে আছে চিরায়ত প্রেম। আহা!! মেয়েটি খুনসুটি করে একবার চলে যাচ্ছে। ছেলেটি কন্যার মানভঞ্জনে ব্যস্ত। তরুণ প্রেমিকটি মেয়েটিকে ছুঁয়ে দিচ্ছে মমতায়। পরিশেষে ছেলেটি হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটির সামনে।

“উইল ইউ মেরী মি”?

লাজরাঙ্গা মেয়েটির বাড়িয়ে দেয়া আঙ্গুলে ছেলেটি পরিয়ে দেয় প্রপোজাল রিং। এই হচ্ছে ভিডিওটির সারবস্তু।

যে দৃশ্যটা বর্ণনা করলাম সেটি ধারণ করেছে ঢাকা কমার্স কলেজের শিক্ষার্থীরাই। এতো গেলো সুন্দরের কথা, ভালোবাসার কথা। পরে জানলাম, ভালোবাসার দায়ে ঢাকা কমার্স কলেজের সেই নয়জন শিক্ষার্থীর ভর্তি বাতিল করা হয়েছে। মূল দুজন মানে প্রেমিক-প্রেমিকাকে কলেজ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো, কলেজের “শৃঙ্খলা ভঙ্গের”।

ওদের অপরাধ ওরা ভালোবেসেছে। ভালোবাসার কথাটা সবাইকে জানিয়েছে। প্রেম ভালোবাসার মতো জৈবিক মানবিক ব্যাপারগুলো কৈশোরেই মানুষ স্বাভাবিকভাবে প্রাপ্ত হয়। এমনওতো হতে পারতো ওরা গোপনে লুকিয়ে-চুরিয়ে প্রেম করতো, ডেট করতো, আরও কিছু হয়তো করতো। কাকপক্ষিও টের পেতোনা সেই কদর্য প্রেমের কথা। ওরা তা করেনি। সবার চোখের সামনে জানিয়েছে নিষ্কলুশ ভালোবাসার আরতি। আর সেই দায়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ অভিযোগ এনেছে শৃঙ্খলা ভংগের।

Commerce Collছেলেমেয়েগুলোর বয়স আঠারো পেরোয়নি হয়তো কারোই। যদি অপ্রাপ্ত বয়সও ধরা হয়, তাহলেও বলবো, ছেলেমেয়ের বিয়ের বয়স ধরা আছে, কিন্তু ভালোবাসবার জন্য কি কোনো নির্ধারিত বয়স ধরা আছে? কিশোর বয়স থেকেই স্বাভাবিকভাবে মানুষ একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করবে। এটা আবহমান কাল ধরে ঘটে আসছে। জোর করে এর ব্যতিক্রম ঘটাতে গেলেই বিপদ।

আমরা ধরে নেই যে তরুণ-তরুণী প্রেমে জড়িয়ে গেলো তো সে আসলে গোল্লায় গেলো। তাদের গায়ে খারাপ ছেলেমেয়ের স্টিকারটা লাগিয়ে দেই। কিন্তু সুস্থ প্রেমই বাঁচিয়ে রাখতে পারে এই বয়সীদের নানা ধরনের বিপথে যাওয়া থেকে। ভালোবাসার নেশাটা বড় নেশা, তাই যে ভালোবাসে তার আর অন্য কোনো নেশার প্রয়োজন হয় না।

চোখের সামনে কত ধরনের অপরাধের বিচার হচ্ছে না। চারপাশে চোর খুনি ধর্ষক নেশাখোররা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু শাস্তি পেলো কয়েকটি তরুণ প্রাণ, তাও আবার ভালোবাসার দায়ে।   

রাতে দুঃস্বপ্নের মাঝে থাকি, সকাল বেলা আমাদের ঘুম ভাঙ্গে দুঃসংবাদ দিয়ে। সেখানে এক পশলা মধুর হাওয়া বইয়ে দিয়েছিলো ছেলেমেয়েগুলো। নিষ্পাপ ভালোবাসা প্রকাশ করাটা হয়ে গেছে তাদের অপরাধ। যেই দেখবে বুঝতে পারবে ভিডিও ক্লিপটির কোথাও কোনো ন্যুইসেন্সের নাম গন্ধও নেই। আজকাল অন্যসব কিছুই ধোপে টেকে। টেকেনা শুধু হৃদয়ের প্রকাশ। লিখলেও পাপ, বললেও পাপ আবার ভালোবাসলেও পাপ। হাহ্‌!!!!

https://www.youtube.com/watch?v=qkqCNemTe5w

 

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.