লাভলীকে বেচে দিয়েছিল দীপক

সেবিকা দেবনাথ: ঘটা করে বেশ ডাকসাই যৌতুকের বহর দিয়েই মেজ বোনের মাসুতুতো দেবরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল লাভলীর। পাত্র দীপক একেবারে ফেলনা না। বিদ্যার জোর খুব একটা না থাকলেও দেখতে ভাল। কুমিল্লায় জুয়েলারির ব্যবসা আছে। লাভলীর বাবা অনেক বছর আগেই মারা গেছেন।

বড় ভাইদের সংসারে ভাঙ্গনটা সেই থেকেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন সেই ভাঙ্গন এতটাই শক্ত পোক্ত হয়েছে যে তা কোন মতেই জোড়া মিলবার নয়। এমনকি অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার বিষয়েও এক ভাই আরেক ভাইয়ের সঙ্গে একত্রে বসে আলাপ করতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে বিয়েতে অমত করার কোন সুযোগই ছিল না লাভলীর। তাছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একই এলাকায় শ্বশুর বাড়ি হওয়ায় লাভলী বেশ খুশিই ছিল। মনে মনে ভেবেছে, আর যাই হোক মন চাইলেই অসুস্থ মাকে এসে দেখা যাবে।

SEBIKAরূপকথার গল্পের শেষে যেমন থাকে ‘অতপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল….’ এই বাক্যটা লাভলীর বৈবাহিক জীবনের শুরুতেই এসে গেল। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, দেবর-ভাসুর নিয়ে ভালোই যাচ্ছিল কাটছিল। বড় ছেলেটা জন্মাবার পরই পট পরিবর্তন শুরু হয়। দীপকের ব্যবসায় লসের পরিধি বাড়তে থাকে। আর বাড়তে থাকে দেনার পরিমাণ। সংসার ভিন্ন হলো। সেই সঙ্গে চেনা দীপক কেমন যেন অচেনা হতে শুরু করে।

প্রথম পর্যায়ে বাবার বাড়ি থেকে টাকা এনে দেয়ার বায়না, অপারগতা প্রকাশ করলে অশ্রাব্য গালাগাল, আর গায়ে হাত তোলার কাজটা শুরু করে দীপক। বাংলা চলচ্চিত্রের নায়িকার মত ‘সর্বংসহা’ ভাব নিয়ে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে থাকে লাভলী। এই ‘সর্বংসহা’ ভাব যে কোন কালেই সুখ বয়ে আনেনি এবং আনতে পারে না এটা লাভলী তখন বুঝতে পারেনি।

দ্বিতীয় পর্যায়ে লাভলীর আত্মীয়-স্বজনের সাথে খারাপ আচরণ, স্ত্রীকে মারার জন্য হাতে লাঠি-সোটা উঠে। তবুও লাভলীর মানিয়ে চলার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। ইতোমধ্যে ছোট ছেলেটা পৃথিবীতে আসে। সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো সব ঠিক হবে। কিন্তু অমানুষ মানুষ হয় কখনও? দুই পরিবার একত্রে বসে বিষয়টা সুরাহার চেষ্টা করে। কিছু দিন ভাব-ভালবাসা থাকলেও তা স্থায়ী হয়নি।

তৃতীয় ধাপে বালিশ চাপা দিয়ে ও খাবারে বিষ মিশিয়ে লাভলীকে মারার চেষ্টা করে দীপক। অনেকটা ভাগ্যের জোরেই বেঁচে গেছে লাভলী।

নাটকীয়তায় ভরা জীবনের অনেক বড় সত্যটা তখনও অজানা ছিল লাভলীর। সংসারের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে উঠে লাভলী। মা বেঁচে থাকলেও ভাইদের সংসার অনেকটাই লক্ষ্মীছাড়া। মুখ ঝামটা, কটু কথা নিয়ে কোন রকমে দিন পার করা। অন্য বোনদের আর্থিক অবস্থাও যে খুব ভাল তেমনটা নয়। কোন রকমে দিন গুজরান হয় তাদেরও। ছেলে দুটোর পড়ার খরচ ও মাসের হাত খরচটা চলতো বোনদের পাঠানো টাকায়।

অনিশ্চয়তার মধ্যেও এ জীবন নিয়ে অনেকটা স্বস্তিতে ছিল লাভলী। আর যাই হোক মেরে ফেলার ভয় তো নেই এখানে।

বেশ কিছুদিন পর দীপক এসে হাজির। ভাল হয়ে যাবার ভান করে যাতায়াতের পথটা তৈরি করে নেয় দীপক। তবে ভাল মানুষের মুখোশটা ঠিক যেন ‘ফিট’ হচ্ছিল না তার। একদিন যথারীতি বেরিয়ে এলো দীপকের অমানুষের চেহারাটা। দরজা বন্ধ করে লাভলীর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে চম্পট দেয় সে। খালি হাতে যায়নি। হাতের কাছে বাড়ির বেশ কিছু দামী সামগ্রী নিয়ে গা ঢাকা দেয়। লাভলীর পরিবার দীপকের নামে থানায় মামলা ঠুকে দেয়। তার খোঁজ কেউ জানে না। তবে অনেকে বলা বলি করছিল হয়তো বর্ডার পেরিয়ে ভারত চলে গেছে।

জীবনের আরও কিছু দিন ভালোই কাটে লাভলীর। তবে শনি দেব কিছুতেই যেন পিছু ছাড়ছিল না তারা। অনেকটা বদলে গেছে এমন একটা ভাব নিয়ে বছর দেড়েক বাদে আবার দীপক হাজির হয় লাভলীর জীবনে। গ্রামের সবাই ঠিক করলো এইবার আর ছাড় দেয়া যাবে না। দীপককে পুলিশে দেয়া হবে। দীপক তাতে রাজি হয়। থানায় গিয়ে নিজেই দোষ স্বীকার করে। বেশ কিছু দিন হাজতেই কাটালো দীপকের। সময় গড়ায়। একসময় ছাড়াও পায়। নিজের ভুল স্বীকার করে নতুন করে আবার সংসার সাজানোর অভিপ্রায় জানায় লাভলীর কাছে।

সন্তানদের ভরণ পোষন, ভাইদের সংসারের অশান্তির কথা ভেবে প্রস্তাবে রাজি হয় লাভলী।

দীপক লাভলীকে বললো, স্বর্ণের ব্যবসার পাট চুকিয়ে দূরে কোথাও গিয়ে সংসার করবে ওরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বর্ডারের কাছাকাছি একটা জায়গায়। ভারত থেকে মালামাল এনে দেশে বিক্রি করার একটা ভাল কাজ পেয়েছে দীপক। কাজটা ভাল করে করতে পারলে ধার দেনা শোধ করা যাবে। লাভলী রাজি হলো। ভালোই যাচ্ছিল দিন। একদিন ফোনে দীপক লাভলীকে জানালো, বর্ডার দিয়ে মালামাল আনতে গিয়ে ধরা পড়েছে সে। লাভলীকে আসতে হবে। লাভলী এলে হয়তো ছাড়া পাবে দীপক। লাভলীকে আনতে বাসায় একজন লোক আসবে। লাভলী যেন ওই লোকটার সঙ্গে চলে আসে।

স্বামীর এই বিপদের দিনে পাশে থাকবে না লাভলী? এটা কি কখনও হয়? শেষ বিকেলে বাসায় লোক হাজির। লাভলীও তৈরি। বেশ কিছু দূর যাবার পর লাভলীর মনটা কেন যেন খচখচ করতে লাগলো। কত দূর নিয়ে যাচ্ছে লোকটা? কোনো কথাও বলছে না। তবুও লোকটার সঙ্গে হেঁটে চলেছে। এক সময় বর্ডারের খুব কাছাকাছি এলে লাভলী দেখলো পাশের লোকটা বর্ডারের পাশে দাঁড়ানো তিনজন লোককে হাত তুলে ইশারা দিলো। লোকগুলো এগিয়ে এলো। লাভলীকে দাঁড় করিয়ে রেখে ওরা কী যেন কথা বলছে।

লাভলী লক্ষ্য করলো ওর সঙ্গে থাকা লোকটা তিনজনের কাছে টাকা চাইছে। কানটা খাড়া করে লোকগুলোর কথাগুলো বোঝা ও শোনার চেষ্টা করতে লাগলো লাভলী। ওদের কথাবার্তায় লাভলী যা জানলো তাহলো, দেনার তিন লাখ টাকা শোধ করতে লাভলীকে দীপক বেঁচে দিয়েছে। ওকে এখন বর্ডার পার করে নিয়ে যাওয়া হবে ভারতে। সেখানকার কোন এক পতিতালয়ে তাকে বিক্রি করা হবে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না লাভলী।

রাতের অন্ধকার ছাপিয়ে রাজ্যের অন্ধকার যেন নেমে এল লাভলীর চোখে। মানুষ এমনও হয়!!! এত প্রবঞ্চক!!! অন্ধকার ঠেলে তখন দুই ছেলে আর মায়ের মুখটা যেন আলো নিয়ে এলো লাভলীর কাছে। ওর চোখ গেল একটু দূরে দাঁড়ানো এক লোকের দিকে।

‘হলে হলো, না হলে নাই’ এমন একটা চিন্তা করে জীবনের সবটুকু শক্তি দিয়ে দৌঁড়ানোর চেষ্টা করে লাভলী। ওর পেছন পেছন দৌঁড়ায় ওই লোকগুলো। ঘটনাটা দেখে দূরে দাঁড়ানো লোকটা লাভলীর দিকে একটু এগিয়ে গেল। নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়লো লাভলী। দূরের লোকটা তখন খুব কাছাকাছি। লাভলী চিৎকার করে সাহায্য চাইতে থাকে। ওকে বাঁচানোর আকুতি করতে থাকে। এবার দূরের ওই লোকটার দৌঁড়ানোর গতি বাড়লো। সে এসে মাটি থেকে লাভলীকে তুললো। হাঁপাতে হাঁপাতে লাভলী শুধু বললো, ‘আপনি আমার ধর্মের ভাই। আমাকে বাঁচান। ওই লোকগুলো আমাকে বেঁচে দিয়েছে।’

লোকটা পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে ফাঁকা গুলি করলোা। এই শুনে লোকগুলো এলোপাথাড়ি দৌঁড়ে পালিয়ে গেল। ভয়ঙ্কর একটা জীবন থেকে রক্ষা পায় লাভলী। যার কারণে লাভলী অভিশপ্ত এক জীবন থেকে বেঁচে গেল তার নাম ফেরদৌস। সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষার কাজ করেন তিনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জীবনের বেশ খানিকটা গল্প ফেরদৌসকে বলে ফেললো লাভলী। ছেলে দু’টোর কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানায়। ফেরদৌস লাভলীকে নিয়ে গেল ওর বাসায়। দীপকের যে কোনো হদিস পাওয়া যাবে না তা লাভলী এবং ফেরদৌস খুব ভাল করেই জানতো। লাভলী ও তার ছেলেদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই ফেরদৌস ওদের নিয়ে গেল তার বাড়িতে। বাবার বাড়ির পথটা প্রকাশ্যে খোলা থাকলেও অদৃশ্য বড় একটা বাধা যে সেখানে রয়েছে তা বেশ ভাল করেই জানে লাভলী।

তাই ফেরদৌসের বাড়িতেই ওরা থাকলো। কে জানে ওই লোকগুলো কখন এসে হাজির হয়? তখন কী করবে সে? ছেলে দু’টোর ভবিষ্যৎ কী? এই ভয়, অনিশ্চয়তা তাকে সব সময় ঘিরে রাখে। মায়ের সাথে ফোনে কথা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য মাকে নেয়া হয়েছে ঢাকায় মেজ বোনের বাসায়। মৃত্যুপথযাত্রী মাকে এই কথাগুলো বলতে পারলো না লাভলী। ভাই-বৌদি এদের বললে যে আর কোনদিনই ওই বাড়ির পথ মাড়াতে পারবে না, তা লাভলী ভালো করেই জানে। মেজ বোনকে ফোনে সব বলে বুকের ভেতরটা হালকা করলো সে। কেননা লাভলী জানে আর যাই হোক মেজ বোন কখনও ওই কথাগুলো কাউকে বলতে যাবে না।

ওরা এখন ফেরদৌসের বাড়িতেই আছে। ফেরদৌসের বাবা-মাকে দেখাশোনা করে আর ‘শখ’ করে শেখা সেলাইটাকে লাভলী বেছে নিয়েছে জীবনের উপার্জনের পথ। হোক সন্তানের বাবা, তাতে কী, এমন অমানুষের সাথে কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না লাভলী। লাভলী ভাবে আমাদের দেশে হিন্দু ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদের কোন বিধান নেই কেন? ওই অমানুষটার পরিচয় থেকে কি মুক্তি মিলবে না লাভলীর?

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.