আমি যখন নীরব দর্শক

জেসমিন চৌধুরী: গত শুক্রবারে কলেজে  আমার এক পুরোনো ছাত্র, যাকে ছয়মাস আগে জেনারাল ইংলিশ কোর্স করিয়েছি, আমাকে খুঁজে বের করে বিদায় জানিয়ে গেল নিজ দেশে ফিরে যাবার আগে। সেইসাথে লাজুক মুখে আমার হাতে ধিরিয়ে দিল বেশ চৌকস চেহারার একটা ছোট ব্যাগ। ভেতরে রাংতা মোড়ানো একটা ছোট বাক্স।  সে নিজেও তার নিজ দেশ অর্থাৎ সৌদী আরবে মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক। তা সত্তেও তার সাথে ক্লাসের নিয়ম কানুন, বিশেষ করে মোবাইল ফোনের ব্যবহার  নিয়ে আমার অনেক ঝগড়া হত। তার জন্য ক্ষমা চাইল, আবার আমার সাথে একটা সেলফিও তুলে নিয়ে গেল।

Teacher Student 2আমার এক সহকর্মী ইংগিতপূর্ণ হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘অ্যানি স্পেশাল রিজন জেসমিন?’ আমিও হেসে উত্তর দিলাম, ‘আই অ্যাম স্পেশাল।’ উপহারটা খুললাম না তখনি, আচারের মতো চেখে চেখে ধীরে ধীরে অনেক সময় ধরে  উপভোগ করতে চাইছিলাম শিক্ষকতা জীবনের এক দুর্লভ মুহূর্ত। কাল সকালে যখন প্যাকেটটা খুললাম বেরিয়ে এল জর্জিয় আরমানি সি’র এক বোতল পারফিউম। আমার চোখ ছানাবড়া। এত দামী পারফিউম আমি আগে কখনো ব্যবহার করিনি। 

এরকম মুহূর্ত আমার জীবনে আগেও এসেছে, বিশেষ করে সিলেটে ও’ লেভেল পড়ানোর সময়। ভাল ফলাফল নিশ্চিত করতে গিয়ে ছাত্রদের উপর অনেক নির্যাতন করেছি কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছি নিছক ভালবাসা আর শ্রদ্ধা। কখনো বা তারা আমারই ড্রইং রুমের আসবাব পত্রের পেছনে লুকিয়ে থেকে আমাকে দিয়েছে বার্থডে সারপ্রাইজ, কখনো বা নিজের হাতে বানানো একটা থ্যাঙ্ক ইউ কার্ড।

আজো তাদের অনেকে ফেইসবুকে লম্বা মেসেজ পাঠায়, নিজের সাফল্যের কথা জানায়, কখনো বা নিজের কোন কষ্টের কথা শেয়ার করে। আমি প্রায়ই অনেককে বলতে শুনি আজকাল ছাত্রদের মধ্য থেকে শ্রদ্ধাবোধ উঠে গেছে, কিন্তু আমি এর সাথে দ্বিমত পোষণ করি। হয়তো বা এজন্য যে আমি নিজে  শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা ছাড়া ছাত্রদের কাছ থেকে কিছুই পাইনি।  

গত ষোল বছরে শিক্ষক হিসেবে আমি ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি তা অবশ্য ছাত্র হিসেবে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একেবারেই আলাদা।

Teacher Studentতখন আমরা শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বাধ্য ছিলাম বলেই হয়তো সব সময় সত্যিকারের শ্রদ্ধা অনুভব করতাম কি’না জানি না। স্কুল জীবনে যদিও দু’একজন শিক্ষক পেয়েছিলাম যারা আজীবন আমার কাছে দিকপ্রদর্শক বা বাতিঘর হয়ে থাকবেন, বেশিরভাগ শিক্ষকদের কাছে ক্ষমার অযোগ্য সব অত্যাচার সহ্য করেছি, কারণ তখন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কিছু বলার নিয়ম ছিল না। বলতে গেলে আমরা মা-বাবার কাছে উল্টো চড়-চাপড় খেতাম। তখন থেকেই স্বপ্ন ছিল, বড় হয়ে শিক্ষক হবো, এবং ছাত্রদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবো না।

ইংল্যান্ড এসে আমি প্রথম বুঝতে পারলাম শিক্ষকরাও মানুষ, তাদেরও জবাবদিহিতার একটা ব্যাপার আছে, এবং তারা ছাত্রদের সাথে খারাপ আচরণের জন্য শুধু চাকুরীই হারায় না, জেলে পর্যন্ত যায়। দেখে মনে বড় সুখ হয়েছিল, আর এই সুখানুভব ছিল শিক্ষকদের হাতে আমার  শৈশবের সব বিচারহীন অপমানের বিলম্বিত প্রতিশোধ।

পরবর্তিতে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে শিক্ষকতা করার সময় আমার শৈশবের অপ্রিয় স্মৃতির পাশাপাশি এসব অভিজ্ঞতা শিক্ষক হিসেবে আমার নিজের আচরণ নির্ধারণে অনেক সাহায্য করেছিল। আমার মতে শিক্ষকদেরকে ছাত্রদের সাথে কথা বলার সময় অনেক সতর্ক হওয়া্র প্রয়োজন, কারণ তারা যা বলেন তা স্মৃতির পাতায় বয়ে নিয়ে বেড়ায় তাদের ছাত্ররা এবং এই বোঝা যতো হালকা হয়, ততোই কি ভাল নয়?

এখন সময়  অনেক পরিবর্তন হয়েছে, এবং বাংলাদেশেও শিক্ষকদের জবাবদিহিতার একটা ব্যাপার সৃষ্টি হয়েছে। এটার প্রয়োজন আছে, কারণ জবাবদিহিতা ছাড়া কোন কাজেরই গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অন্যসব পেশাজীবীর মত শিক্ষকরাও যদি অন্যায় করেন, তাদেরকেও আইনের আওতায় অবশ্যই আনা উচিৎ।  

কিন্তু কষ্ট পাই যখন পত্রিকায় পড়ি ছাত্রীর সাথে ছোটখাটো এক বিতর্কের পর শিক্ষক ভয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেন না, ধর্মীয় কটুক্তির অজুহাত তুলে কান ধরে উঠবস করানো হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন শিক্ষককে। তখন ভাবি যে শাস্তি আমি অবোধ শিশু হিসেবে আমার সবচেয়ে জঘন্য শিক্ষকের জন্যও কল্পনা করতে পারিনি, সেই শাস্তি কোনো আদালতের বিচার ছাড়াই একজন এমপি’র উপস্থিতিতে একজন শিক্ষককে কিভাবে দেওয়া হয়?

আমার জর্জিয় আরমানির বোতল এখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি ছাত্র হিসেবে নির্যাতিত ছিলাম এবং শিক্ষক হিসেবেও সহকর্মীদের উপর নির্যাতন নীরবে দেখে যাচ্ছি।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.