‘গার্লস ডে আউট’

নায়না শাহরীন চৌধুরী: খুনোখুনি, অপমান, আর হাজারটা ঘটনা রোজ ঘটছে। কোপ খাবার কোপানলে পড়া আমার পোষাবে না। আমার বাচ্চাটাকে কে দেখবে? ইতিবাচক কিছু লিখতে সাম্প্রতিক অনেক কিছু ভাবলাম। খুঁজে পেলাম না।

মেয়েরা এমনিতেই মূর্খ। ভাবছি স্কচটেপও কিনব, মুখটা পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করে দিলে সবাই ভাল বলবে। জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘের মতো পরিস্থিতিতে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’র বিবৃতি হওয়ার চেয়ে বরং হাসির একটা ঘটনা বলি। মাঝে মাঝে হাসাও জরুরি।

13219628_10154199888917188_2090498922_n
ফ্যান্টাসি কিংডমে আমরা (বাঁ থেকে সিমি, আমি আর শাম্মী)

আমাদের তিন বন্ধুর গল্প। তখন আমি মাত্র অনার্সে ভর্তি হয়েছি। আমার দুই বন্ধু সিমি আর শাম্মী আবার বোন। সেই ক্লাস টু থেকে। বয়সের ঊনিশ-বিশ কাটিয়ে তবুও তুমুল বন্ধুতা আমাদের। একদিন দেখা না হলে হাঁসফাঁশ লাগে। কোন কথা না বললে অস্বস্তি হয়।

আমরা মেদ কমাতে একসাথে শরীর চর্চা করি আর একটা চকলেটের বাক্সে যা পারি টাকা জমাই। আনন্দ, বোকামি এক সাথে ভাগ করে নেই। একজনের সমস্যায় আরেকজন বাঁচাই। তো, আমরা একবার ঠিক করলাম, ফ্যান্টাসি কিংডম যাবো। শুধু তিনজন।

সিমির বাসার অবস্থা কড়া, বড় ভাই, বোন, বাবা’র চোখ রাঙ্গানি এড়াতে, আমরা তিনটা মেয়ে বাসে করে আশুলিয়া যাবো সেটা বলা হলো না, শুধু আন্টিকে (শিমি-শাম্মীর আম্মু) ভুজুং-ভাজুং দিয়ে ম্যানেজ করা হলো। এখন অনেকের কাছে এই পরিস্থিতিটা হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু ঘটনা হলো তখন আমরা তিনজন তরুণী লোকাল বাসে করে ফ্যান্টাসি কিংডমের মতো অতদূরে যাবো সেটা অকল্পনীয় ছিল।

আমাদের কাছে ছিল অ্যাডভেঞ্চার। শুধু যাওয়া নয়, পোশাক হবে প্যান্ট-শার্ট। আমরা যে এলাকায় থাকতাম, সেটি জামাত অধ্যুষিত এলাকা। সেখানে কুটনা প্রতিবেশীর অভাব ছিল না। যাদের প্রধান কাজ ছিল, বাইনোকুলার ফিট করে কে কি করে তা ওয়াচ করা, আর বাড়ি বয়ে আকথা-কুকথা শোনানো।

তো ভাবছিলাম, প্যান্ট শার্ট পড়ে বেরুবো কি করে। ঠিক হলো, কামিজের নিচে শার্ট প্যান্ট পরে, ফ্যান্টাসি কিংডমে ওয়াশরুমে গিয়ে চেঞ্জ করব। আমাদের প্ল্যান ছিল, ফ্যান্টাসি কিংডমের নিজস্ব বাসে যাওয়ার। কিন্তু ওদের বুথে গিয়ে জানা গেল, বাস আসবে দুপুর তিনটায়। তখন তো সিন্ডারেলাদের জন্য ফেরার সময় হয়ে যাবে। কি করা যায়। পরে অন্য বাসে যাওয়া হলো।

সেদিন ছিল বিজয়া দশমী। ফ্যান্টাসিতে গিয়ে আমাদের আক্কেল গুরুম। লোকে লোকারণ্য। রোলার কোস্টারের লাইন কোথায় শেষ, ঠাওর শেষ পর্যন্ত করা গেলেও চড়ার আশা বাদ দিয়ে অন্য রাইড খুঁজে তাতে চড়তে চড়তে চারটা বেজে গেল। রোদে পুড়ে, খিদেয় ততোক্ষণে আমরা শেষ। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতেই হবে। কিন্তু ভাল বাস পাচ্ছি না। যেটা পেলাম, তাতে বাসী সিঙ্গারা খেয়ে উঠে পড়লাম কোনমতে।

Nainaবাসও সুন্দরমত গোধূলি লগনে হাইওয়েতে নষ্ট হয়ে গেল। ভয়ংকর ব্যাপার। টেনশনে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিভাবে ঢাকায় ফিরবো? বাসের কিছু যাত্রী দয়া পরবশ হয়ে একটা রিকশা ঠিক করে দিল। সামনে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত।

একদিকে লেকের পাশে লাল টকটকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে, আরেকদিকে আমরা তিনটা মেয়ে রিকশায় টেনশনে ছটফট করছি, আর রিকশা চলছে কচ্ছপের মতো। পাশ দিয়ে কোন বাস গেলে আমরা হাউমাউ করে হাত উঁচিয়ে ডাকছি। বাসের ছাদে বসা ফাজিলগুলা সে সুযোগে টাঙ্কি মেরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু বাস থামাচ্ছে না। পাশ দিয়ে হুশ হাশ করে ইয়েলো ক্যাবগুলো চলে যাচ্ছে, কিন্তু টাকা-পয়সাও তেমন নাই যে একটা ক্যাব ভাড়া করবো। পরে দেখলাম এভাবে আর হবে না। সন্ধ্যা নেমে গেছে।

ভাড়া যা হয় বাড়ি গিয়ে মেটাবো, ক্যাব নেওয়াই উচিৎ হবে। একটা ক্যাব থামিয়ে উঠে পড়লাম। গাড়ি চললো ঝড়ের গতিতে। বিপদ এখানে শেষ হলে ভাল হতো। কিন্তু না, উত্তরা ৭নং সেক্টরে পুলিশ ধরলো। সেখানে সেই পুলিশ সার্জেন্ট যুক্তি দেখালো, যে গাড়ি থামতে বললেও ড্রাইভার থামায়নি, আমাদের জেরা করলো। সেখানে অনেক অনুনয়-বিনয়ের পরে ছাড়া পেলাম কোনমতে।

বাড়ি ফিরে দেখি আন্টি (সিমি-শাম্মীর আম্মু) শুকনা মুখে ছুটে এসেছে, বাসায় কী বলবে ভেবে না পেয়ে। পরে বাসায় গিয়ে শিমি-শাম্মী কিভাবে ট্যাকেল দিয়েছিল পরিষ্কার মনে নেই। কিন্তু সেদিনের সেই ‘গার্লস ডে আউট’ সারাজীবন মনে থাকবে। আমরা আজ যা, যতটুক, তা এরকম অনেক বাধা সমস্যা পেরিয়েই তো। নিজের ইচ্ছেগুলোকে ডানা দিতে কাঁটা মাড়িয়ে চলার নামই তো জীবন, নয় কি?

-সঙ্গীত শিল্পী ও লেখক।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.