ধর্মের সম্মান ও অসম্মান

কাকলী তালুকদার: শোকেসে যে টি-পট আর দামি কাপগুলো সহজে নীচে নেমে আসে না তাদেরকে বড় গামলা করে আজ ধুয়া হচ্ছে। প্রতিদিন সবার চা একটা বড় থালায় করে কাপগুলো সাজিয়ে দেয়া হলেও আজ বড় ট্রে টা নেমেছে শোকেস থেকে। আর অঞ্জলী রানী বিয়ের আগে নীল কাপড়ের উপর কুশি কাটার কাজের যে টেবিল ক্লথ নিজের হাতে বানিয়েছিলেন সেইগুলো আলমারি থেকে নামিয়ে টেবিলে পেতে দিয়েছেন। একই রঙের বিছানার চাদরে সাদা এপ্লিকের কাজ করা সেই চাদরটাও বিছিয়েছেন কাছারী ঘরের বিছানায়। বাকি বিছানায় অন্য চাদর দেয়া।

অঞ্জলী রানী নিজের হাতের করা বিছানার চাদর বা টেবিলের কভার যত্ন করে আলমারিতে রেখে দেন। বিশেষ কোন অনুষ্ঠান ছাড়া টি-পট, কাপ, ট্রে, নিজের হাতের কাজগুলো ব্যবহার করেন না।
আজ বাড়িতে অনিল বাবুর দোস্ত মতি মিয়া আসবেন মোহনগঞ্জ থেকে। তাই অনিল বাবু আর অঞ্জলী রানীর ঘরে চলছে আয়োজন। কয়েকদিন হয় অনিল বাবু আর মতি মিয়া দোস্ত পেতেছেন।

মতি মিয়া আসার সময় কয়েকজনের বহর নিয়ে আসছেন সাথে উনার বন্দুক। বেড়াতে এসে হাওরে পাখি শিকার করবেন মতি মিয়া। গ্রামের বাড়িতে তখনও বিদ্যুৎ নেই, নীল রঙের টেবিল কভারসহ টেবিল পাতা হলো পুব দিকের আম গাছের নিচে, সাথে চেয়ার, বেঞ্চি রাখা হলো। দুপুরে তাঁরা খাবে, রান্না হচ্ছে, মাছ, মাংস, ডাল আরও অনেক কিছু। সাথে নিজেদের গাভীর খাঁটি দুধ তো আছেই।
মতি মিয়া নামাজ পড়েন নিয়মিত, তাই ওযুর পানি দেয়া হলো বালতি করে। কাছারী ঘরে যে বিছানায় নীল এপ্লিকের চাদর বিছানো হলো ওখানেই মতি মিয়া নামাজ পরে নিলেন।

BOISHAKHI 1অনিল বাবু তাঁর স্ত্রী আর চার সন্তানকে নিয়ে নেত্রকোনায় যাওয়ার আগে দোস্তর বাসায় সবার সাথে দেখা করে যাবেন। মতি মিয়ার বাসায় যে হাঁড়ি পাতিল ওই গুলোতে প্রতি সপ্তাহে গরুর মাংস রান্না করা হয়। আজ ঊনার দোস্ত অনিল বাবু পরিবার নিয়ে আসছেন। মতি মিয়া সহযোগীকে বাজারে পাঠালেন নতুন হাঁড়ি- পাতিল কিনে আনতে। নতুন হাঁড়ি-পাতিল এনে রান্না হলো ঘরে। অনিল বাবুর মুরগি বলি বা জবাইতে কোন সমস্যা নেই। মাছ, মাংস সবই রান্না হলো।
বর্তমান-
গত ৮ তারিখ পাশের সিটি থেকে দুইটা পরিবার এসেছিল। মাছ, ডিম, সব্জি, চাটনি, খিচুড়ি রান্না করে বক্সে করে খাবার নিয়ে গেছিলাম বাইরে। সবাই এক সাথে ঘুরবো, খাবো, আর চিকেনটা বারবিকিউ করে জঙ্গলেই খাবো বলে পরিকল্পনা হলো।

সমস্যা হলো আমরা এই ছোট্ট শহরে একমাত্র বাঙালী পরিবার তাই হালাল চিকেনের নিশ্চয়তা দিতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত হালাল চিকেনটা ঊনাদের একজনকে সাথে নিয়ে আসার অনুরোধ করলাম আমরা।
আমরাও সেই চিকেন বারবিকিউ মজা করেই সবাই খেয়েছি।

Religion and Politicsসেদিন ছিল মাদার্স ডে, সেই সাথে এক পরিবারের ভাইটির জন্মদিন, অন্য পরিবারের বিবাহ বার্ষিকী। বাসায় কেক আর ফুল নিয়ে এলাম। সারাদিন ঘুরাঘুরি শেষে বাসায় এসে দুই রকমের কেক কেটে মজা করে সবাই সবার ঘরে ফিরে গেল।

আমার বরের এক কলিগ হযরত, আমাকে  সিস্টার বলে সম্বোধন করে আমিও তাকে ব্রাদার বলেই ডাকি। তার বাড়ি কাবুলে, কানাডায় সবচেয়ে বেশী যে মানুষটি আমাদের ঘরে খেয়েছে। আমার রান্না তার খুব পছন্দ তবে সে হালাল খায়, নিয়মিত নামাজ পড়ে। সে যেদিন আমাদের সাথে খাবে সেদিন মাছটা একটু বেশী রাখতে চেষ্টা করি।

কারণ মাংসের হালালের নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি না বলে। লাস্ট যখন ক্যালগেরি গেলাম তাদের বাসায় আমরাও খেয়ে আসলাম। যখন আমরা ক্যালগেরি থেকে এই শহরে আসি আমাদের মালপত্রের জন্য যে বড় গাড়িটি ব্যবহার করেছি সেই গাড়িটি সে নিজে ড্রাইভ করে এনেছে চার ঘন্টা। যেন আমাদের বাড়তি টাকা খরচ না হয়। আমরা এখান থেকে আগামী মাসে চলে যাবো. যাওয়ার আগে হযরতের পরিবার আমাদের সাথে দুইদিন থাকতে আসবে আগামী মাসে এখানে।

আমি যখন বাংলাদেশে গেলাম পাশেই কিন্ডারগার্টেনে আমার মেয়েকে দিলাম ভর্তি করে। যে কদিন দেশে থাকবো আমাদের নিজস্ব পরিবেশটাতে একটু অভ্যস্ত হউক। বাংলা জানতে হবে অবশ্যই, যেহেতু আমাদের নিজস্বতা বাংলা। তাদের পাঠ্যবই কিনে যখন বাংলা বইটি দেখলাম আমি অবাক!

kakoliআমার মেয়ের হাতেখড়ি যে বই দিয়ে শুরু হবে সেখানের প্রথম ৪টি  স্বরবর্ণের  শব্দ এবং বাক্যগুলো আমার বিস্ময়ের কারণ হলো।
অ-অলি, অজু। আ- আলো, আম।( দ্বীনের আলো পথ দেখায়)। ই-ইমান, ইলিশ (ঈমান যার ঠিক আছে)। ঈ-ঈদ, ঈগল (ঈদের খুশি তার কাছে)।
কোমল মনের প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর না দিতে পারলে তারা মন খারাপ করে। আর আমি চাইনা আমি নিজে না জেনে ভুল কিছু তাদের শিখাই। তাই অজুর সঠিক উত্তর এবং দ্বীনের আলোর অর্থ জানাতে আমার সময় লেগেছিল। ঈদ এবং ইমান সম্পর্কে আমার খুব ভাল ধারণা আছে তাই বেগ পেতে হয়নি।
এই বইয়ের বিষয়ে আমি স্কুলের প্রিন্সিপালের সাথেও কথা বলেছি।  আপনারা বাচ্চাদের জন্য এমন বই কেন পাঠ্য করলেন যেখানের শব্দ বাচ্চাদের বুঝতে কষ্ট হবে!
এর উত্তর এখন দিন দিন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে।

গত সপ্তাহে এস এস সি পরীক্ষার রেজাল্ট হলো, হিন্দু ধর্মে অনেকেই ফেইল করেছে! একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যাও করেছে! কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানলাম, অনেক স্কুলে হিন্দু ধর্মের কোন শিক্ষক নেই! এমনকি যারা কোচিং করে সেখানে সব সাবজেক্ট পড়ানো হলেও হিন্দু ধর্মের শিক্ষার্থীরা ১০০ নাম্বার পিছিয়ে থাকছে সব সময়!

আরেক দাদা জানালেন, উনার মেয়ে চার বছর ধরে ইসলাম ধর্ম বই পড়ছিলেন স্কুলে হিন্দু ধর্মের শিক্ষক নেই বলে!
অনেকটা এমন ব্যঞ্জন বর্ণে ‘ক্ষ’র মতো! বইয়ে উপস্থিতি নেই অক্ষরটির অথচ শিক্ষা আর শিক্ষকের সাথে ‘ক্ষ’ জড়িয়ে আছে আত্মার মতো।
হাডুডু জাতীয় খেলা হলেও ক্রিকেট এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা আমাদের! হাডুডু খেলা আমাদের বাচ্চারা বইয়ে পড়ছে বাস্তবে জানে না এই খেলা কি!

আমাদের বাচ্চারা জানে না আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা কোথায় ফোটে! দোয়েল পাখি জাতীয় হলেও শিক্ষার্থীরা জানে না দোয়েল পাখি বাস্তবে কেমন!
এই যে আমাদের জাতীয় সব কিছু বিলুপ্ত হচ্ছে, সাথে হিন্দু ধর্মের শিক্ষকও, এই বিষয়গুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার মধ্যে পড়ে কিনা  সেগুলো চিন্তার বিষয়।  তাই সময়ের  সাথে সাথে পরিবর্তন বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ! প্রতি বছর আমাদের মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে, বাজেটের পরিবর্তন হচ্ছে। ১০ টাকার ডিম ৪০ টাকা দিয়ে খেতে হচ্ছে। কম্পিউটার এর জায়গা দখল করে নিয়েছে  আই ফোন।
পরিবর্তন হচ্ছে না সেটাও সত্য না, যেমন আমরা শিখেছি আ- আমটি আমি খাবো পেড়ে। এখন আ- দ্বীনের আলো পথ দেখায়। আমার শিশুমন আ -তে আম গাছ থেকে আম পেড়ে খাওয়া পড়ার সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। তবে আমার সন্তানের চোখে আ-তে  দ্বীনের আলোর কোন স্পষ্ট ছবি আমি দাঁড় করাতে পারিনি এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

তাই পরিবর্তন যে হচ্ছে না সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই! এই যেমন  অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পরিবর্তন হয়ে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে প্রতিদিন।
গোপালভারের গল্পটা এখন খুব মনে পড়ে। গোপালভার কিপ্টে বিধবা পিসির বাড়িতে বেড়াতে গেছে! পিসি নিরামিষ খায়, তাই নিরামিষ খাবারই খেতে হবে গোপালকে, পিসি যেহেতু কিপ্টে খাবার পরিমাণও অল্প, তাই খেতে বসে পকেটের রান্না করা চিংড়ি বিধবা পিসির খাবার প্লেটে ভাতের নিচে লুকিয়ে রাখলো। খেতে বসে পিসি যখন দেখলো প্লেটে চিংড়ি মাছ,  তখন নিজের অজানা পাপ লুকাতে সব খাবার গোপালের প্লেটে তোলে দিলো, আর বললো আরো কিছু দিবে যেন মানুষের কাছে এই খবর না পৌঁছে!
এই চিংড়ি মাছ প্লেটে লুকিয়ে রাখা যদি গোপাল একদিন করে তবে গোপাল বুদ্ধিমান। আর প্রতিদিন যদি সবার সাথে এই কাজটি করা হয় তবে সেটা গোপালের চালাকি। চালাকি কোন সময় সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারে না।
এই অন্ধকার যুগে যখন বেঁচে থাকাটাই বড় বেশী পাওয়া মনে হয়, সেখানে স্বপ্ন দেখাতে পারেন সেই শিক্ষক খুন হয়ে যান নিজের শিক্ষার্থীর হাতে! স্কুলের হিন্দু শিক্ষকেরা ইসলাম অবমাননার দায়ে যাচ্ছেন কারাগারে! ২২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমপির উপস্থিতিতে হিন্দু প্রধান শিক্ষক সকল শিক্ষার্থীর সামনে কানে ধরতে বাধ্য!
বৌদ্ধ ভিক্ষুর লাশ পরে থাকে পথে! সে দেশে জি পি এ -৫ পেয়ে হিন্দু ধর্মের শিক্ষার্থীরা ফেইল করবে এটাই তো স্বাভাবিক!
আমাদের অতি ধর্ম পরায়ণ অভিভাবক গণ নিজের সন্তানকে লেলিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকের উপর! তাতে মদদ যোগাচ্ছে আমাদের  সরকার, প্রশাসন।
স্বাধীনতার পর ধর্মের মান-সম্মান যতটা পরিবর্তন হয়েছে, আমাদের  সামাজিক জীবন এবং শিক্ষা জীবন ঠিক ততখানি নিচে নেমেছে!

১৪ মে ২০১৬

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.