আমার অনুভূতি তিনবার আহত, কিন্তু চাপাতি নেই!

শারমিন শামস্: একটা দুর্দান্ত দিন গেল আজ। সকালে উঠছি, মোবাইলে টুং টাং করে ৩২১ থেকে এসএমএস। গলা কেটে মেরে গেছে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে। ম্যাসেজ পড়ে হাই তুলতে তুলতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বাইরে রোদ উঠেছে। গরম পড়েছে ম্যালা। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বয়স নাকি ৭০ এর কাছাকাছি। লোকটা নেহাতই সাদাসিদে আর শত্রুহীন ছিল বলে জানিয়েছে তার স্বজনরা।

লোকটাকে তবে মারলো কে? এসব ভাবতে ভাবতেই ফিরে গেলাম নিজের কাজকর্মে। দিন গড়াবার আগেই এদেশের সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা, সবচেয়ে প্রতিভাধর, বিচক্ষণ, মন্ত্রিপরিষদের রত্নতুল্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারফত জানতে পারলাম, খুনি কে! খুনি ওই স্বজনরাই। তারাই গলা কেটে খুন করেছে ভিক্ষুকে। মন্ত্রি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উন্মোচন করে ফেলেছেন।

সাবাশ! আমরা এমন মন্ত্রিই চাই! তিনি আরো বলেছেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মানে ঐ উগ্রতাবাদীদের ঘটিয়ে যাওয়া ঘটনাগুলো থেকে এটা আলাদা। এদিকে মন্ত্রী স্যার দুদিন আগে বলেছিলেন, আইএস টাইএস নেই। সেগুলোও বিচ্ছিন্ন ঘটনা!

নাহ! সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আর ভাবতে পারছিনে বাপু। তারচেয়ে ফেসবুকে বসি। বসলুম। একি! সাকিব আর শিশির তার ছোট্ট মেয়েকে জড়িয়ে ধরে নতুন ছবি পোষ্ট করেছেন। সেখানে একজন চোস্ত ইংলিশে এত অশ্লীল একটা মন্তব্য করেছে, রাস্তায় পড়ে থাকা মলমূত্র আর বমি জরায়ুতে প্রবেশ করানো ছাড়া কোনো মায়ের পক্ষে এ ধরনের মন্তব্যকারী সন্তান জন্ম দেয়া অসম্ভব।

Moonmoonসারা বিকেল ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনাগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতেই দূরে সরে ছিলাম সবকিছু থেকে। যা হয় হোক। এত কিছু আর নিতে পারি না।  আমি একটা সুস্থ দেশে সুস্থ সমাজে সুস্থ চিন্তা চেতনার মানুষ এবং সৎ সুস্থ সরকার প্রশাসন নিয়ে সুন্দর করে বাঁচতে চাই। এটা সম্ভবত আমার অধিকারের মধ্যেই পড়ে।

কিন্তু আজ জানি, আমি এই সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কোনভাবেই আর সুস্থ জীবনে ফিরতে পারছি না আপাতত। তাই দূরে দূরে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে কী এক প্রয়োজনে আবারো অনলাইনে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলাম, এতবার লাথি খাবার পরও, আমি নির্লজ্জ বেহায়া বেকুব, সেই দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত ওসমান পরিবারের খ্যাতিমান সেলিম ওসমানের নির্দেশে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন শিক্ষক, যিনি জীবনের ২২টা বছর শিক্ষকতা করে কাটিয়েছেন। অভিযোগ কী? অভিযোগ হলো, তিনি ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কটুক্তি করেছেন। প্রমাণ? না, কোন প্রমাণ নেই। কোন প্রমাণ, বিচার আচার আদালত কিছুই নেই। কিন্তু হাকিমের হুকুম আছে এবং শাস্তি প্রয়োগ সম্পূর্ণ হয়েছে। এবং এরিমধ্যে সেই হতভাগা শিক্ষকের কানে ধরা ছবি ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, নিউজ পোর্টালে, পত্রিকায়। কানে ধরানোর আগে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে গণধোলাইও দেয়া হয়েছে। আরো গণরোষ থেকে বাঁচাতে তাকে নেয়া হয়েছে পুলিশ হেফাজতে।

শিক্ষক শ্যামল কান্তি এখন কোথায় কেমন আছেন, আমি জানি না। তবে আজ ২৪ ঘণ্টায় অন্তত তিনবার আমার অনুভূতিতে তীব্র থেকে তীব্রতর এবং তীব্রতম আঘাত এসেছে। আমার অনুভূতি আহত হয়েছে। একজন বৃদ্ধ নিরীহ মানুষ, যিনি বুদ্ধের অহিংস ধর্মের প্রচারণার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন, তাকে গলা কেটে মেরে রেখে গেছে এবং এদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গুরুদায়িত্ব যার কাঁধে তিনি আবারো হুংকার দিয়ে জানিয়েছেন, কিচ্ছু ঘটেনি। সব ঠিক আছে। এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

এদেশের ক্রিকেটে গৌরবের অন্য নাম প্রিয় সাকিব আল হাসানকে কদর্য মন্তব্য করে নির্দ্বিধায় বুক ফুলিয়ে বেড়াচ্ছে কোন এক বেজন্মা। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন ব্যবস্থা নেবার কোন লক্ষণ এখন পর্যন্ত নেই, হবেও না। অথচ তারানা হালিম, জুনায়েদ আহমেদ পলকের মতো গালভরা বুলিওয়ালা মন্ত্রী আমাদের আছে, যারা সারাদিন আমাদের নানাভাবে জ্ঞান বিতরণ করেই যাচ্ছেন।

সর্বশেষ, একজন স্কুল শিক্ষকের বেদনাকাতর, অপমানিত, পরাজিত, ঘর্মাক্ত কানে ধরা চেহারা আর পাশে দাঁড়ানো সেলিম ওসমানের তেল চকচকে চেহারা…।

মাননীয় রাষ্ট্র, মাননীয় সরকার, আজ এই ১৪ই মে দুই হাজার ১৬ সাল রোজ শনিবার, পর পর তিনবার আমার অনুভূতিতে চূড়ান্ত আঘাত এসেছে। এই আঘাত কতোটা গভীর তা বোঝার মতো মানসিক শিক্ষা ও সহমর্মিতা আপনাদের হয়তো নেই। এবং আমার মত একজন সামান্য নাগরিক, যার পিছনে কোন রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড নেই, তার অনুভূতির কানাকড়ি মুল্যও নেই আপনাদের কাছে, এ তো আমি জানি।

এবং সবচেয়ে করুণ ও পরাজিত অধ্যায়টি হলো, আমাদের অনুভূতি প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় এত এতবার চূড়ান্ত আঘাতে পর্যুদস্ত হবার পরও, আমাদের হাতে কোনো চাপাতি নেই যে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো, কুপিয়ে আসবো, রক্ত ঝরাবো।

আমরা একটি পরাজিত জাতির পরাজিত তরুণ প্রজন্ম, যারা প্রতিদিন নিজের হৃদয় আর মগজ নিজেরাই কুপিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করি আর ভান করি আমরা এখনো এই দেশে বেঁচেবর্তে আছি। ধিক আমাদের!

 

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.