নিরাশায় আশার কথন

0

শারমিন জোহরা সিমি: সবসময় পজিটিভলি ভাবতে ভালবাসি। নিরাশায়ও আশা খুঁজি, আশা রাখি। এক নিরাশা থেকে আশার কথা শেয়ার করব আজ।

আমার বিয়ে হয়েছে নয় বছর। আমার একমাত্র কন্যার বয়স দুই। অর্থাৎ বিয়ের সাত বছরে আমি তাকে পাই। আর এর মাঝের দীর্ঘ সময় ছিল আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান। যদিও আমার বিশ্বাস ছিল, আশা ছিল। কিন্তু আমার স্বামী অনেকটাই নিরাশ হয়ে পড়েছিল।

বিয়ের প্রথম বছরে আমি প্রথমবার গর্ভধারণ করি। যেদিন প্রেগন্যান্সি পরীক্ষার রিপোর্ট পজেটিভ পাই, সেই সকালটা ছিল ছুটির দিনের সুন্দর এক সকাল। বিষয়টা জানার পর বাসায়, শ্বশুরবাড়ি একে তাকে ফোন করে বেড়াচ্ছিলাম আমরা। এই আনন্দে স্বামী আমায় দু’সেট থ্রিপিসও কিনে দিল কয়েক ঘন্টার মধ্যে।

Baba 2কিন্তু আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না, দু’সপ্তাহ পর অর্থাৎ প্রেগন্যান্সির সাত সপ্তাহের মাথায় সব উবে গেল। এক সকালে উঠেছি অফিসে যাব, ব্রাশ করতে গিয়ে দেখি প্রচণ্ড পেট ব্যথা, দাঁড়াতে পারছি না। সেই ব্যথা ক্রমশ বাড়তে বাড়তে তীব্র হয়ে জ্ঞান হারাচ্ছি, বমি করছি।

সেদিন আমার বোন ছিল আমার বাসায়, মামা শ্বশুর এলেন- হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো আমায়। ধরা পড়লো- একটোপিক প্রেগন্যান্সি, অর্থাৎ জ়রায়ু ছাড়া অন্য কোথাও ভ্রুণের অবস্থান ও বৃদ্ধি। যা জ়ীবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমার হয়েছিল টিউবাল প্রেগন্যান্সি, অপারেশনের আগেই বাম টিউবটা ফেটে যায়। যাহোক অপারেশন হলো, সেই অপারেশন তথাকথিত সাকসেসফুল হলেও শুদ্ধ হলো না।

ডাক্তার বলেছিলেন, ছয় মাসের মধ্যে বেবি প্ল্যান না করতে, আমরা এক বছর অপেক্ষা করলাম। শরীরে আরো একটি টিউব অবশিষ্ট থাকলেও আমি আর কন্সিভ করলাম না, অন্তত এক বছর। তারপর চিকিৎসা, এই ডাক্তার, সেই ডাক্তার। পরীক্ষা করে দেখা গেল আমার অন্য টিউবটি কাজ করছে না। সত্যি বলতে কি সে সময় যে একটুও নিরাশ হইনি তা নয়। তবে তার ব্যাপ্তি ছয়-সাত দিনের বেশি নয়। নিজের মনে নতুন করে আশা, সাহস, বিশ্বাস কিভাবে পেলাম বলতে পারব না।

Sharmin Shimiডায়াগনসিসের জন্য আবার একটা ছোট অপারেশন মানে ল্যাপারস্কপি করা লাগল। দেখা গেল, প্রথম অপারেশনে আগের ডাক্তারের ভুলের খেসারত দিয়ে বেড়াচ্ছি আমি। তিনি আমার বাম টিউব কেটেছেন ঠিকই, কিন্তু ডান্ দিকেরটাও পেঁচিয়ে রেখেছেন। কিছু পুরনো রক্তও পরিস্কার করা হলো।

তার দেড় মাস পর বেবির কথা ভাবতে বললেন। তিন মাস পর আবার কন্সিভ করলাম। এবারও আশায় নিরাশ হতে হলো। এবারেও এক্টোপিক। আবার অপারেশন থিয়েটারের ট্রে’র ওপর যেতে হলো অল্প সময়ের নোটিসে। স্বামীকে থিয়েটারের ভেতরে ডেকে নিল। তাকে দেখালো- এবারে টিউবাল ছিল না, প্রথম অপারেশনে যে টিউব কাটা হয়েছিল, সেটির মুখ ভালভাবে সেলাই করা হয়নি, তাই এবারের টাইনি স্যাক সেই কাটা টিউব দিয়ে অন্য কোথাও পড়ে গেল, যা অনেক খুঁজে পাওয়া গেল। বাধ্য হয়ে সেটিও রিমুভ করতে হলো।

এরপর বরের ধারণা ছিল টেস্টটিউব ছাড়া হবেনা। যখন আমি তাকে আশার কথা বলতাম, আমার জন্য তার মায়া লাগতো, যদিও প্রকাশ করতো না। বরং স্কলারশিপটা হয়ে গেলে বিদেশে এসে চিকিৎসা করবে বলে প্ল্যান করতো।

একটা প্রবাদ আছে বিশ্বাসে মিলায় বস্তু- আমিও তার ফল পেলাম, তৃতীয় বার গর্ভধারণের পর ফুটফুটে এক কন্যা পেলাম।

এই এতগুলো কথা এজন্যে বলছি যে, আমি অনেক মাকে দেখেছি যে এই জাতীয় সমস্যা বা অকাল গর্ভপাতে ভীষণ রকমের ভেঙ্গে পড়ে। কেউ কেউ মানসিকভাবে এতই হতাশ  হয়ে পড়ে  যে দীর্ঘ সময়েও স্বাভাবিক হতে পারে না। আসলে আমাদের মানসিক জোরটা খুব জরুরি। তবেই হতাশা আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।

সবসময় মনে রাখা দরকার যে আমার সমস্যার সমাধান হবে, আজ না হলে কাল, নয়তো পরশু। আর না হলেই বা কতটুকু ক্ষতি? তার মধ্যে ভাল কিছুও রাখতে পারেন বিধাতা।

সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে ছিল বলে আমি একটা বেবি পেয়েছি, নাও পেতে পারতাম। তাহলেই কী হতো? জীবন থেমে থাকত কি? তবে ভালভাবে কেন নয়? বিশ্বাস করুন, তাকে না পেলেও আমি হতাশ হতাম না। আমার জীবনকেই আমি সুন্দর করার চেষ্টা করতাম, অন্যের সেবা কিংবা কিছু ভাল কাজ খুঁজে বের করে সুখী হতে চেষ্টা করতাম।

দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, দুঃসময়, দুর্দশা, অস্থতিশীলতা, কখনো দারিদ্র্য, কিংবা প্রতারণা জীবনে আসতেই পারে, বলা যায় দুঃসময় জ়ীবনের একটা অংশ। তবে সব ছাপিয়ে সত্যটি হলো- জীবন অমূল্য আর মানুষ অনন্ত সম্ভবনাময়।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৮১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.