কেমন বাবা, কেমন মানুষ?

জেসমিন চৌধুরী: ছোটবেলা প্রথম যখন বেহেস্ত-দোযখের কথা জানতে পারি, তখন প্রথমেই যার জন্য দোযখ কামনা করেছিলাম, তিনি ছিলেন আমার বাবা। মা দোযখের অনেক ভয়াবহ বর্ণনা দিতেন, কিন্তু  আমাদের কাঠবাদাম গাছের নিচে বিছিয়ে থাকা রাশি রাশি শুঁয়োপোকার চেয়ে ভয়াবহতর দোযখ আমি কল্পনা করতে পারতাম না। মা বলতেন ‘আগ্নি বিছা’। তার একটা কোনোমতে গায়ে লাগলেই হয়েছে কাজ, চুলকাতে চুলকাতে মৌচাকের মতো প্যাটার্নে গা ঢেকে যেত।

baba 3আমি প্রায়ই ভাবতাম আব্বা মারা গেলে তাকে বাদাম গাছের নিচে কবর দেব। নিজের বাবার প্রতি একটা শিশুর এতটা রাগ কীভাবে সম্ভব? সেই বাবাটা কেমন মানুষ? সে কি আদৌ মানুষ?  আশৈশব এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি আমি। আজ যখন উত্তর জানি, তখন বাবা আর পৃথিবীতে নেই, কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে হয় লোকজনকে ডেকে ডেকে তার কথা বলি, কেমন ছিলেন তিনি- অমানুষ, মানুষ, নাকি মহামানুষ?

আমার শৈশব কেটেছে এই মানুষটিকে ভয় পেয়ে এবং তার কাছ থেকে সামান্যতম স্নেহ, সামান্যতম উষ্ণতার বিফল আকাঙ্ক্ষায়। নিজের সন্তানের কাছে ভয়ানক ভীতিকর আর উষ্ণতাবর্জিত এই মানুষটি ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম কর্ণধার। যুদ্ধের শেষ তিনমাস তিনজন অতিরিক্ত সহ-সর্বাধিনায়কের একজন হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করতে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।

Baba 1একজন সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা এবং সমাজসেবক হিসেবে কাজ করার বাইরে তিনি যে জীবন বাঁচতেন তা ছিল সেই সময়ের আর দশজন থেকে একবারেই আলাদা। আমাদেরকে তিনি সামরিক কায়দায় বড় করার চেষ্টা করেছিলেন। বস্তুত আমাদের বাড়ির সাথে কোনো মিলিটারি ব্যারাকের পার্থক্য ছিল খুবই কম। তার কাছে বেঁচে থাকা নয়, বরং যথাযথভাবে বেঁচে থাকার নামই ছিল জীবন, এবং তিনি আমাদেরকে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জীবনকে দেখতে বাধ্য করতেন। আমার ভাইবোনরা কে তা কতটা দেখতেন আমি জানি না, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝার চেষ্টা করতে করতেই কেটেছে আমার বিভ্রান্ত শৈশব, কৈশোর, এবং যৌবন।     

ছোটবেলায় আব্বার নিয়ম-কানুনের অত্যাচারে আমার দম বন্ধ হয়ে উঠত। হেমন্তের শেষে, শীতের শুরুতে ফসল তোলা শেষ হলে প্রতিদিন দুপুর-গড়ানো বিকেলে নাড়া ঢাকা ধানক্ষেতের আল থেকে আলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা যখন কুমির কুমির খেলত, আমি তখন আব্বার সবজি বাগানে কাঠের চৌকিতে বসে বাঁশের কঞ্চি হাতে মুরগি তাড়াতাম। খুব মন দিয়ে কাজ করতে হতো, ফুলকপি আর বাঁধাকপির নতুন গজানো পাতাগুলোর একটাতেও মুরগির ঠোকর পড়লে ভীষণ বকা খেতাম।  আমি তৈ তৈ করে মুরগি তাড়াতাম, কিন্তু কান পড়ে থাকতো কুমির খেলার মাঠে।  

শুনতাম গ্রামের শিশুদের খেলা নিয়ে ঝগড়া আর আনন্দ উল্লাস, ‘ও কুমির তোর জলে নেমেছি।’ ছুটে যেতে মন চাইত, কিন্তু সেই শিকলবিহীন কারাগার থেকে বিন্দুমাত্র নড়বারও সাহস আমার ছিল না।  

Baba 2একবার শোনা গেল আমার এক মামাতো ভাইকে নাকি পরী ঘুমের মধ্যে উড়িয়ে অনেক দূরের এক ধানক্ষেতে নিয়ে ফেলেছে। আমি কত ঘুমহীন রাতে মনে-প্রাণে কামনা করেছি কোন দয়ালু পরী তেমনি করে যেন আমার আব্বাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়, অনেক দূরের মাঠ নদী পাহাড় বন পেরিয়ে যেন তিনি সহজে ফিরে আসতে না পারেন। আমি যেন বিকেল বেলা খেলতে যেতে পারি, আমাকে যেন নিজের পাহারায় বাড়িয়ে তোলা বিস্বাদ বাঁধাকপি নাকমুখ বুজে খেতে না হয়।

আপনারা যারা এতটুকু পড়ে আমার শৈশবের আমিটিকে ‘অসভ্য’ বলে ভাবছেন তাদেরকে আমি আমার ছেলেবেলার সবগুলো গল্প বলতে পারব না, আব্বার প্রতি পরবর্তীতে জন্মানো মমতা এবং ক্ষমা তাতে বাধ সাধবে। কিন্তু দু’একটা বলি।   

আমার বয়স যখন সাত অথবা আট, তখন আমার ভাইয়ের মুসলমানি হলো সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমিও সাথে গেলাম। সেখানে আমাদের পরিচিত এক মহিলা ডাক্তার আমার কান ফুটা করে দেন, সেই সাথে কুপরামর্শ, ‘চাচাকে বলো সোনার একজোড়া দুল কিনে দিতে, তা না হলে ইনফেকশন হতে পারে।‘ বাড়ি গিয়ে আব্বাকে এই দাবি জানালে তিনি বজ্রকণ্ঠে উত্তর দিলেন,

‘মেয়েমানুষ হবার চেষ্টা করো না, মানুষ হতে চেষ্টা করো।‘

Baba 5সবজি ক্ষেতে পরিচর্যারত আব্বার সেই বজ্রকণ্ঠের ধমক খেয়ে আমি একগাদা গোবরের মধ্যে উলটে পড়ে যাই এবং তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াবার সাহস বা শক্তিও খুঁজে পাই না। সেই রাতে আমার নতুন ফুটা করা কানে লাগানো মসুর ডালের কাঠিতে হাত বুলাতে বুলাতে আমি অসামান্য ক্ষমতাধর সেই পরীকে ডাকি, যে কখনোই আসে না।

আজো হাজার কণ্ঠ ছাপিয়ে আমার কানে বাজে আব্বার সেই বজ্রকণ্ঠ। তার কাছে খাওয়া এমন আরো বহু ধমক ফিরে আসে বারবার জীবন-পথের পাথেয় হয়ে। তবু মনে প্রশ্ন জাগে, একটু আদর করে কি শেখানো যেতো না?

আরেকবার মায়ের সাথে কী নিয়ে আমার ঝগড়া হলো। আমার তুলতুলে নরম এফ আর রহমান জর্দার গন্ধ মাখা মায়ের সাথে ঝগড়া, চেঁচামেচি, মান অভিমা্ন রাগ সবই করা যেত, শুধু খেয়াল রাখতে হতো আব্বা যেন জানতে না পারেন। তো সেদিন মায়ের সাথে ঝগড়া করে আমি ঘোষণা দিলাম আমি আজ ভাত খাব না।

আমার দুর্ভাগ্য যে আব্বা পাশের কামরাতেই ছিলেন এবং তিনি তা শুনতে পেয়ে কাজের ছেলে সুরেশকে ডেকে বললেন, ‘আজ ভাত একটু কম রাঁধিস, খানেওয়ালা একজন কম’। সত্যি সত্যি সে রাতে আমাকে খেতে দেয়া হলো না।

মা লুকিয়ে চোখ মুছলেন, কিন্তু সম্ভবত তিনিও খেলেন না। রাতে পেটের খিদায় যখন ঘুম আসছিল না, ঠিক তখনই অন্ধকারে জর্দার গন্ধ পেলাম। মা আমাকে টেনে তুলে বিছানায় বসালেন, তারপর নি:শব্দে মুখে পুরে যেতে লাগলেন কলা আর চিনি দিয়ে মাখানো দলা দলা ভাত। খিদে মেটার স্বস্তির চেয়ে অনেক বেশি প্রখর হয়ে উঠলো আমার অপরাধবোধ, মা’কে এই বিপদজনক গোপনীয়তার ঝামেলায় ফেলে দেয়ায়।

মা’কে আমি প্রাপ্তবয়স্ক বলে ভাবতাম না, তিনি ছিলেন আমারই মতো আরেক নির্যাতিত শিশু। এই রকম মুহূর্তগুলোতে আমার পৃথিবী আরো বেশি আব্বা-শূন্য হয়ে উঠত, এবং মায়ের বেহেস্তে নিয়োগ আরো পাকাপোক্ত হয়ে উঠত।

আব্বার মানবিকতার বোধ ছিল খুবই অদ্ভুত। পৃথিবীর সব মানুষের প্রতি মানবিক হতে গিয়ে আমাদের প্রতি তিনি কতটা অমানবিক হয়ে উঠতেন তা সম্ভবত তিনি নিজেও জানতেন না।

Baba 6একবার আমাদের বাড়িতে একটা বড় রকমের চুরির ঘটনা ঘটে। কাজটা ছিল আমাদের গ্রামেরই কিছু লোকের যারা চাষবাসের মৌসুমে আমাদের ক্ষেতে কাজ করত। চোররা হাতেনাতে ধরা পড়লেও আব্বা তাদেরকে অকাতরে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু সেই চোরদের একজনের ছেলের সাথে খেলাছলে আমার ঝগড়া হলে আমি যখন তাকে ‘চোরের ছেলে’ বলে গালি দেই, তা আব্বা কিছুতেই ক্ষমা করতে পারেন না।

আমাকে জিহ্বা উপড়ে ফেলার হুমকি দিলে আমি তা বিশ্বাস করে নিয়ে কাটাই শৈশবের কিছু ভয়াবহ মুহূর্ত। জিহ্বা কেটে ফেলা না হলেও আমাকে কাঁঠাল গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়, চোরের ছেলে আর তার বন্ধুরা আমার দুর্দশা দেখে হাসে। আমি মা’র কাছে শোনা সত্যবাদিতার প্রয়োজনীয়তা এবং সুফল সংক্রান্ত কোরান হাদিসের বাণীতে বিশ্বাস হারাই এবং আব্বার জন্য আমার কল্পিত দোযখ আরো ভয়াবহ হয়ে উঠে। চোরের ছেলেকে চোর বলে ডাকাটা যে আসলেও অন্যায় সেই বোধ সৃষ্টি হওয়া আরো অনেক দূরবর্তী সম্ভাবনায় পরিণত হয়।

এভাবেই আহ্লাদ এবং প্রশ্রয়বর্জিত শৈশব এবং কৈশোর পেরিয়ে নিরাপত্তাবোধহীনতায় বড় হয়ে উঠি, অনেকটা নিজ দায়িত্বেই বলা চলে। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে নিজের একটা জগত সৃষ্টি হয় যে জগতে আব্বার শাসন-শোষণের কোনো স্থান থাকে না।

আব্বা বৃদ্ধ হতে থাকেন, আমি বড় হতে থাকি। সব মিলিয়ে আমার মনের জগতে আব্বার ভূমিকা ধীরে ধীরে কমে আসে। একসময় আব্বার দৃষ্টিভঙ্গিকে কিছুটা বুঝতে শিখি, তার প্রতি একধরনের স্নেহও জন্ম নেয়। বড় হবার সাথে সাথে আব্বার মধ্যে মা’র গল্পের মহাপুরুষদের মতো দুর্লভ সব গুণাবলী লক্ষ্য করি।

বৈশাখী ঝড়ের রাতের তাণ্ডব উপেক্ষা করে হারিকেন হাতে গ্রামবাসীর দুর্দশা নিরীক্ষণ করতে বেরিয়ে যাওয়া আব্বাকে, অথবা নিজের খাবার কোন ভিখারির পাতে তুলে দিয়ে নিজে হাসিমুখে উপোস থাকা আব্বাকে দোযখে পাঠানোর পরিকল্পনাও একসময় নিজে থেকেই ভেস্তে যায়। কিন্তু তার অমানবিক মানবিকতাকে পুরোপুরি বুঝতে বা শৈশবের আমিটির প্রতি তার কঠোরতাকে ক্ষমা করতে পারি না তারপরও।

baba n meye 1একদিন জানতে পারি আব্বার ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে। বাচ্চাদেরকে নিয়ে প্রতি সপ্তাহে দুই তিন বার আব্বাকে দেখতে যাই। দূর থেকে দেখি বাংলোর চওড়া বারান্দায় কুঁজো হয়ে বসে আছেন আব্বা, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে তার ভয়াবহ কষ্ট দূর থেকেই চোখে পড়ে। নিজের অতি সহজে বুকভরে শ্বাস নিতে পারাকে অন্যায় মনে হয়। কিন্তু বাচ্চাদের হৈচৈ কানে যেতেই আব্বা সোজা হয়ে বসেন। আমরা কাছে যেতেই আকর্ণ হাসি হাসেন। যতোক্ষণ তার পাশে থাকি, জোর করে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করেন তিনি, কাজের ছেলে মুসলিমকে ডেকে আমার বাচ্চাদের জন্য গাছ থেকে অসময়ের পেয়ারা খুঁজে পেড়ে আনতে বলেন। চৌকির নিচ থেকে তাদের জন্য কিনে রাখা পটেটো ক্র্যাকার্স আর বিংগো লজেন্স বের করে দেন। লজেন্সের গায়ে গরুর ছবি আঁকা তাই বাচ্চারা বলে ‘গরুর লজেন্স’। শুনে আব্বা হাসেন।

আমাদের সাথে ঠাট্টা মশকরাও করেন, যার বেশির ভাগই নিজের অসুখ সংক্রান্ত। ডাক্তার বলেছে ঊনার হার্ট এনলার্জড হয়েছে। উনার হার্ট অনেক বড়, এটাতো ঊনি চিরদিনই জানতেন। এই কথা বুঝতে ডাক্তার বেটার মেডিকেল কলেজে এত বছর পড়তে হলো? এই বলে নিজের কৌতুকে নিজেই অট্টহাসিতে এবং সাথে সাথেই প্রচণ্ড কাশির দমকে ভেঙে পড়েন। আমরা তার হাসিতে যোগ দেই আর লুকিয়ে লুকিয়ে চোখ মুছি।

একজন প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সিএমএইচে প্রাপ্য চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করেন আব্বা। মৃত্যু যখন অবধারিত, তখন দেশের টাকা কেন বাজে খরচ করবেন, এই ছিল তার অকাট্য যুক্তি। পারিবারিক খরচে চিকিৎসার কথা বলা হলে তাও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। নিজের আরামের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের সম্ভাবনায় কিছুতেই ভাগ বসাবেন না বলে স্থির করলেন আমাদের অমানবিক মানব আব্বা।

শুধু তাই নয়, তার আরাম-আয়েশের জন্য আমাদের কারো নেয়া কোনো পদক্ষেপকেই কোনো প্রশ্রয় দিলেন না আব্বা। দিনে দিনে অসুস্থতা যখন অনেক বেড়ে গেল, শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হওয়ার যোগাড়, আমাদের বড়বোন একদিন পিশপাশ বানিয়ে দিলেন। আব্বা চিঁ চিঁ করে কোনোমতে জানতে চাইলেন, ‘এটা কী?’ নাম শুনে রেগে গেলেন, ‘বাপ দাদা পিশপাশের নাম শুনে নাই, দেশের মানুষ কিছু না খেয়েই মরছে, আর আমাকে পিশপাশ খেয়ে খেয়ে মরতে হবে?’  

নিজের রাগমিশ্রিত কৌতুকে অনেক কষ্টে হাসেন তিনি। মৃত্যুপথযাত্রী আব্বার করুণ কৌতুকে হাসি আমরাও। পরক্ষণেই ধমকে উঠেন, যদিও কণ্ঠে সেই জোর আর নেই কিন্তু দৃঢ়তা আগের মতোই, ‘কেন কাজ ফেলে সবাই বসে আছ আমার কাছে? যাও, যার যার কাজ কর। ফাঁকিবাজ বাংগাল সবগুলি’।

সবশেষে যেদিন প্রথম আব্বার পাশে গিয়ে ধমক না খেয়ে বসার সুযোগ হলো, সেদিন তার শেষ দিন। তখন তিনি সেমিকোমায় চলে গেছেন। আমার বড়বোন আর আমি রাতভর তার হাত ধরে বিছানায় বসে আছি, চায়ের চামচ দিয়ে পানিতে গোলা রি-ভিটা খাওয়ানোর চেষ্টা করছি। সুস্থ সমর্থ আব্বার হাত ধরার কোনো স্মৃতি আমার নেই।

আমি চোখ মুছি আর ভাবি, যদি কোনো অলৌকিক শক্তি আব্বাকে বাঁচিয়ে তোলে তাহলে তাকে বলবো, ‘আব্বা, আমার হাতটা একটাবার ধরেন। আমাকে একটা বার বুকে জড়িয়ে ধরেন। আমার আপনার কাছে আদর পেতে বড় মন চায় আব্বা’।

কিন্তু আমি জানি তা আর হবে না, বাবার স্নেহ আর আহ্লাদের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে অজানাই থেকে যাবে। জানি না আব্বা আমার মনের কথা টের পান কিনা, কিন্তু বারবার আচ্ছন্নের মত বাম হাত দিয়ে আমার হাত টেনে ধরেন, আর ডান হাতের তর্জনি দিয়ে আমার কনুই থেকে কবজি অবধি কিছু একটা লিখার চেষ্টা করেন। আমি চোখ বন্ধ করে তার আঙ্গুলের গতিবিধি পড়ার চেষ্টা করি, বাতি জ্বালিয়ে দেখার চেষ্টা করি, কিন্তু কিছু বুঝতে পারি না। আমার চোখের পানি বাঁধ মানে না।

received_10154239029054850
বাবা লে. কর্নেল এ আর চৌধুরী

পরদিন সকালে আব্বা আমার পিতৃস্নেহ প্রাপ্তির সমস্ত সম্ভাবনার ইতি ঘটিয়ে চিরতরে প্রস্থান করেন। বেঁচে থাকতে সবধরনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে গেছেন যে লৌহমানব, মৃত্যুর পর তার জন্য তোপধ্বনি দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি আর তিন বাহিনীর প্রধানের পক্ষ থেকে তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। আর এই সবকিছুর মধ্যে উঁকি মারে জংলি ফুলের বানানো একটা নেতিয়ে যাওয়া তোড়া। কে যেন বলে এটা মাজারের ফকিররা বানিয়ে দিয়েছে।  সারাজীবন তার সময় আর মনোযোগ থেকে নিজের সন্তানদের বঞ্চিত করে মানুষের সেবা করে গেছেন যে লোক, তার কবরে ফকিররা ফুল দেবে সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এসব কিছুই আমার মনকে স্পর্শ করে না। প্রচণ্ড অভিমানে আমি হাউমাউ করে কাঁদি, ডুকরে ডুকরে কাঁদি, ফুলে ফুলে কাঁদি। আব্বার কাছে যা পাইনি, তা কি আমি আর কখনো কারো কাছে পাবো? যে মেয়ে তার বাবার কাছে অভিমান করতে পারে না, সে কি অভিমান করতে শেখে? যে মেয়ে তার বাবার কাছে প্রশ্রয় পায় না, জীবন কি তাকে প্রশ্রয় দেয়? তাই মৃত্যুর পরও আমি আব্বাকে ক্ষমা করতে পারি না।

তারপর আরো কত শীত বসন্ত পার হয়ে গেছে। কাজকর্ম, ছেলেমেয়ে, বন্ধুবান্ধব নিয়ে আমারও একটা জীবন হয়েছে, যে জীবনে শান্তির চেয়ে যুদ্ধই বেশি। শেখার জন্য যুদ্ধ, শেখানোর জন্য যুদ্ধ, কাজের জন্য যুদ্ধ, কাজ করানোর জন্য যুদ্ধ। আব্বারই শেষ পর্যন্ত জয় হলো, কাজ করাতে করাতে তিনি আমাকে এমন একজন কাজপাগল মানুষ বানিয়ে দিয়ে গেলেন, যে নিজেকে এবং আশেপাশের মানুষকে কাজের চাপে অস্থির করে তোলে, যে সময়ের খেলাপ মেনে নিতে পারে না, যে আনন্দ উল্লাসে হাঁপিয়ে উঠে এবং সোজা কথার বাইরে কিছু বুঝতে চায় না।  

Jesmin Chowdhury
জেসমিন চৌধুরী

আমি এখন প্রায়ই ক্যান্সার রোগীদের জন্য দোভাষীর কাজ করি। তাদের বেঁচে থাকার আকুতি, আর তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ডাক্তারদের  অক্লান্ত প্রচেষ্টা দেখে আমার বিনা চিকিৎসায় প্রয়াত আব্বার কথা মনে হয়। তার সাহস আর ধৈর্যের কাছে মাথা হেঁট হয়ে আসে। এখন আর আব্বার প্রতি রাগ হয় না। যে মানুষ  মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষকে, পরবর্তী প্রজন্মকে নিজের আরামের উপরে স্থান দিতে পারে, যে নিজের প্রতি এতটা নির্মম হতে পারে, সে তার মেয়ের প্রতি কঠোর হবে সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু তারপরও একটা ভীষণ শূন্যতা, একটা হাহাকার বারবার আমার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। জানালা দিয়ে অন্ধকার অসীমের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই নিজেকে চমকে দিয়ে চিৎকার করে উঠি, ‘মানুষ মরে কই যায়? আসলেই তারা কই যায়?’  

বাবার কোলে চড়ে চাঁদ পাড়ার স্বপ্ন দেখতে কেমন লাগে তা আমি কখনোই জানবো না, মায়ের পিটুনি থেকে বাঁচার জন্য বাবার কোলে লুকানোর নির্ভরতার স্বস্তি পেতে কেমন লাগে তা জানার সুযোগ আমার জীবন থেকে চীরতরে হারিয়ে গেছে। মেনে নিতে কষ্ট হয়।

আমি চিরদিনই আদরের কাঙাল, কিন্তু যেসব মানুষ আমাকে কাছে টানে, অত্যন্ত অদ্ভুত হলেও সত্যি যে তারা আমার আব্বার মতই আবেগহীন এবং উষ্ণতাবর্জিত, মানুষ হিসেবে হয়তো মহৎ, কিন্তু কাছের মানুষের অভিমান বুঝতে অক্ষম।

আব্বা কি জানতেন জীবন এমনই হয়? তার তাই কি তিনি আমাকে এই প্রশ্রয়হীন জীবনের জন্যই প্রস্তুত করে রেখে গেছেন? নি:সন্দেহে একজন অসাধারণ মানুষের ঔরসে জন্মেছিলাম আমি, কিন্তু তিনি কি আমার বাবা হতে পেরেছিলেন?  নাকি অসাধারণ মানুষরা সাধারণ মেয়েদের বাবা হয়ে উঠতে পারে না?  

(পাদটিকা: আমার আব্বা লে. কর্নেল এ আর চৌধুরী ১৯১৮ সালের ১৭ই অগাস্ট অবিভক্ত ভারতের করিমগঞ্জ জেলার সুতারকান্দি গ্রামে জন্ম নেন। পড়াশুনা শেষে তিনি বার্মা ওয়েল কোম্পানিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান করেন এবং দেশবিভাগের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হন। প্রথম দুই বছর  তিনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে এবং পরবর্তিতে ১৯৪৮ থকে ১৯৬৯ পর্যন্ত একুশ বছর ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্টে কাজ করেন।

১৯৬৯ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্ট থেকে অবসর গ্রহণ করলেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি তাতে সরাসরি যোগদান করেন এবং ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে আগরতলার কলকলিরঘাটে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শুরু করেন। মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠনের  কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর স্টাফ অফিসার হিসেবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিযুক্ত হন। পরবর্তিতে বিজয় অর্জিত হবার পূর্বের শেষ তিনমাস তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অতিরিক্ত সহকারী সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অন্যতম পরিচালন অধিকর্তা এবং সিলেটে শহীদ এম আর চৌধুরী হাউজিং ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এই ট্রাস্টটির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন। এছাড়াও তিনি এম এ জি ওসমানীর মা বাবার স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত ‘জোবেদা খাতুন এবং খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্টের চেয়ারম্যান, ওসমানী ট্রাস্ট এবং সিলেট জেলা শিক্ষা ট্রাস্টের অন্যতম একজন ট্রাস্টি, এবং ওসমানী স্মৃতি পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অর্থ, সুনাম, প্রতিপত্তি অর্জনের সমস্ত প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি সিলেটে তার বাড়ি গ্রিন হিলসে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং ২০০৭ সালের ৭ই ডিসেম্বর তারিখে ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।)

                                                                                                     

 

শেয়ার করুন:
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
    7
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.