লোকদেখানো মাতৃপ্রেম ও আমার ভাবনা

শামীম রুনা: বছর ঘুরে বিশ্ব মা দিবস আর একবার এলো-গেল। মাকে নিয়ে সবাইর প্রচণ্ড রকম আবেগ উচ্ছ্বাস ভালবাসায় যোগাযোগা মাধ্যমগুলো আর একবার মাতৃ মমতায় ভাসল। কে কার মাকে কতটা ভালবাসে তা নিজের আর মার পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বও দেখুক, এই হয়ত সবার চাওয়া। ভাল লাগে সকলের এই চাওয়াকে।

Old Home 1মাঝে মধ্যে ভালবাসাও দেখাতে হয়, তাতে ভালবাসা বাড়ে বলেই আমার মনে হয়। আমার সঙ্গে অনেকের মনে হওয়া নাও মিলতে পারে, তাতে কিছু যায় আসেনা। নানান মুনির নানান মত হবে এটাই স্বাভাবিক।

অনেকে বলেন; একদিন কেন মা দিবস হবে? এই সব পশ্চিমাদের জন্য হতে পারে, আমাদের জন্য না। আমরা আমাদের মাকে বছরের তিনশপয়ঁষট্টি দিনই ভালবাসি।

পশ্চিমারা মা দিবসে যেয়ে ওল্ড হোমে ভিড় করবে আর আমরা সারা বছর যেমনি মার হাতের রান্না খাই, তেমনি মা দিবসেও মার হাতের রান্না খেয়ে ঢেঁকুর তুলে মনে মনে বলবো, মা তুমি লক্ষী! আমরা ভালবাসা বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অপটু জাতি, মার প্রতি ভালবাসাও তাই সহজে প্রকাশ করতে পারিনা।

যতক্ষণ পর্যন্ত না মা অসুস্থ হয়ে না পড়ে ততক্ষণ পর্যন্ত বলি না, মা তুমি রেস্ট নাও। কোনো দিন মাকে বলি না, আজ তোমার কাজগুলো সব আমি করতে চাই। আমরা জানি এসব কাজ মায়ের কাজ, মাই করবেন।

আমরা পশ্চিমা নই, আমরা মিথ গল্প ওয়াসকরনীর মার মতো সারা বছর মাকে  বস্তায় ভরে পিঠে বহন করি ঠিকই, তবে একবারও বুঝতে চাইনা, মার প্রয়োজন, সুবিধা-অসুবিধা। আমরা মনে করি, আমরা যা করছি সেটাই মার জন্য যথেষ্ট। মাদেরও কখনো কখনো সন্তানদের কাছ থেকে ভালবাসার স্বীকৃতি শুনতে ভালো লাগবে তা বুঝতে চাই না।

Old home 2পশ্চিমাদের সংস্কৃতি আলাদা। ওরা শিশুকাল থেকে দেখে আসছে জীবনযুদ্ধে লড়তে থাকা মা-বাবারা ওদের চাইল্ড কেয়ারে রেখে অফিস-আদালত সব করে বেড়াচ্ছেন, তেমনি সন্তান পালনেও কোনো রকম অবহেলা করেন না। এটি তো সত্যি, টাকার অভাবে অনেক প্রতিভাবান শিশুর সুপ্ত প্রতিভা চিরনিদ্রায় রয়ে যায়। তাই বলে এঁরা সন্তানদেরকে পুতু পুতু স্বভাবের করেও বড় করে না, ছোটবেলা থেকে হাতে কলমে শিখিয়ে নেয়; কী করে একা একা লড়াই করে এই পৃথিবীত টিকতে হয়। আর বড় হয়ে সেসব শিশুরা বৃদ্ধ মা-বাবাদের সব সময় বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা ঝাড়া হাত-পা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কথাটি সর্বক্ষেত্রে ঠিক নয়। এরাও মা-বাবার জন্য প্রাকৃতিকভাবে প্রচণ্ড ভালবাসা বোধ করে।

মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালবাসা বা শ্রদ্ধা এটি কোনো দেশ-জাতি-কাল হিসাব করে তৈরি হয় না। এটি একটি চিরন্তন ভালবাসা।

আর সব সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু কিছু অনৈতিক ঘটনা পৃথিবীতে সব সময় সব সমাজে ঘটে এসেছে, ঘটছে ভবিষতেও ঘটবে। সন্তানের হাতে যেমন মা-বাবা অবহেলা থেকে শুরু করে খুন পর্যন্ত হন, তেমনি মা-বাবার কাছেও অনেক সময় সন্তান নিরাপদ থাকেনা। এখানে সেসব ঘটনা উহ্য থাকুক, আধুনিক মা-বাবাও চান, তার সন্তান শুধু দুধে-ভাতে নয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে সফলতা নিয়ে এই পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে টিকে থাকুক।

আর আধুনিক চিন্তাধারার মা-বাবা সন্তানদের স্বাধীন জীবন যাপনের অন্তরায় হতে যেমন চাননা তেমনি নিজেরদের স্বাধীনতা সন্তানের হাতে তুলে দিয়ে অকর্মন্য জীবন যাপন করতেও চাননা। তাই তাঁরা অনেক সময় বৃদ্ধ বয়সে নিজেদের একাকী বাড়িতে বা নিজেরাই কোনো ওল্ডহোমে থাকতে পছন্দ করেন। আর উন্নত বিশ্বের দেশগুলো নিজেই যখন তার নাগরিকের সুযোগ সুবিধার দায়িত্ব নিয়ে নেয় তখন সে দেশের নাগরিকরাও যে কোনো স্থানে আরামসে বসবাস করতে পারে।

Runa collageবর্তমান যুগের ক্যারিয়ারিস্ট একজন সন্তানকে যখন জীবনের সাফল্যকে ধরার জন্য রাত-দিন নাকে মুখে রক্ত তুলে প্রতিযোগিতায় দৌঁড়াতে হয় তখন সে সন্তানকে বৃদ্ধ মা-বাবার ভাবনা নিশ্চয় উতলা করে তুলে। বর্তমানের সন্তান মিথের মতো করে বস্তায় ভরে মাকে বহন করলেও আধুনিক যুগ তা এক্সেপ্ট করবে না। যারা মা-বাবাকে কাছে রাখতে পারে তারা ঠিকই রাখে আর যারা পারে না, বৃদ্ধ মা-বাবার জন্য একাকী বাসাও যাদের কাছে নিরাপদ মনে হয়না তারা বাধ্য হয়ে অনেক সময় মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায় তাঁদের অনুমতি নিয়ে। যেখানে মা-বাবারা কিছু সমবয়সী বন্ধু যেমন পান তেমনি সেবা যত্নেরও অভাব হয়না।

এইসব সন্তানরা সারা বছর মা-বাবার খোঁজ খবর ঠিকই রাখে, আবার বছরের বিশেষ দিনগুলোকেও স্মরণ রেখে মা-বাবার জন্য উপহার হাতে তাঁদের কাছে গিয়ে ভালবাসা জানায়।

আমরা আজকাল অনেকে মা-বাবাকে কাছে রাখার নাম করে তাঁদের দিয়ে নিজেদের সন্তানকে টেক কেয়ার করিয়ে নিচ্ছি সুকৌশলে। তার বিনিময়ে তাঁদের বছরের মা দিবস বা বাবা দিবসে নানার রঙ-ঢঙ-এর লেখার মগ বা শাড়ী-পাঞ্জাবী দিয়ে সবাইকে বলছি, দেখো; আমরা আমাদের মা-বাবাদের কাছে রাখছি। তাঁদের সারা বছর যেমন ভালবাসি তেমনি বিশেষ দিনেও ভালবাসি। এই রাংতা মোড়ানো ভালবাসা ভালো, না বৃদ্ধাশ্রমের ভালবাসা ভালো-ভাবনার বিষয় বৈকি!   

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.