‘বেশ্যা’ নারীতে ভয় পুরুষের

ইতু ইত্তিলা: ‘বেশ্যা’ শব্দটাকে আমরা সাধারণত গালি হিসেবে ব্যবহার করি। আমার ধারণা বেশ্যারা খুব সাহসী হয়। আমাদের সমাজে নারীকে দমিয়ে রাখার প্রধান অস্ত্রটি হল ‘চরিত্র’। পুরুষ নাকি চাইলে পারে, নারীর চরিত্র ‘নষ্ট’ করতে। সীমার বাইরে গেলেই নারীকে ‘সম্ভ্রম’ হারানোর ভয় দেখানো হয়। নারীর সম্ভ্রমটির অবস্থানটা ঠিক কোথায়? যোনির ভেতরে নাকি?

Etuএকমাত্র এই ভয়ের কাছে পরাজিত হয়েই নারী আজও বন্দী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কাছে। এই ভয়ই নারীকে বাধ্য করছে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে।

ঘরে বাইরে সব জায়গায় যৌন সন্ত্রাসীরা ওঁত পেতে থাকে, নারীর চরিত্র নষ্ট(!) করতে। আর যৌনসন্ত্রাসীদের চরিত্র নষ্ট হয় কিসে শুনি?

বেশ্যাদের তো এসব ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। বেশ্যারা তথাকথিত ‘চরিত্র’ ‘সম্ভ্রম’ এর তোয়াক্কা করে না। তাই তারা অন্য যে কোন নারীর চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীন ও সাহসী। বেশ্যাদেরকে পুরুষের সৃষ্ট চরিত্র রক্ষা করতে হয় না বলে, তারা তাদের জীবনে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতেও বাধ্য নয়।

আর নির্লজ্জ পুরুষজাতটার কথা আর কি বলব। দিনে যাদের বেশ্যা বলে থুতু ছিটায়, রাতে তাদের খদ্দের হয়ে থুতু চাটতে যায়। বেহায়া হলে কি আর এতোটা বেহায়া হতে হয়!

পুরুষের প্রয়োজনেই নারী বেশ্যা হয়। কিন্তু বেশ্যা হওয়ার পর বেশ্যা নারীর কাছে ওসব চরিত্র-টরিত্র কোন পাত্তা পায় না। চরিত্রকে তোয়াক্কা না করার এই সাহসটাকেই পুরুষ ভয় পায়, ঘৃণা করে। ওই সাহসের অংশটুকু বাদ দিলে বেশ্যা ব্যাপারটা বেশ মজাদার হয়ে উঠে।

Feminisimবেশ্যা মানে যদি বহুগামী নারী হয়, বহুগামী পুরুষকে তবে কী বলা যায়? পুরুষ নারীকে মাতৃত্ব, সতীত্বের গুন শোনায়। অথচ সমাজের অধিকাংশ পুরুষই বহুগামী। পুরুষের বহুগামিতা আবার একটা বিশেষ গুণ। এটা নাকি পুরুষের সক্ষমতাকে বোঝায়! আর নারী বহুগামী হলেই ‘বেশ্যা’ ‘চরিত্র খারাপ’!

কিছুদিন আগে কিছু অনলাইন পত্রিকায় নিউজ দেখলাম, ঢাকায় নাকি ধনী ঘরের মেয়েরা বয়ফ্রেন্ড ভাড়া করছে। ধনী মেয়েরা ছেলেদের ভাড়া করছে নিজেদের যৌন চাহিদা মেটাতে। এই খবর কতটা সত্য জানি না। হয়তো সত্য, হয়তো মিথ্যা। এই খবরের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোথায় যাচ্ছে এই সমাজ’।

আপনারা আমাকে বলুন তো, ‘কোথায় ছিলো এই সমাজ’? বেশ্যালয়গুলোর খদ্দের হয় কারা? কারা টিকিয়ে রাখছে পতিতাবৃত্তি? বেশ্যালয় বন্ধের কথা বললে, সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার অজুহাত দেখানো হয়, ইনিয়ে বিনিয়ে বেশ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। তখন কোথায় যায় এই সমাজ-প্রশ্ন তুলেছেন কি? তখন এই শিরোনাম দানকারীরাই বা কোথায় থাকে?

কেউ একবার ভেবে দেখছেন, যুগ যুগ ধরে পুরুষ নারীর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে নারীকে অত্যাচার করেছে, ধর্ষণ করেছে, এর দায় যে শুধুই পুরুষের, এটা আমরা কয়জন মানি? উল্টো পুরুষকেই বানিয়েছি নারীর রক্ষাকর্তা! পুরুষ নারীর রক্ষক হলে, ভক্ষকটা তবে কে?

আসলে রক্ষক-ভক্ষক সব একই সূত্রে গাঁথা। রক্ষক পুরুষ চায় না নারী স্বাধীনভাবে চলুক, নিজের কথা নিজে বলুক, নিজের দায়িত্ব নিজে নিক। রক্ষক চায় নারী ভয় পাক, ভয়ে গুটিয়ে থাকুক, নিজেকে দূর্বল ভেবে তার কাছে ছুটে যাক নিরাপত্তার জন্য, তার আধিপত্য মেনে নিক। আর রক্ষকের এই চাওয়াগুলো বাস্তবে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে ভক্ষক পুরুষ।

পুরুষতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই কেউ রক্ষক, কেউ বা ভক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। যেদিন নারীর আর রক্ষকের প্রয়োজন হবে না, সেদিন থেকে আর নারীকে পুরুষের আধিপত্য মেনে নিতে হবে না।

নারী জানুক যে, তার নিরাপত্তার জন্য কোন পুরুষের প্রয়োজন নেই। নারী নিজেই নিজের রক্ষক হয়ে উঠুক। নারী জানুক তার সম্ভ্রম তার যোনিতে নয়, নারীর সম্ভ্রম নারীর কর্মে, জ্ঞানে।

 

শেয়ার করুন:
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আমি বিশ্বাস করি ” বেশ্যা ” শব্দটি নির্দিষ্ট কোনো লিঙ্গকে সূচিত করে না, অন্তত আভিধানিক অর্থে । বেশ্য বলতে যদি বোঝানো হয়, বেশাতি করেন যিনি ( অধুনা দেহের ) তাহলে বেশ্যা শব্দটি নারী – পুরুষ – সমকামী সকলকেই সূচিত করছে এই শব্দটি।
দেহব্যবসায় আদিম বৃত্তি । কিন্তু আমার সংক্ষিপ্ত অর্জিত জ্ঞান জানাচ্ছে, অন্তত পুরুষের এই স্বতঃপ্রণোদিত এই জীবিকায় অংশগ্রহন যথেষ্ট নতুন বিষয়। এর আগেও যে পুরুষের এই দেহ বৃত্তি ( ব্যবসায় কথাটি এখানে ব্যবহার অনুচিত ) প্রচলিত ছিল না তা নয়। সংস্কৃত এবং বাংলা প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে ( বিশেষত বৈষ্ণব সাহিত্যে ) পরকীয়া বিষয়টিকে ফ্যান্টাসি হিসাবে প্রদর্শন করা হয়। তাহলে ধরে নেওয়া যেতেই পারে সমাজে পরকীয়ার একটা প্রচলন ছিল।
দেহব্যবসায় অর্থাৎ পুরুষ ও নারীর সম্মিলিত দেহব্যবসায় প্রচলিত থাকা উচিৎ বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। এতে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষিত হয় বলেও আমার ধারণা। অবশ্যই বলপূর্বক যৌনক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী প্রথাকে আমি সমর্থন করিনা। বলপূর্বক যেকোনো বৃত্তিতেই নিযুক্তি ঘৃনার্হ্য। দেহব্যবসায়ে অংশগ্রহন হোক স্বতস্ফূর্ত। অবশ্য এর জন্য আইনি অনুমোদনও প্রয়োজন। নাহলে ক্রেতা বিক্রেতা কেউই উৎসাহিত হবে না। আশা রাখব, একদিন দেহব্যবসায় আইনি স্বীকৃতি লাভ করবে।
নিবন্ধ লেখিকার সঙ্গে আমি একমত। বিভিন্ন যৌণপল্লিতে ঘুরে আমারও একই ধারণা হয়েছে। এই সমস্ত অঞ্চলে স্বাধীনচেতা মহিলাদের একাধিপত্য চলে এককথায় যাকে বলা হয়ে থাকে ” পর্ণোক্র্যাসি “। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই বহু পুরুষতান্ত্রিক ‘পুরুষসিংহ’কে এখানে ইঁদুরের গর্ত খুঁজতে দেখেছি। কারণ এখানে কর্মীদের সম্মতিই শেষ কথা।
আমার অনুরোধ আর পাঁচটি জীবিকাভুক্ত মহিলাদের মতোই এদেরও সমদৃষ্টিতে দেখা হোক। কারণ এরাও কর্মী এরাও শ্রমিক। দুর্বার মহিলা সম্মাননা কমিটির একটি শ্লোগান খুবই সঙ্গত এক্ষেত্রে ,
” গতর খাটিয়ে খাই
শ্রমিকের মর্যাদা চাই “

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.