পাঁচালির প্যাঁচাল – ৮

অনুপা দেওয়ানজী: মেয়েটির মনে হটাৎ খটকা লাগে, জগজ্জননী মা! যাকে কিনা ছোট্ট এই ব্যাপারেও স্বামীর উপদেশ নিতে হচ্ছে সেখানে তিনি যে বিশাল এক ধন ভাণ্ড কাঁখে নিয়ে মর্ত্যে আসেন, তার প্রকৃত মালিক কে? তিনি? নাকি তাঁর স্বামী নারায়ণ! এ ধন বিলাবার ক্ষমতা কি আদৌ তাঁর আছে? নাকি নেই? তিনি শুধুই এই ধন সম্পদের একজন নিরাপদ রক্ষাকত্রী নন তো?

Anupa Dewanjiমর্ত্যের গৃহলক্ষ্মীরা যেমন তাদের স্বামীদের সমস্ত টাকা-পয়সা, ধন-সম্পত্তি, শুধুমাত্র আগলে রাখেন, কিন্তু স্বাধীনভাবে তা খরচ করার অধিকার তাঁদের নেই, তেমন নয়তো? যে জন্যে মর্ত্যের গৃহলক্ষ্মীরা তাই নিজের জন্যে নয়, স্বামী ও স্বামীর ধনের আশায় তাঁর পুজো করে থাকেন, মাও কি ঠিক তেমনি তাঁর স্বামীর আদেশে এ ধন তাদের স্বামীর জন্যেই দিয়ে যান? কারণ তাঁকে তো আবার নারায়ণের কাছে গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে।

যাই হোক লক্ষী নারায়ণের উপদেশ মতোই মর্ত্যে এলেন। এসেই তিনি প্রথমে গেলেন অবন্তী নামের এক গ্রামে। সে গ্রামেরই এক ধনী ব্যক্তি, যার নাম ধনেশ্বর রায়, কুবেরের মত যার ঐশ্বর্য। সংসারটিও সোনার মত। পরিবারের কারও মনে হিংসা বিদ্বেষ নেই। সাত সাতটি পুত্রসহ তাঁর অধীন অন্যান্য সবাই তাঁর কথাতেই চলে।

একান্নবর্তী এই পরিবারটির কর্তা সসম্মানে মৃত্যুবরণ করার কিছুদিন পরেই সাত বউ এর কুহক জালে সাত পুত্র জড়িয়ে গেল, আর তার ফল স্বরুপ সংসারটি ভেঙ্গে একের জায়গায় সাতটি হয়ে গেল। আর তারই সাথে সাথে একে একে ঢুকল অলক্ষ্মীর হিংসা, দ্বেষ ইত্যাদি যত সহচর। যার ফলস্বরুপ সংসারটি ছারখার হয়ে গেল।

বৃদ্ধা ধনেশ্বর পত্নী সাত বউ এর অত্যাচারে তিষ্ঠোতে না পেরে নিজের জীবন দেবার জন্যে বনে যাত্রা করলেন, এমন সময়ে তাঁর সঙ্গে লক্ষ্মীর দেখা। অন্নাভাবে শীর্ণ দেহ, মলিন মুখ, দুর্বল ও ক্রন্দনরতা ধনেশ্বর পত্নীকে দেখে লক্ষ্মী জিজ্ঞেস করলেন;

‘কাহার তনয়া তুমি কাহার ঘরণী।

কি হেতু মলিন মুখ দেখি বিষাদিনী।।

যেহেতু মেয়েদের নিজের কোন পরিচয় নেই তাই লক্ষ্মীর এই প্রশ্ন।

বৃদ্ধা বললেন, আমি পতিহীনা এক অভাগিনী। কী হবে আমার দুঃখের কাহিনী শুনে? আমার পিতা আর পতি দুজনেই ছিলেন অতি ধনবান। আমার নিজের সংসারটিও ছিল সোনার সংসার। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পরে সুখ , শান্তি একে একে সব বিদায় নিয়েছে । সাত বউ এর অত্যাচারে আমার সাত পুত্র শুকিয়ে কাঠ। এসব সহ্য করতে না পেরে আমি বনে চলেছি আমার প্রাণ বিসর্জনের জন্যে।

Hindu 1লক্ষ্মী ধনেশ্বর পত্নীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, আমার কথা শোন। আত্মহত্যা করা মহাপাপ। এতে নরকে পতিত হতে হয়। তুমি ঘরে ফিরে যাও এবং লক্ষ্মী ব্রতের প্রচার কর। দেখবে অচিরেই তোমার ঘরে সুখ আর শান্তি দুটোই ফিরে আসবে। এই বলে লক্ষ্মী ব্রতের নিয়ম বলে দিলেন……

গুরুবারে সন্ধ্যা কালে মিলি নারীগণ।।

করিবে লক্ষ্মীর ব্রত, হয়ে এক মন ।।

জল পূর্ণ ঘটে দেবে সিঁন্দুরের ফোঁটা।

আম্রের পল্লব দিবে শিরে একগোটা।।

আসন সাজায়ে তাহে দিবে গুয়া পান।

সিঁন্দুর গুলিয়া দিবে ব্রতের বিধান ।।

ধূপ দীপ জ্বালাইয়া রাখিবে ধারেতে।

শুনিতে বসিবে কথা দূর্বা লয়ে হাতে।।

মনেতে লক্ষ্মীর মূর্তি করিয়া চিন্তন।

এক চিত্তে ব্রতকথা করিবে শ্রবণ।।

কথা অন্তে উলু দিয়া প্রণাম করিবে।

তারপরে এয়োগণে সিঁন্দুর লইবে ।।

এরপরে আরও বললেন, যে নারী প্রতি গুরুবারে এই ব্র্ত করবে, আমার বরে সে বিশুদ্ধ মনের অধিকারী হবে, আর গুরুবারে যদি পূর্ণিমা হয়, তাহলে যে নারী অনাহারে থেকে এই ব্রত করবে তার সকল বাসনা আমি পূর্ণ করবো, সেই নারী পতি, পুত্র নিয়ে সব সময়া সুখে আর শান্তিতে থাকবে। এর পরে আদেশ দিলেন,

লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপি সবে ঘরে ঘরে

রাখিবে তন্ডুল তাহে এক মুষ্টি করে।।

সঞ্চয়ের পন্থা ইহা জানিবা সকলে

অসময়ে উপকার পাবে এর ফলে।।

আলস্য ত্যজিয়া কাট সুতা বামা গণ

দেশের অবস্থা মনে করিয়া চিন্তন।।

প্রসন্না থাকিব তাহে কহিলাম সার

যাও গৃহে কর গিয়া ব্রতের প্রচার ।

এর পরে দেবী তার প্রতি দয়া দেখিয়ে নিজ মুর্তিতে তাকে দর্শন দিয়ে প্রস্থান করার আগে তাকে আবার বললেন, যাও সংসারে ফিরে যাও। আমার ব্রতের প্রচার কর। অচিরেই তোমার সংসারে সুখ ফিরে আসবে। ত্তোমার পুত্রবধুরাও আবার তোমার বশে আসবে।

মেয়েটি ভাবে, আত্মহত্যা মহাপাপ তো বটেই। এতে শুধু নরকে গমন কেন সমাজ ও সংসারের জন্যেও এ এক বিরাট বিপর্যয়। একান্ত কোনও কারণ না ঘটলে হলে কেউ আত্মহত্যার মত সাংঘাতিক পথ হয়তো বেছে নেয় না। প্রচণ্ড স্বার্থপর ছাড়া কেউ এ কাজ করতে পারে না।

লক্ষ্মীর বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর ব্রতের ছবিটা খুব শৈল্পিক। তবে তার মনে হলো লক্ষ্মী একবারও কেন জানবার চেষ্টা করলেন না মর্ত্যে কেন মেয়েদের জন্যে আর শুদ্রদের জন্যে ধর্মশাস্ত্র পাঠ নিষিদ্ধ করা হয়েছে?

ঘরে মেয়েদের দাসী আর বাইরে শুদ্রদের দাস কেন করা হয়েছে? এমনকি বিয়ে করতে যাওয়ার সময়ে ছেলে মাকে কেন বলে তোমার জন্যে দাসী আনতে যাচ্ছি? তাদের বরাদ্দ কি শুধুই চারটা ভাত আর পরনের দুখানা কাপড়?

এমন অঙ্গীকার ছেলেরা বিয়ের পরে কেন স্ত্রীদের করছে? স্বয়ং লক্ষ্মী যেখানে বলছেন এক মুষ্টি করে চাল জমাতে, এটা নিঃসন্দেহে সঞ্চয়েরই একটা পথ। তবে এর সাথে এটাও পরিষ্কার যে মেয়েদের হাতে সঞ্চয় করবার মতো রোজকার ভাত রাঁধার চাল ছাড়া আর কোন ক্ষমতা ছিল না। তা থেকেও সে এক মুঠো করে যেন জমায়। ভবিষ্যতে সংসারের কাজে যেন সেটা লাগে। হয়ত তাকে অভুক্ত থেকেই এ চাল জমাতে হয়।

আর সুতা কাটা? পরিবারেই যদি বস্ত্র বয়নের জন্যে সুতা কাটা যায় তাহলে তো সে খরচও যে মেয়েদের জন্যে করতে হবে না। তাই অবসরে তাকে দিয়ে শ্রম করিয়ে নেয়া। এ দাসী যে বিনে পয়সার দাসী? মা লক্ষ্মীর তার মেয়েদের প্রতি যে এই অন্যায় করা হচ্ছে তার কিছুই চোখে পড়লো না? আসল ধর্ম শাস্ত্রপাঠ যে তাদের জন্যে কারা নিষেধ করলো তার খোঁজও নিলেন না মা!

ধনেশ্বর পত্নীর এত বড় সোনার সংসারটি শুধু মাত্র তাঁর সাতটি পুত্র বধুর কারণে ছারখার হয়ে গেল? তাঁর সাত পুত্র আর তিনি কি সম্পূর্ণ নির্দোষ! পুত্রদের তাহলে তিনি আর তাঁর স্বামী কী শিক্ষা দিয়েছিলেন বা পুত্ররাও কেন পিতার মত কেউই হলো না. লক্ষ্মী তো তাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন?

তিনি কেন জিজ্ঞেস করলেন না? (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.