‘মা’-ও হয়ে উঠতে হয়

ইশরাত জাহান ঊর্মি: আপনারা নিশ্চয় বালাকৃষ্ণান এর ‘পা’ সিনেমাটা দেখেছেন? আমি অনেকের সাথে কথা বলেছি মুভিটা নিয়ে। সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী ক্যারেক্টার কোনটা জানতে চেয়েছি অনেকের কাছে। কারো সাথেই আমার ভাবনা মেলেনি।

Maaকেউ বলেছেন, সবচেয়ে শক্তিশালী ক্যারেক্টার তো অবশ্যই বিদ্যা বালান (কুমারী মা হওয়ার সাহস দেখিয়েছেন, একা লালন পালন করেছেন বিরল রোগে আক্রান্ত সন্তানকে)।

কেউ বলেছেন, অমিতাভ বচ্চন (১২ বছর বয়সী অথচ কি ম্যাচিউরড চরিত্র!)। কেউ কেউ এমনকি অভিষেক বচ্চন এর চরিত্রটির কথাও বলেছেন (সৎ, এনার্জিটিক তরুণ, যে নিজের ভুল বোঝামাত্র অনুতপ্ত হয়েছেন, ক্ষমা চেয়ে ভুল শুধরাতে উদ্যোগী হয়েছেন)।
আমার কাছে কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী মনে হয়েছে বিদ্যা বালানের মায়ের চরিত্রটিকে।

আমরা তারকাদের শুধু মনে রাখি বলে এরকম পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীদের নামও জানার প্রয়োজন মনে করি না। আমারও ভদ্রমহিলার নাম জানা নেই।  মনে করে দেখুন, কনসিভ করা কুমারী বিদ্যা বালান কেঁদে বলছিল, ‘আমি বাচ্চা নষ্ট করে ফেলবো’।

বিদ্যার মা তখন বলেন, ‘তুমি কি বাচ্চাটা রাখতে চাও’? আবেগে অবরুদ্ধ বিদ্যা বলতে যায়, ‘কিন্তু সমাজ’…বিদ্যার কথা শেষ করতে দেন না তিনি, কঠিন আর দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘তুমি কি চাও’?
বলাই বাহুল্য বিদ্যা বাচ্চাটা রাখতে চান। এবং পরবর্তীতে আমরা দেখি, জীবনের পুরোটা সময় কুমারী মা হওয়া কন্যার পাশে থেকেছেন এই নারী। একটা বিরল রোগে আক্রান্ত নাতির যতরকম সামাজিক, মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয় বিদ্যার পাশে থেকে গিয়েছেন তার মা।

তাই শেষ দৃশ্যেও বালাকৃষ্ণান দেখিয়েছেন, মৃত্যুর বিছানায় শোয়া অমিতাভ বচ্চন যখন চেয়েছে তার বাবা-মায়ের বিয়ে হোক, সন্তানের বিছানা মাঝখানে রেখে সাতপাক ঘোরা বিদ্যা আর অভিষেকের বিয়ের মন্ত্র পড়িয়েছেন কোন পুরোহিত নয়, এই ভদ্রমহিলা।

Urmiআমার মাঝে মাঝে মনে হয়, একজন নারী বা পুরুষ হাজারও সংকটে দৃঢ় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, যদি বাবা-মা বিশেষ করে মা সাপোর্টিভ হন। কোন মা যদি তার সন্তানকে এই ফিলিংটা দিতে পারেন যে, ‘পৃথিবীতে যা কিছুই ঘটুক, যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি তোমার পাশে আর সাথে আছি’, তাহলে সেই সন্তানকে দাবায়া রাখে এমন ক্ষমতা কারও হয় না।
মা দিবসে ফেসবুকে মায়েদের অবদান পড়ছিলাম। কত-শত কষ্ট, সংগ্রাম আর আবেগে থরোথরো সব গল্প।

আমার ফেসবুকে থাকা সবচেয়ে নেগেটিভ মানুষটিও লিখেছেন, তার মা সবসময় তার পাশে ছিলেন। আমি ভাবছিলাম, এ জগতে এর উল্টো গল্পও কিন্তু কম নেই! সংকটে, সংগ্রামে মাকে পাশে পাওয়া যায়নি, এমন মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়।

স্বার্থপর, মিথ্যা অহংকারে নিজের মত সন্তানের উপর চাপিয়ে দেওয়া, চূড়ান্ত অযৌক্তিক ভাবনা করা- এমন মা কিন্তু শুধুই বাংলা সিনেমার চরিত্র নয়, আমাদের আশে-পাশেই আছে। শুধু মায়ের কারণেই জীবন বিষময় হয়ে গেছে এমন মানুষও আছেন। শেষবিচারে এই মায়েরাও সন্তানের ভালোই চান, কিন্তু ওয়ে অব থিংকিং আর সন্তানের মন বুঝতে না পারা এই মায়েদের জন্য নষ্ট হয়ে যায় কতো কতো জীবন।

আমরা ব্যক্তি পূজা এবং বিসর্জনের দেশের মানুষ। দেবী বানিয়ে পূজা করি, তারপর নির্দিষ্ট সময় পর বিসর্জনও দিই। কিন্তু মা-ও তো রক্ত-মাংসের মানুষ, তারও থাকে ভুল-ত্রুটি, অন্যায়।

আমার মেয়ে নহলীর জন্মদিন গেল। কেক-ফেক কাটা, গিফট দেওয়া, ব্লা ব্লা শেষ হয়েছে। ঠাণ্ডা হয়ে ভাবছি, এখন কী কর্তব্য আমার! যেন অন্তত আমি সেই মা হতে পারি, যেকোনো পরিস্থিতিতে যে সন্তানের পাশে থেকে তাকে শক্তি আর সাহস যোগায়।

মা-বাবা যদি পাশে থাকে, যেকোনো ঝঞ্ঝা আর সংগ্রামে সন্তান একাই লড়তে পারে আত্মবিশ্বাসের সাথে। শুধু শারীরিকভাবে নয়, মা-ও আসলে হয়ে উঠতে হয়। দিনে দিনে। বায়োলজিক্যালি মা হয়েছি, এবার মানসিকভাবে মা হওয়ার পথটা চলা শুরু করতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 87
  •  
  •  
  •  
  •  
    87
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.