বিজ্ঞানের জননীগণ

0

খান তানজীদ ওসমান: মা দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে চলুন এক বিশেষ ধরনের ‘মা’দের নিয়ে কথা বলি –  বিজ্ঞান জগতের মা। এই জননীগণ বিজ্ঞানের কোন বিষয়ে সর্বপ্রথম কোন অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, এমনই গুরুত্বপূর্ণ অবদান যে তাদেরকে এখন এসব বিজ্ঞান বিষয়গুলির ‘জননী’ বলা চলে।

লিঙ্গবৈষম্য এবং অন্যান্য যেসব সামাজিক বাধা অতিক্রম করে এই জননীগণ অসাধারণ হয়েছেন তার কাহিনীগুলি অতুলনীয়। পুরুষশাসিত সমাজের বিজ্ঞানসমাজও পুরুষপ্রধান। তাদের বাইরে খুব কম নারী বিজ্ঞানীকেই আমরা পাদপ্রদীপে দেখি। এদেরমাঝেও এখানে উল্লেখিত নারীবিজ্ঞানীগণ যেন তারার মত জ্বলছেন। এঁরা নমস্য।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে শখানেক এরকম বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ বিজ্ঞানীর মধ্যে মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন নারী। এর বেশ কিছু কারন আছে – ঐতিহাসিকভাবেই নারীদেরকে শিক্ষা পেতে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেতে বঞ্চিত হয়েছেন, উচ্চশিক্ষার কথা তো বাদই দেয়া যায়। নারীকে ভাবা হতো ‘দূর্বল-মনের’ লিঙ্গ এবং বিজ্ঞানকে বিশেষ করে ধরা হত ‘পুরুষ মানুষের কাজ’ হিসেবে। যদিও এই তালিকাটিতে উল্লেখিত নারীরাই শুধুমাত্র বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেননি, এরা ছাড়াও আরও অনেকেই ছিলেন। এখানে শুধুমাত্র কয়েকজন নারীর কথা উল্লেখ করা হল যাদেরকে বিজ্ঞানের কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ের জননী বলা চলে।  

Florence Nitআধুনিক নার্সিং এর জননী

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল (Florence Nightingale) (১৮২০ – ১৯১০) ছিলেন একজন ইংরেজ নার্স, ১৮৫০ সালের ক্রাইমিয়ান যুদ্ধের সময়। ৩৮ জন নার্সের দলের নেত্রী হিসেবে বিদেশে মোতায়েনের সময় তিনি এমন একটি পরিবেশে এসে হাজির হলেন যা ছিল এতই অস্বাস্থ্যকর যে সাধারন যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে ১০ গুণ বেশি সৈন্য মারা যেতে থাকলো অসুখে (যেমন টাইফাস, ডিসেন্ট্রি, কলেরা), শুধুমাত্র একটি শীতে মারা যায় প্রায় ৪০০০ সৈন্য। নাইটিঙ্গেল রোগীদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য কাজ করলেন, হাত ধোয়া এবং পয়োনিষ্কাশণ ব্যবস্থার উন্নতির মত জিনিসগুলি নিয়ে। ফলে, যুদ্ধশেষ নাগাদ মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে গেল।

ইংল্যান্ডে ফিরে নাইটিঙ্গেল সামরিক বাহিনীর উন্নত জীবনব্যবস্থার জন্য প্রচারণা চালালেন Royal Commission on the Health of the Army এর জন্য ৮৩০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন লিখে, যেখানে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যবহারের জন্য কক্সকম্ব পরিসংখ্যান (coxcomb statistics) ব্যবহার করেছিলেন। কক্সকম্ব পরিসংখ্যান হল হাসপাতালে মৃত্যুহারের সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তথ্য ব্যবস্থাপনা করা। তিনি Royal Statistical Society’র প্রথম মহিলা সদস্য হিসেবে মনোনিত হন ১৮৫৯ সালে এবং পরে  American Statistical Association এর সাম্মানিক সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পান। তিনি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যেটা Florence Nightingale School of Nursing and Midwifery নামে বর্তমানে পরিচিত। এটা ছিল বিশ্বের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ নার্সিং স্কুল যা নার্সদের প্রাতিষ্ঠানিক মেডিকেল প্রশিক্ষণ প্রদান করতো, হাসপাতলের পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং জীবাণুহীন রাখার উপায় বিশেষভাবে শেখানো হত। নার্সিং নিয়ে নাইটিঙ্গেলের লেখা বই, নোট এখনও প্রকাশিত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং এখনও প্রাসঙ্গিক।

Merry Curieপারমাণবিক বিজ্ঞানের জননী

মেরি কুরির নাম হয়তো শুনেছেন, তর্কসাপেক্ষিকভাবে আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত নারী। মেরি শ্ক্লোডোভস্কা কুরি (১৮৬৭-১৯৩৪) ছিলেন পোলিশ-ফরাসী পদার্থবিদ এবং রসায়নবিদ, যার গবেষণা ছিল তেজষ্ক্রিয়তা (radioactivity – যে শব্দটা তিনিই উদ্ভাবন করেছিলেন) নিয়ে আমাদের প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক ধারনা তৈরি। তিনিই প্রথম নারী যিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন, প্রথম মানুষ যিনি দুইবার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন, এবং তিনিই প্রথম মানুষ যিনি বিজ্ঞানের দুইটি ভিন্ন শাখায় দুইবার নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনি তেজষ্ক্রিয়তার সূত্র, তেজষ্ক্রিয় আইসোটোপ পৃথকিকরণের উপায় উদ্ভাবন, এবং পোলোনিয়াম এবং রেডিয়াম নামক দুইটি মৌল আবিষ্কার করেন।

কুরি এবং তার বিজ্ঞানী স্বামী পিয়েরে কুরি মিলে ৪ বছরে মোট ৩২টি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ প্রকাশ করেন। আবিষ্কারগুলির একটি ছিল টিউমার তেরি করা কোষগুলি রেডিয়ামের সান্নিধ্যে আসলে সুস্থকোষের আগেই মরে যায়। এই পদ্ধতি ক্যান্সারের আধুনিক তেজষ্ক্রিয়তা চিকিৎসার ভিত্তি ছিল।

Henrieta Leavittভৌত জোতির্বিজ্ঞানের জননী

হেনরিয়েটা সোয়ান লিভিট (১৮৬৮-১৯২১) একজন আমেরিকান মহাকাশবিজ্ঞানী ছিলেন এবং বিষমতারার পিরিওড-লুমিনোসিটি সম্পর্ক (কখনও কখনও লিভিটের সূত্রও বলা হয়) উদ্ভাবন করেন, যা মহাকাশবিজ্ঞানীদের পৃথিবী থেকে অতিদূরের তারাগুলির দূরত্ব নির্ধারনে সাহায্য করে।

আপনি সম্ভবত এডউইন হাবল, বা হাবলের সূত্রের কথা শুনেছেন। অন্ততঃ হাবল টেলিস্কোপের কথা তো শুনেছেন, নাকি? হুম, তাহলে হাবলকে একজন বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে কল্পনা করে নিতে পারেন যিনি যেকোন চাবিকে তালায় ঢোকাতে সক্ষম, তবে লিভিট হলেন চাবিটা স্বয়ং। যে জোতির্বিজ্ঞানকে আমরা আজকে চিনি, তাতে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ লিভিটের কাজ।

লিভিট ‘মনুষ্য কম্পিউটার’ হিসেবে Harvard College Observatory তে কাজ শুরু করেছিলেন ১৮৯৩ সালে বিষমতারা ঔজ্জ্বল্য নিয়ে, বিষমতারা হল সেসব নক্ষত্র যাদের ঔজ্জ্বল্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনশীল। একজন নারী ছিলেন টেলিস্কোপ যন্ত্রটিকে নিজে ধরার অধিকার লিভিটের ছিলনা। কিন্তু মানমন্দিরের সংগ্রহের প্রায় ২০০০ টি ফটোগ্রাফিক প্লেট পর্যবেক্ষণ করার পর তিনি তারাগুলির মধ্যে একধরনের ধাঁচ বুঝতে সক্ষম হলেন। ১৯০৮ সালে তিনি পৃথিবীবিখ্যাত সাময়িকীতে তাঁর গবেষণা প্রকাশ করেন যেখানে দেখান যে উজ্জ্বল তারাগুলির লম্বা চক্রকাল থাকে (period বা চক্রকাল হল কোন তারার জ্বলা এবং নেভার মধ্যকার সময়)।

Alen Richardsগার্হস্থ্য বিজ্ঞানের জননী

এলেন শোয়ালো রিচার্ডস (১৮৪২-১৯১১) ছিলেন আমেরিকান শিল্প এবং পরিবেশ রসায়নবিদ যিনি নারীশিক্ষার জন্য ওকালতি করতেন, স্বাস্হ্যকর প্রকৌশলের প্রবর্তন করেছিলেন এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত Massachusetts Institute of Technology (MIT)’র প্রথম নারী শিক্ষার্থী এবং পরবর্তীতে সেখানকার প্রথম নারীশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। উচ্চতর ডিগ্রী গ্রহণের পর তিনি স্বাস্থ্যকর রসায়নে মনোনিবেশ করেন, যেখানে পানি, বায়ু এবং খাবারের দূষণমাত্র পরীক্ষা নিয়ে কাজ করা হতো। তার কাজ আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রীয় পানি-গুণ মান নির্ধারণে এবং প্রথম আধুনিক মিউনিসিপ্যাল পয়োনিষ্কাশন কেন্দ্র তৈরিতে সাহায্য করেছে।

রিচার্ডস তাঁর গার্হস্থ্য অর্থনীতি আন্দোলন শুরু করেন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে গৃহস্থালী কাজে লাগানোর মধ্য দিয়ে এবং এর মাধ্যমে গৃহের এবং পরিবারের পুষ্টির দায়িত্বে থাকা নারীদেরকে পথ দেখিয়ে, তাদেরকে বিজ্ঞানশিক্ষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশে উৎসাহ দিয়ে।  তিনি ‘ecology’ শব্দটি প্রথম ইংরেজী ভাষায় আনয়ন করেন, যার সংজ্ঞা প্রদানে গ্রাহকের পুষ্টি এবং পরিবেশ শিক্ষাকে অন্তর্ভূক্ত করেন (যদিও এই দুইটা আলাদা বিভাগ হয়ে গিয়েছে পরবর্তীতে)। রিচার্ড  American Home Economics Association প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন এবং তিনি Journal of Home Economics সাময়িকীটিও (এখন Journal of Family and Consumer Sciences নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন।

Ada Lovelaceকম্পিউটার প্রোগ্রামিং এর ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক’ জননী

এডা লাভলেইস (১৮১৫-১৮৫২) ছিলেন একজন ইংরেজ অংকবিদ, যিনি নিজেকে ‘কাব্যিক বিজ্ঞানী’ হিসেবে পরিচিতি দিতেন। তিনি কম্পিউটারের উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত চার্লস ব্যাবেজের সাথে প্রথম দেখা করেন ১৭ বছর বয়সে। অংকের প্রতি পারষ্পরিক কৌতুহল থাকার কারনে তারা খুব কাছাকাছি চলে আসে শিঘ্রিই, আর লাভলেইস অবিলম্বে ব্যাবেজের বিশ্লেষণাত্মক যন্ত্রের প্রতি অতিআগ্রহী হয়ে পরেন। বছর দশেকের একসঙ্গে কাজের পরে, লাভলেইস ইংরেজীতে একটি লেখা অনুবাদ করেন যেখানে তিনি সঙ্গে তাঁর নিজস্ব চিন্তাকে প্রকাশ করা নোটগুলিও দিয়ে দেন – যে নোটগুলি ছিল মূল লেখার তথ্যের চেয়েও ৩ গুণ বেশি বিশ্লেষণাত্মক। তার নোটগুলি ছিল কিছু নির্দিষ্ট অংকের সমাধানের জন্য প্রথম প্রকাশিত ধাপেধাপে বিন্যাস করার অপারেশান – যাকে অন্য কথায় বলা চলে, একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম।

যদিও এটা ব্যাপকভাবে গৃহীত যে এমনকি কম্পিউটারের ধারণাটা আসার আগেই তিনিই প্রথম হাতের লেখায় কম্পিউটার প্রোগ্রাম লিখেছিলেন তারপরও কম্পিউটারের প্রোগ্রামিং এর জননী হিসেবে লাভলেইসের অবস্থান বিতর্কিত। যেহেতু তিনি এবং ব্যাবেজ তাদের লেখালেখি এবং ধারণা এত বেশি পরিমানে আদানপ্রদান করেছেন যে এলগোরিদম লাভলেইস প্রকাশ করেছেন তার পুরো কৃতিত্ব তাকে দেয়ে যায় কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়াটা কষ্টকর। যেটা আমরা জানি তা হলো লাভলেইস ব্যাবেজের সমদক্ষতাতেই ‘যন্ত্র’টিকে বুঝতেন, কিন্তু তিনি এর সম্ভাবনা সম্বন্ধে ধারণাতে পক্কতর ছিলেন। তিনি এমন একটি ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ছবি দেখতে পেয়েছিলেন যেখানে কম্পিউটারগুলি শুধু সাধারণ গণনাই করবে না, বরং সংগীত সৃষ্টি থেকে ছবি আঁকা পর্যন্ত সবকিছুই করতে সক্ষম হবে।

লেখাটি একটি অনুবাদ। কিছুটা পরিবর্তিত এবং নিজস্ব ভাষা ব্যবহৃত যদিও। মূল লেখাটি পাবেন এখানে:  http://crosstalk.cell.com/blog/the-mothers-of-science?sf25812828=1

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.