ফরমালিন থেকে ভিটামিন

0

শাহানা হুদা: বাজার থেকে রুই মাছটা আনার পরপরই দেশের বাড়ি ঠাকুরগাঁও থেকে খবর এলো, মা অসুস্থ। তাই সাত-পাঁচ চিন্তা না করে মাছটা রান্নাঘরের মেঝেতে ফেলে রেখে শিশিরদা, মানে চিত্রকর ও কার্টুনিস্ট শিশির ভট্টাচার্য কোনমতে দরজায় তালা লাগিয়ে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে ঘরের চাবিটা নিচে বাড়িওয়ালার বাসায় দিয়ে গেলেন এই বলে যে, ছুটা গৃহকর্মি সালেহা এলে তার কাছে দিতে।

Ranjanaশিশিরদার ধারণা ছিল সালেহা এসে মাছটা কেটেকুটে ফ্রিজে রেখে দেবে। শিশিরদার স্ত্রী ক্যামেলিয়াদিও সেসময় কোন কারণে ঢাকায় ছিলেন না। অগত্যা সালেহার উপরই ভরসা।

তিনদিন পর শিশিরদা বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরে এলেন। চাবি নিতে গিয়ে জানতে পারলেন, এই তিনদিনে সালেহাও ছুটি কাটিয়েছে, মানে আসেইনি। তৎক্ষণাৎ শিশিরদার মনে হলো বাজার থেকে আনা রুই মাছটার কথা।

হায় হায় তাহলে তো মাছটি গলেপচে একাকার হয়েছে। ঘর নিশ্চয়ই বাজে গন্ধে ভরে গেছে। ছুটে দোতলায় এসে তালা খুলে ঘরে ঢোকার পর একটা বাজে গন্ধ এসে নাকে লাগলো, তবে খুব একটা প্রকট নয়। আর রান্নাঘরে ঢুকেতো শিশিরদার চক্ষু চড়কগাছ।

তার আনা রুই মাছটি বেশ তাজা তাজা চেহারা নিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। শিশিরদা নাকি এটা দেখে রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। মাছটাকে নাকি ভূত ভূত মনে হয়েছিল তার।

বেশ কয়েকবছর আগের ঘটনা এটি, তখনও ঢাকার লোকেরা ‘ফরমালিন’ শব্দটার সাথে তেমনভাবে পরিচিত ছিল না । আর তাই ভূতের কাজ মনে করে মাছটিকে ফেলে দিয়েছিলেন। কাহিনীটি ছিল সম্ভবত ১৯৯৬/৯৭ সালের ।

এখন সময় পাল্টেছে। আমরা ফরমালিন চিনেছি, এর বিবিধ ব্যবহার জেনেছি। আগে জানতাম শুধু মরদেহ সংরক্ষণের কাজে ফরমালিন ব্যবহৃত হয়। আজ জানি আমাদের সকল খাবার সামগ্রীতে ফরমালিনের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে এবং আমরা বেশ সহজভাবেই একে গ্রহণ করছি। উপরন্তু কীভাবে খাদ্যে ফরমালিনের প্রভাব কমানো যায় সেসব উপায়ও খুঁজে বের করছি। এখন তো মাছ থেকে জীবিত মানুষ পর্যন্ত অনেকেই ফরমালিন এর আওতায় আছে।

ব্যাপারটা এতোটাই স্বাভাবিক বলে মনে করছি যে, আমাদের পরিচিত একজন নারী, যিনি যুগ যুগ ধরে একইরকম হয়ে আছেন, মানে বয়স বাড়ছে না, তাকে কিন্তু আমরা সবাই আড়ালে দুষ্টুমি করে ‘ফরমালিন সুন্দরী’ বলে ডাকি । অবশ্য ঊনি শিল্পের সাথে জড়িত বলেই হয়তো নিজেকে একইরকমভাবে শৈল্পিক করে রাখতে পেরেছেন।

তাহলে হঠাৎ করে কেন আবার ফরমালিন কাহিনী নিয়ে পড়লাম? আমরা তো এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি । আমরাতো শিশিরদার মত এসবকে ভূতুরে কাজ বলেও মনে করছি না।

Peyaraফরমালিন ব্যবহারের পরপর কয়েকটি উদাহরণ দেখে আবার নতুন করে পুরানো কাহিনী মনে পড়লো। আমাদের সহকর্মী সোমার প্রিয় ফল পেয়ারা। প্রায়ই পেয়ারা কিনে আনে। এবার একটু বেশি পরিমাণে কিনে ফেললো এবং দেখলো তিন সপ্তাহ মানে ২১ দিন অতিবাহিত হলেও একটি পেয়ারা টিকে আছে। শুধু চেহারাটা খানিকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে।

Tomatoএকই সময়, একই অভিজ্ঞতা হলো আমাদের সহকর্মী রোকন ভাইয়ের। বাসায় টমেটো কিনে আনার পর প্রায় ১৪ দিন পার হয়ে গেল, কিছু টমেটো অটুট থেকে গেল। আর অফিসে নিজের ডেস্কটপের সামনে বনশ্রীদি ১০ দিন একটি আপেল সাজিয়ে রেখে অত:পর ফেলে দিলেন। আপেলটি অবশ্য সতেজই ছিল, চাইলে আরো ১০ দিন রাখা যেতে পারতো।

আর আমাদের বাসায় ঘটলো আরো একটি মজার ঘটনা। ছোট সাইজের কমলার একটি ব্যাগ কিনলাম। একে দোকানদাররা চাইনিজ কমলা বলে। ছোট সাইজ এবং বেশ ভালো লাগে খেতে, তাই ২/১ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু একবার আমাদের বাসার কুকুর জুডু কমলাগুলোকে বল ভেবে একটা কমলা সবার অগোচরে নিয়ে গিয়ে ওর আস্তানায় রেখে দিয়েছিল। এরপর বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। আমরা খাটের নীচ পরিস্কার করতে গিয়ে জুডুর আস্তানা থেকে কমলাটি উদ্ধার করলাম এবং প্রায় অক্ষত। সেরকম সতেজই আছে। কাজেই বোঝাই গেল সেই ফরমালিন ভূতটা এথনও পিঠে সওয়ার হয়ে আছে। আমাদের ছেড়ে যায়নি ।

আম, জাম, কমলা, তরমুজ, পেঁপেসহ প্রায় সব ফলেই এবং সবধরনের মাছে মেশানো হচ্ছে ফরমালিন। আরো কিসে যে, কী, কী মেশানো হচ্ছে, তা বোধকরি একমাত্র বিধাতাই বলতে পারেন।

আমরা বিভিন্নজনের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকেও খাদ্যে ফরমালিন মেশানো সংক্রান্ত অনেক তথ্য জানতে পেরেছি, কিন্তু আরো অনেককিছু জানতে বাকি আছে । যাক এনিয়ে ভেবে আর লাভ কী!

”পড়েছি মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে’। আর খাবারের মাধ্যমে এতো ফরমালিন গ্রহণ করি বলেই হয়তো এত বিপদ-আপদ সত্ত্বেও আমরা শরীরকে পাত্তা না দিয়ে হাসিখুশি মন নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।

ফরমালিন দেয়া মাছ খাবে না বলে মানুষজন এখন দোকানে গিয়ে বদ্ধ বাক্সে যেসব মাছ পানিতে সাঁতার কাটছে, সেইসব মাছ কিনছে। জিওল মাছ ছাড়াও আরো অনেক ধরনের মাছ পানিতে দিব্যি বেঁচে আছে। তাজা মাছে তো আর ফরমালিন থাকার আশংকা নেই।

তা নেই বটে, তবে সেইসব মাছ তাজা রাখতে নাকি মাছকে বিশেষ ধরনের ভিটামিন খাওয়ানো হয় । আমাদের এলাকায় একটি ভ্যানগাড়ির উপর রীতিমতো ৫/৬ টি ছোট সাইজের একুরিয়ামে করে এইসব ‘তাজা’ মাছ বিক্রি হচ্ছে। মাছওয়ালার কাছে ‘মাছ এতো তাজা থাকছে কীভাবে’ জানতে চাইলে বললো,  ‘ম্যাডাম ভিটামিন দেইতো তাই’।

আমি আবার আঁৎকে উঠলাম, ফরমালিন থেকে এবার ভিটামিন তাহলে।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ২১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.