তুচ্ছ সব বিষয়-আশয়ে লেগে থাকা মা

কাবেরী গায়েন: আমরা, মানে আমাদের ভাইবোনেরা, ঠিক আহ্লাদি বাচ্চা বলতে যা বুঝায়, তেমন ছিলাম না ছোটবেলায়। বরং ‘বাবলু-লাবু-সেন্টু-কাবি-লিলি খাইতে আসো।’ মা’র এক ডাকে সবাই খেতে বসে যেতাম।

Kaberiঘন্টা দুয়েক পুকুরে ডুবে থেকে চোখ লাল আর গা-হাতপায়ে সাদা খড়ি তুলে স্নান সেরে নিজেই স্কুলের জামা পরে মা’কে বলতাম, ‘মা, আসি’। রান্নাঘরে কাজের ভেতর থেকে মা’র উত্তর হতো, ‘আসো।’
গরমের ছুটিতে পুকুরে কলার ভেলায় ভেসে থাকা আর জল-ছোঁয়াছুয়ি খেলা করতে করতে কয়েক ঘন্টা কেটে যাবার পরে মাঝে মাঝে মা’র চ্যালাকাঠ নিয়ে ঘাটে আসা আর আমার ফের ডুব দিয়ে পুকুরের ওইপারে চলে যাওয়া ছিলো পরিচিত দৃশ্য।
পরিবারে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ ছিলো না। তবে মাঝে-মধ্যেই মা’র পায়েস রান্নার কথা মনে আছে। দিদির ধারণা, মা ভাইবোনদের জন্মদিনের কথা মনে করে পায়েস রান্না করতেন। একটু বড় হলে, বাসার আর্থিক অবস্থা খানিক ভালো হলে, লিলির জন্মদিন ভালোভাবে আর আমার জন্মদিন মোটামুটিভাবে পালন করার রেওয়াজ চালু হলো অবশ্য।
ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার’, ক্লাস সিক্সে উঠে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’, ‘বিনয়-বাদল-দীনেশ’ পড়া মা’র হাত ধরে। স্বদেশী আন্দোলনের গল্প ছিলো বোধহয় মা’র সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। তারপর রবীন্দ্রনাথ। মা’র গলাতেই প্রথম শোনা, ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’…
একবার বোম্বে থেকে লিলির চিকিৎসাশেষে ফিরে মা দুঃখ করলেন। সেই হাসপাতালের পাশেই ছিলো এক আর্কিটেকচার কলেজ। সেখানে মেয়েরা দিনরাত প্যান্ট-শার্ট পড়ে সাঁইসাঁই না কি হেঁটে যায়, সাইকেল চালায়। তাঁর দীর্ঘশ্বাস, অমন পরিবেশ পেলে আমরাও না কি আরো কতো ভালো হতে পারতাম!
দিদির মেয়ে তুলতুলের জন্মের পরে মা’র উপলব্ধি, মেয়েদের কুংফু-কারাতি শেখাটা একান্ত দরকার, পড়াশোনার মতোই দরকার। ওদের শেখাতে হবে। না’হলে যে দিনকাল পড়ছে! এদেশে তো মেয়েদের খেলারও কোন ব্যবস্থা নেই।
মেয়ে কোন খারাপ ছেলের পাল্লায় পড়লো কি না, পথে কোন দুর্ঘটনা হলো কি না নিয়ে যার দুঃশ্চিন্তার শেষ ছিলো না, সেই মা ক্রমাগত চিঠি লিখতে লাগলেন দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। ‘যদি কোথাও একটা সুন্দর দৃশ্য দেখো, দেখে যদি মনে হয়, বাহ! সুন্দর তো!, তবে জীবনে দুঃখ-কষ্ট এলেও ওই সুন্দর স্মৃতি তোমাকে বাঁচতে সাহায্য করবে।’ তাঁর গদ্য অসাধারণ।
আমরা বড় হতে হতে মা নিজেকে পাল্টেই চললেন। বাবা বরাবরের আদর্শবাদী বাবাই থাকলেন। আমরা আমদের মতো। শুধু সন্তানদের চাওয়া-পাওয়ার সাথে মিলিয়ে যিনি ক্রমাগত পাল্টেছেন, তিনি মা।
বাজারের মা-বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস, ছানাপোনা দিবস, হাঁচিকাশি দিবসে কোন আগ্রহ নেই। তবুও, কারো কারো ফেসবুক আপডেট দেখে মনে পড়লো।
মনে পড়লো, আমার পিএইচডি থিসিস জমা দেবার সময় হয়েছে প্রায়। মা নিউ জার্সি যাবেন ১৯ মে, আমি থিসিস জমা দিয়ে প্রথমে ওখানে যাবো, তারপর দুজনে দেশে ফিরবো একসাথে। ফোনে কথা হলো, অনেকদিন মাছের ঝোল খাওয়া হয় না, দেশে ফিরে খাবো। মা ৩রা মে চলে গেলেন ঘুমের ভেতর।
সে’সব দিনের কথা বরং থাক। আমি সবকিছু মানিয়ে নিয়েছি তারপর। শুধু খাওয়াটা হয়ে গেছে এখন খিদা মিটানোর উপায়। এ’জীবনে অনেক মাছের ঝোল খেয়েছি তারপর, খাবো ফের অনেক, নিজেও রান্না করতে পারি খারাপ না। কিন্তু, না। সেই মাছের ঝোল আর খাওয়া হলো না।
এতো তুচ্ছ একটা বিষয়ে অতৃপ্তি নিয়েই মরে যেতে হবে। ভাগ্যিস, ফ্রিজে আচারের বয়ামে আমার নাম তাঁর অসাধারণ হাতের লেখায় ইংরেজি আর বাংলায় লিখে রেখেছিলেন! নাহলে’ অতৃপ্তির তালিকায় আরো এক তুচ্ছ বিষয় যোগ হতো।
বৃষ্টির দিনে চালভাজা-নারকেলে স্বাদ-সাধ হারিয়েছি। জোরে কবিতা পড়া আর হয় না। বাসায় বাংলা উপন্যাস এলে কে আগে পড়বে, সেই নিয়ে চাপা উৎকন্ঠা আর নেই। এগুলো আসলেই খুব তুচ্ছ বিষয়। আমার জীবনের এমন সব তুচ্ছ বিষয়েই লেগে আছেন মা। আলাদা করে মনে করবার দরকার পড়ে না।
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.