স্বদেশ থেকে পালিয়ে বাঁচা সহোদর আমার

বনানী বিশ্বাস: নব্বইয়ের দশকে গ্রামে গ্রামে একটা হুজুগ উঠেছিল- ‘এদেশে বুঝি আর থাকা যাবে না!’ তাই যে যেভাবে পারত ইন্ডিয়ায় আত্মীয়, দূর আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে কচি কচি সন্তানদের পড়াত। মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে তার অপত্য স্নেহের সন্তানকে দূরে রাখা কত যে বেদনাদায়ক-মর্মপীড়ক – সে কেবল ভুক্তভুগীরাই জানে!

দাদা আর আমাকে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই ’৯৫ সালে। কলকাতা অব্দি গিয়ে আমি ফিরে এসেছিলাম। দাদাকে এক আত্মীয় নিয়ে গিয়েছিল মধ্য ভারতে।

মাস ছয়েক আগে দাদার ওখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাড়ির জন্য শপিং করতে মধ্য প্রদেশের সাগর শহরে গেলে দোকানি উপরের তাক থেকে বাংলাদেশের তৈরি একটা শার্ট বের করে বললেন- ‘এ শার্ট লিজিয়ে ডাক্তারবাবু, বহুত আচ্ছা হে শার্ট, এ বাংলাদেশ ছে আয়া হে।” দাদা শার্টের ট্যাগে ‘Made in Bangladesh’ লেখার জায়গাটিতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল- ‘লেকিন বাংলাদেশ বহুত জঙ্গি রাষ্ট্র, আদমি ভি বহুত বুরা হ্যায়।’ দোকানি বলল- ‘আদমি খারাবহো সাকতে লেকিন চিজ আচ্ছা হ্যায়।’ দাদা যতই এদেশের সমালোচনা করে দোকানি ততই ভাল দিকগুলো তুলে ধরে।

এভাবে আলাপচারিতার ফাঁকে দাদার চোখে জমে আসা মুক্ত দুটো মুছলো সবার অলক্ষ্যে। দোকান থেকে বেরিয়ে বললাম- ‘তুই যে শার্টটা কিনেছিস তা আমাদের নিউমার্কেট-গুলিস্থানে ২০০ টাকায় পাওয়া যায়। হ্যাঁ রে, তুই অমন বাজে কথা বলছিলি কেন দোকানিকে?’ দাদা বলল-‘শোন, পশ্চিম বঙ্গের বাইরের মানুষেরা বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে জানে। আমরা যারা বিভিন্ন প্রদেশে ডাক্তারি কিংবা অন্য কাজ করি কেউই নিজের দেশের বা জাতের পরিচয় দিতে পারি না। বলতে হয়- বাড়ি কলকাতায়, জাতিতে ব্রাহ্মণ বা রাজপুত টাইপের কোন টাইটেল। মাঝে মাঝে মনে হয় সব ছেড়ে ছুড়ে ফিরে যাই! তোরা কত ভাল আছিস, নারে?’

বাড়িতে আসার সময় দাদা আমার বেনাপোল বর্ডার পার হয়েই ভুট হয়ে প্রণাম করে মাটিতে, ধুলি মাখে সারা গায়ে। দাদার কাণ্ড দেখে কুলিরা হাসে।

বাড়ি করবার সময় ভিটে থেকে মাটি নিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল তার নতুন কেনা জমিতে। ঠাকুরের আসনে একটা পাত্রে রাখা আছে আমাদের ভিটের মাটি। কোন শুভ কাজে অথবা ছেলের পরীক্ষার সময় কপালে তিলকের পরিবর্তে দেয় ভিটের মাটির জয় টিকা। সন্তানদের শিক্ষা দেয়-এ মাটিতে জন্মেছে আমার পূর্ব পুরুষ এ মাটি বড় পুণ্যময় মাটি।

এ রকম হিজিবিজি পাগলামি করে আমার অগ্রজ। ওখানে দিলিপদা যতই ভাল উপার্জন করুক না কেন, ওর মন পড়ে থাকে আমাদের ছোট্ট উঠনের আঙ্গিনায় বেড়ে ওঠা লাউ গাছটির লতায়। অথবা পুকুরপাড়ের কাঁঠাল গাছটি ঝড়ে পড়ল কিনা এই আশঙ্কায়।

এবার আসি আরেক কথায়। বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি ও আবৃত্তি শিল্পী রবি শঙ্কর মৈত্রীকে ইদানিং দেখতে পাই আমার সহোদরের মধ্যে অথবা সহোদরকে দেখতে পাই রবিদার মধ্যে।

বাংলাদেশের হিন্দুদের মেধাবী হতে নেই, ব্যবসা করতে নেই, সৃজনশীল হতে নেই, নারী হতে নেই, সুন্দরী হতে নেই, জমি থাকতে নেই, বাড়ি থাকতে নেই, বোন থাকতে নেই, বউ থাকতে নেই, সর্বোপরি দেশকে ভালবাসতেও নেই। এসব থাকা আপরাধ, আর আপরাধী হলে তো শাস্তি পেতেই হবে!

রবি শঙ্কর মৈত্রীকে যতটুকু জানি, তিনি বাংলা ভাষা, বাংলা গান, বাংলা কবিতা, বাংলা সংস্কৃতি সর্বোপরি বাংলাদেশকে ভালবাসেন অন্ধের মতো। রবিদার জীবন এতটাই বাংলাময় যে, টেলিভিশান চ্যানেল করতে গিয়েও তার নাম রেখেছিলেন “গান বাংলা”। সম্প্রতি রবিদার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে বেশ হৈ চৈ পড়েছে আড্ডায়, ফেসবুকে। আমি কিন্তু বিচলিত হইনি একটুও। এগুলো হল দেশপ্রেমের ফল। প্রেম করবেন আথছ প্রায়শ্চিত্ত করবেন না-তা কি হয়? এই প্রায়শ্চিত্ত চলছে একাত্তর থেকে আজও।

আমি জানি, আমার দাদার মত তারও দেশের জন্য চোখ কাঁদে-মন কাঁদে। রবিদা যতই ধনী দেশে থাকুক না কেন – তার মন পড়ে থাকে শাহবাগে, আজিজ সুপার মার্কেটে, পরিবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে অথবা নিভৃত পল্লীর কোন অখ্যাত স্কুলের কবিতার কর্মশালায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশের আরেক শক্তিধর আবৃত্তি শিল্পী আহকাম উল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন- “আমার বন্ধুকে আমি দেশে ফিরিয়ে আনব।” বন্ধু বৎসল আহকাম ভাই তা করবেন জানি। কিন্তু আমার আশঙ্কা ঐ অপশক্তির দল টিকতে দেবে কি রবি শঙ্কর মৈত্রীকে; বাঁচতে দেবে কি দেশের মাটিতে?

(eibela.com থেকে নেয়া)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.