বিয়েটা ভেঙ্গে দিল তিতলি

তামান্না ইসলাম: “অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমান ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছে। যাত্রী মহোদয় আপনারা দয়া  করে নিজ নিজ আসনে ফেরত যান এবং সিট বেল্ট বেঁধে নিন।”

ঘোষণাটি কানে যেতেই তাড়াহুড়া করে সিট বেল্ট বেঁধে নেয় সানি। ওর  নিঃশ্বাস একটু একটু করে ঘন হতে থাকে। প্রতিবার প্লেন ল্যান্ডিঙের সময় এরকম শ্বাসকষ্ট হয়। এক অজানা আশঙ্কায় বুকের খাঁচায় চাপ ধরে। এই লক্ষণগুলো সবই ওর খুব  চেনা, কোনদিন  লজ্জায় মুখ ফুটে এই কথা কাউকে বলতেও পারেনি।

Free 1মিনিট দশেক পরে প্লেনটা যখন সত্যি নিচে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই একটা প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। বুকটা ধক করে উঠে। টার্বুলেন্স শব্দটা কানে যেতেই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায়। পর পর অনেকগুলো ঝাঁকুনি। পাশে দাঁড়ানো বিমানবালা ঝাঁকুনি খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে প্রায় হুমড়ি খেয়ে এসে পড়েছে সানির  গায়ে। “ভেরি  সরি” বলতে বলতে যাত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে যায় তিতলি ।

তিতলি দেখে ভদ্রলোকের মুখটা লাল হয়ে গনগন  করছে। ওর অভিজ্ঞতা থেকে জানে, সম্ভবত প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে। ছেলেটার মুখের খুব কাছে গিয়ে গভীর মমতায় জানতে চায়  “আপনার কি কোন শারীরিক সমস্যা হচ্ছে?”

কোনমতে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে সানি।

“একটু পানি খাবো।”

এই সময় বিমানবালাদের জন্যও হাঁটাহাঁটি  করা নিরাপদ না। তবুও ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারে না তিতলি। দৌড়ে এক গ্লাস বরফ শীতল জল নিয়ে আসে, একটা উষ্ণ তোয়ালে। কাছে এসে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ওর  টাই খুলে দেয়, গলার কাছে বোতাম খুলে দেয়। মাথার কাছে ফ্যানটা বাড়িয়ে ওর দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ভেজা তোয়ালে  দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে দিতে হাসি মুখে সান্ত্বনা দিতে থাকে। “এই রুটে প্রায়ই এমন একটু আধটু টার্বুলেন্স হয় বছরের এই সময়। এক্ষণই দেখবেন ঠিক হয়ে গেছে।”

women hood 2মেয়েটার মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে নাকি পানি খাওয়ার জন্য কে জানে সানি কিছুটা সুস্থ বোধ করে। ঢাকায় কোথায় থাকে, কোথা  থেকে আসলো এসব নানা কথায় ওর  মনোযোগ ঘুরিয়ে রাখে তিতলি। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে একটা কিছু বলা দরকার ভেবে সানি আস্তে করে বলে “আপনার নামটা খুব সুন্দর।”

সানির দৃষ্টি অনুসরণ করে তিতলির চোখ চলে যায় ওর ব্যাজের  দিকে। একটু লাল হয়ে যায়। স্মার্ট মেয়ে, সামলে নিয়ে বলতে থাকে “ধন্যবাদ, আমার বাবা নাম রেখেছে তিতলি, তিতলি  মানে প্রজাপতি জানেন। তো? ”

“সে জন্যই বুঝি উড়ে বেড়ানোর পেশা বেছে নিয়েছেন? “

একটু একটু করে আলাপ জমে উঠে। সেই আলাপের মাঝ পথেই তিতলিকে যেয়ে ওর নির্ধারিত সিটে বসতে হয়।  সেদিকে খানিকটা তৃষ্ণার্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে সানি। বিমানবালারা সাধারণত চটপটে হয়, তার সাথে যোগ হয়েছে মেয়েটির আলগা লাবণ্য, দেহেরে বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা অজানা আকর্ষণ। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে ওর মায়াবী কণ্ঠস্বরটাই যেন বেশী আকর্ষণ করছে সানিকে, আর মায়া মায়া চোখ, স্নিগ্ধ হাসি। শান্ত দীঘির গভীর জলের মতো, যেখানে ডুব দিতে ইচ্ছা করে তপ্ত দুপুরে।  মেয়েটা ওর জায়গা থেকেই মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে, চোখ দুটো হাসছে।

সানি মনে মনে ভাবে “তবে কি…? ”  ভাবতেই ভাল লাগে ওর।  নামার সময় সেই চোখে চোখে হাসির উপর ভরসা করে তিতলির দিকে এগিয়ে যায় সানি। মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করবে সে “আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দেবো জানি না। আজকে আপনি না থাকলে যে কী হতো! যদি কিছু মনে না করেন ভবিষ্যতে আপনার সাথে কি যোগাযোগ করতে পারি?”

Meye 2তিতলির এই পেশায় বছর তিনেক হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়। মানুষ চিনতে এখন  খুব একটা সমস্যা হয় না। এই ভদ্রলোককে ভালই মনে হচ্ছে। তাছাড়া  সানিকেও ওর নিজেরই কেন যেন ভাল লেগেছে এই অল্পক্ষণের পরিচয়েই। এক মিনিট চিন্তা করে শান্ত মুখেই বলে ফেলে “অবশ্যই।”

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সম্পর্কটা অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে। ওরা দুজনেই বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। কিন্তু দুজন সম্পূর্ণ দুই  ধরনের মানুষ। পর পর তিনটি সন্তানের মৃত্যুর পর সানির জন্ম। সানি তাই অনেক আদরে মানুষ। এক গ্লাস জল ঢেলেও খায়নি সে কোন দিন। অতিরিক্ত আদরের কারণেই বোধহয় সে অনেক বেশী নরম।

এখনো যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে তার মা বাবার সাথে আলোচনা করতে হয়। “মা বন্ধুরা সবাই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, চেষ্টা করবো নাকি?’ মা আঁতকে উঠে “বিদেশে অনেক কষ্ট, তোর  সইবে না বাবা, তাছাড়া এখানে তোর কিসের অভাব?”

তিতলির সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে সে একটু একটু করে তিতলির উপরে নির্ভর করা শুরু করেছে। সামান্য অসুখেই সে কাতর হয়ে যায়। জ্বর বা মাথা ব্যাথা হলেও উতলা হয়ে উঠে। সাত সকালে হটাৎ করে ফোন দেয়  “তিতলি তুমি এখনই চলে আসো, আমার কাল রাত থেকে ১০১ ডিগ্রি জ্বর।” তিতলি  হয়তো তখন ফ্লাইটের জন্য রেডি হচ্ছে। এই শিশুটিকে তার সারা জীবন আগলে রাখতে হবে।

তিতলি খুব স্বাধীনচেতা। নামের সাথে মিল রেখে তার পিঠে যেন বিধাতা দুটো ডানা দিয়ে দিয়েছে। জেদি মেয়েকে বাবা মাও খুব একটা ঘাটাতে যায় না। তাছাড়া শাসন করবে যে সেই জোরটুকুই যে তাদের নেই। ওর পাঁচ  বছর বয়স থেকেই মা-বাবা আলাদা। ও দুজনের কাছেই মানুষ, কাউকেই কম ভালবাসে না।

ছোটবেলা বুঝতে পারতো না এতো ভাল দুটো মানুষ কেন একসঙ্গে থাকতে পারে না। যতো দিন যাচ্ছে ততই বুঝতে পারছে ওর জেদটা ও আসলে এদের দুজনের কাছ থেকেই পেয়েছে। শুধু একটা জায়গায় সে জেদ  করতে পারে না,  সেটা হলো সানি, শিশুর মতো সরলতার কাছে বার বার হেরে যায় ও।

বছর দু’একের মাথায় সানি যখন বায়না শুরু করলো বিয়ে করার, তিতলি খুব একটা অমত করেনি। সানিদের পরিবারের সাথেও তার মোটামুটি চেনাজানা হয়ে গেছে। ওর মা  কিছুটা ভিন্ন  ধরনের ব্যক্তিত্বের মানুষ, কিন্তু তিতলি সেটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত না।

তিতলির বাবা সেই দিকটা ইঙ্গিত করতেই ও সোজা সাপটা উত্তর দিয়েছিল  “আমি তো বিয়ে করছি সানিকে, সংসার করবো ওর সাথে, ওর বাবা- মায়ের সঙ্গে তো আর না।” বাবা বুঝে নিয়েছিলেন, মেয়ে তার মন স্থির করে ফেলেছে।

অনামিকায় ডায়মন্ডটা যখন সাতরঙা দ্যুতি ছড়ায়, সেই আলোতে নানা রঙের স্বপ্ন দেখে তিতলি। তার বাবা-মায়ের ভালবাসবাসির কোন স্মৃতি তার মনে নেই, বুকের মাঝে একটা বিরাট শূন্যতা নিয়ে বসবাস করেছে সে সারাটা  জীবন। এই শূন্যতা আর তাকে তাড়া করবে না। ছোটবেলায় ঘুম ভেঙ্গে ভয় পেলে বাবা বা মায়ের ঘরে যেয়ে দেখতো ডাবল বেডের অর্ধেকটা খালি, তখন ভাবতো সেটা তার জন্য বরাদ্দ। যতো দিন গেছে, আস্তে আস্তে সেই বিছানার খালি অংশটা দেখে তার বুকের ভিতরে মুচড়ে উঠতো।

সে তার সারা জীবনে কখনোই সানিকে ছাড়া ঘুমাবে না। যতো ঝগড়াই হোক, তিতলি ঠিকই সানির বুকের মাঝে কুণ্ডুলি পাকিয়ে ঘুমাবে। “ভাগ্যিস তার রাতের ফ্লাইট থাকে না, না হলে কি হতো? চাকরি তো আর বদলানো যাবে না, সে যে তার চাকরিটা খুব উপভোগ করে।” “কেমন পাখির মতো ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ানো যায়। নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়, কত মানুষের সেবা যত্ন করা যায়।” ভাবতে ভাবতে একটা তৃপ্তির চিনহ  ফুটে উঠে তিতলির মুখে।

কাল সকালে সানির মা ডেকেছে ওকে, বিয়ের শাড়ি পছন্দ করতে যাবে। গয়না আগেই তৈরি হয়েছে, শাড়িটাই বাদ আছে। বিয়ের কার্ডগুলো যা সুন্দর হয়েছে। সবাই খুব প্রশংসা করছে। সানি ইদানীং খুব বেশী দুষ্টামি শুরু করেছে। ওর যেন আর তর  সইছে না। ভাবতে ভাবতে লজ্জায় লাল হয়ে যায় তিতলি, কাল ওকে লুকিয়ে ওর মায়ের সাথে দেখা করতে হবে।

তিতলি বসে আছে সানিদের ড্রয়িং রুমে। ও ভাবেনি যে শাড়ি কিনতে সানিকেও সঙ্গে নেবে ওর মা। উনি সবসময় বলতেন “সানি শপিঙের কিছু বোঝে নাকি?” ওকে দেখে সানির চোখে দুষ্টামির হাসি খেলে যায়, ফোনে টেক্সট আসে “শপিং শেষে পালিয়ে যেও না কিন্তু।”

সেটা না দেখার ভান করে তিতলি বলে, “আনটি আমার তো চারটায় ফ্লাইট আছে, তার আগেই তো শেষ করতে পারবো মনে হয়, তাই না?”

তিতলির কথায় খুব বিরক্ত হয় সানির মা, সেটা লুকানোরও কোন চেষ্টা করেন না তিনি। “তুমি এখনো ফ্লাইট করে যাচ্ছো? চাকরিটা ছাড়ছ কবে? বিয়ের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি।”

তিতলি ঊনার কথা বুঝতে পারে না। “সামনের সপ্তাহ থেকে এক মাসের ছুটি নেব। চাকরি ছাড়ব কেন?”

“বাড়ির বউ এসব চাকরি করে নাকি? লোকে নানা কথা বলবে। আমাদের একটা স্ট্যাটাস আছে না সমাজে। তোমার তো আর টাকার জন্য চাকরি করতে হবে না, কটা টাকাই বা পাও এই চাকরি করে?”

তিতলির পায়ের নিচ থেকে মাটি সরতে থাকে। সে কেমন অসহায় হয়ে সানির দিকে তাকায়, হয়তো আশা করে সে কিছু বলবে। “নাহ ভুল আশা।” সে উল্টা বলতে থাকে “মা তুমি পাগল? ও কেন খামাখা এতো কষ্ট করবে?” তিতলির দিকে তাকিয়ে অস্থিরভাবে বলে “চলতো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

“না, আমি কোথাও যাবো না।”  তিতলির  কণ্ঠস্বর অসম্ভব শান্ত।  কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জীবনের সবচেয়ে কঠিন  সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে সে । অনামিকার আংটিটা খুলে সানির হাতে তুলে দেয়, “বিয়েটা আমি ভেঙ্গে দিলাম সানি, তোমাকে আমি চিনতে পারিনি বলে দুঃখিত।”

তিতলির যাওয়ার পথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সানি, “সেও কি চিনতে পেরেছিল তিতলিকে?”

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.