নারীর একার অভিবাসন, যেন সুতো কাটা ঘুড়ি

শাশ্বতী বিপ্লব: “কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া, আমার ভাইধন রে কইয়ো, নাইওর নিতো বইলা, তোরা কে যাস কে যাস।”

উজানের মেয়ে পাড়ি জমায় ভাটিতে, ভাটির মেয়ে উজানে। রংপুরের মেয়ে যশোরে, যশোরের মেয়ে নেত্রকোনায়, নেত্রকোনার মেয়ে ফরিদপুরে, ফরিদপুরের মেয়ে কুমিল্লায় বা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আরো আরো দূরের কোনো দেশে।

বাপের বাড়ির খবরের জন্য মন আনচান করে প্রতিটি মেয়ের। পথ চেয়ে থাকে ভাইয়ের, আপনজনের। চোখ জ্বলে, প্রাণ কান্দে – মন ছুটে যায় যখন-তখন ভাইয়ের কাছে, মায়ের কাছে, খেলার সাথীদের কাছে।

Shaswati 5বাবা-মায়ের আহ্লাদী মেয়ে রাতারাতি বনে যায় আরেক বাড়ির বউ। কত দায়িত্ব তার কাঁধে, সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব নিজেকে প্রমাণ করার। বাবা-মার পরিবারে সে সঠিক আদব লেহাজের সাথে বড় হয়েছে কীনা, সংসার ধর্মে পারদর্শি কীনা, ধর্ম-কর্ম ঠিকমতো জানে কীনা, আরো কত কী! রথের মেলা শেষ হয়ে যায়, তবু সংসার থেকে ছুটি মেলে না মেয়ের।

“বিয়ে” মেয়ের জীবনের যেন এক অমোঘ সত্য, অবধারিত পরিণতি। মেয়ে হয়ে জন্মানোর পর থেকেই মনের গভীরে সযতনে বুনে দেয়া হয় যে স্বপ্নটি, সেটা “বিয়ে”।

“বিয়ে” এমনই একটি সামাজিক প্রপঞ্চ যার সাথে জড়াজড়ি করে থাকে অর্থনীতি। বিয়ের বাজারে তাই বরের যোগ্যতার মাপকাঠি আর্থিক স্বচ্ছলতা, আর কনের সৌন্দর্য্য (এবং বাবার সামর্থ্য)। নারী-পুরুষের মাঝে এই অর্থনৈতিক সম্পর্কই ঠিক করে দেয় কে, কখন, কোথায় অভিবাসিত হবে।

যেহেতু সম্পদের প্রধান মালিকানা পুরুষের এবং উত্তরাধিকার ব্যবস্থাও পুরুষতান্ত্রিক। তাই “বিয়ে” নামক সামাজিক অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নারী একা ছেড়ে যায় তার চিরচেনা ঘর, পরিবার-পরিজন।
সে ছেড়ে যায় তার আজন্ম গড়ে  ওঠা অভ্যাস, জীবনযাপন প্রণালী।

নতুন করে তৈরি করে নেয় ভালো লাগা-মন্দ লাগা। কখনো কখনো ছেড়ে যায় তার বহু পরিচিত নামটিও। বিয়ে এমনই এক সামাজিক রীতি যার কারণে নারী সর্ব অর্থে অভিবাসিত হয় তার মূল থেকে। বদলে যায় তার আপনজনের সংজ্ঞাও। স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির মানুষ প্রধান হয়ে উঠে জীবনে।

মেয়েদের জন্য বিয়ে অনেকটা কর্মসংস্থানের বিকল্প যেন। বিয়ের বাজারে মেয়ের অর্থ উপার্জনের যোগ্যতাকে গুনে না কেউ, ছেলের জন্য যা পূূর্বশর্ত। আর্থিক সঙ্গতি থাকলে একজন পুরুষ যেকোনো বয়সেই বিয়ের যোগ্য, নারী নয়। তাই কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে চাইলেই বন্ধ করা যায় না আমাদের সমাজে।

ছেলের একটি ভালো চাকরি বা ব্যবসা যেমন বাবা-মাকে নিশ্চিন্ত করে, মেয়ের একটি ভালো বিয়েও তেমনি। উদ্দেশ্য যদিও একই – ভালো একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই, ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা। তাই স্বচ্ছল পরিবারের বউ উপার্জন করতে চাইলে সেটা অনেক ক্ষেত্রেই মানানসই হয় না।

আমাদের দেশে যতো না সংখ্যক নারী অভিবাসিত হয় নিজ যোগ্যতায় উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণেরর জন্য বা পেশাগত কারণে, তার চেয়ে অনেক বেশি বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে। পরিবার, সমাজ সকলে মিলে একজন সফল স্বামী (যার অর্থনৈতিক ভীত শক্ত) পাওয়াকেই নারী জীবনের অন্যতম সফলতা ভাবতে শেখায় এবং মেনে নিতে বাধ্য করে।

“বিয়ে” শুধুই ভাব-ভালোবাসার বিষয় নয়। “বিয়ের” মাধ্যমে নারী এক বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রবেশ করে, প্রবেশ করে এক পরীক্ষা ক্ষেত্রে। কেউ কেউ সেই পরীক্ষায় উতরে যায়। যারা পারে না, তারা সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয় মুখ বুজে, পাশ করার প্রাণান্তকর চেষ্টায়। হোক সে ধনী বা গরীব, শিক্ষিত বা অশিক্ষিত।

পরম আদরের যে মেয়েটিকে সবাই মিলে পাঠালাম এই বিশাল কর্মযজ্ঞে, তার প্রস্তুতির কথা কতটুকু ভাবলাম আমরা? ধুমধাম করে, সামর্থ্য মত অলঙ্কারে মুড়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠালাম, তারপর নেমতন্ন আর আত্মীয়তা রক্ষার সামাজিকতা – এইতো আমাদের প্রস্তুতি।

অথচ তাকে তৈরি করা প্রয়োজন, প্রয়োজন অপরপক্ষেরও তৈরি হওয়ার। আপনজনদের ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে গিয়ে একটি মানুষ কিভাবে মানিয়ে নেবে সেই প্রস্তুতির কথা আমরা ভাবি না খুব একটা। ভাবি না যারা গ্রহণ করলো তাদেরই বা কি করণীয়। অথচ প্রস্তুতি দরকার দু’দিক থেকেই। বাইরের চাকচিক্যে সাজাতে চাই তার নতুন জীবন, মনের খবর রাখি না। আর দুজনের বিবাহিত জীবন বা শারীরিক সক্ষমতার কথাও আমরা ভাবি না। দুয়ে দুয়ে মিলে গেলে জীবন সুন্দর, নয়তো সারা জীবন বয়ে বেড়ানো এক বিশাল বোঝার দায়।

এসব আমরা ভাবি না, ভাবার দরকার বোধ করি না। আর ভাবি না বলেই বিয়ের আগে কনেকে দেই স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির মন জুগিয়ে চলার পরামর্শ আর বরকে বিয়ের রাতে বিড়াল মারার। মাঝখান থেকে উপেক্ষিত থেকে যায় মেয়ের স্বজন ছেড়ে আসার হাহাকার, চির ভাসমান এক অনুভূতি।

ভাটির চরে নৌকা ফিরে ফিরে আসে, আসে না কেবল আপনজন সেই আগের মতো করে। নাটাই থেকে সুতো ছিঁড়ে গেছে মেয়ের, আগের মতো আর বাঁধা পড়ে না কোথাও। শুধু স্বপনে দেখা হয় সেই অনুভুতির সাথে।

“প্রাণ কান্দে, কান্দে
প্রাণ কান্দে কান্দে প্রাণ কান্দে রে, প্রাণ কান্দে
নয়ন ঝরে ঝরে নয়ন ঝরে রে, নয়ন ঝরে।

সুজন মাঝিরে, ভাইরে কইয়ো গিয়া
না আসিলে স্বপনেতে দেখা দিত বইলা
তোরা কে যাস, কে যাস।”

শেয়ার করুন:
  • 423
  •  
  •  
  •  
  •  
    423
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.