পাঁচালির প্যাঁচাল -৭

অনুপা দেওয়ানজী: এ নিয়ে তাকে মন খারাপ করতে দেখে তার মেজো জা তাকে বললেন, মন খারাপ করিস না। তাও তো তোকে শ্বশুর বাড়িতে প্রথম ঋতুমতী হলে আগের দিনে যেমন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তা জানানো হতো, আমাকে আর বড়দিকে তো তাও করতে হয়েছে। ভাবতে পারিস পুরো এক সপ্তাহ অসূর্য্যম্পশ্যা করে রাখা হয়েছে!  সারাদিন পর এক বেলা শুধু দুধ ভাত দেয়া হয়েছে , তাও রাতের আঁধারে। এরপরে আবার আমাদের দ্বিতীয় বিয়ের নাম দিয়ে প্রথম বিয়ের মতোই আরেক দফা খরচ নেয়া হয়েছে বাপের বাড়ি থেকে! এসব তো গৌরী দান যখন হতো সেই সব মেয়েদের নিয়ে করা হতো এসব কি আর কেউ মানে? কিন্তু তাও আমাদের দিয়ে তাও করানো হয়েছে।

Anupa Dewanjiমেয়েটি ভাবে সে ব্যবস্থা হয়তো এখন নেই, কিন্তু একটি মেয়ের মা হবার জন্যে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই যদি মেয়েদের শরীরে এই প্রক্রিয়া দিয়ে থাকেন তাহলে কেন মেয়েদের আজও অপবিত্র ধরা হয় এই বিশেষ সময়টাতে? এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে না গেলে কোন মেয়ের কি মা হওয়া সম্ভব! অথচ আমরা কিনা আবার মায়েরই পুজো করি। মাকে সম্মান করি। দেবী জ্ঞানে পূজো করি। এই প্রক্রিয়া আছে বলেই না একজন মেয়ে মা হতে পারে। এটা কি অপবিত্র কোন ব্যাপার হতে পারে? অথচ পুরো প্রক্রিয়াটি নাকি মেয়েদের জন্যে লজ্জা আর অপবিত্রের!

আচ্ছা! দেবতা আর মানুষের মধ্যে কি সেই আড়াল, যা দেবতাকে পরম দেবতা আর মানুষকে শুধুমাত্র মানুষ করেছে! ভালো করে দেখলে তো দেখা যায় উভয়েরই খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রেম-বিরহ, পরকীয়া যা তাদের বেলায় লীলাখেলা, সবই এক। তফাত তাঁরা অমর আর মানুষ মরণশীল। তাঁরা স্বর্গে থাকেন, মানুষ থাকে মর্ত্যে। অনেকটা এ বাড়ি, আর ও বাড়ির মতোই।

প্রতিদিন তাঁরা মর্ত্যে এসে ভক্তের পুজো গ্রহণ করেন, আবার মহাসমারোহে প্রতি বছরেও আসেন। কিন্তু দৈনন্দিন ও প্রতি বৎসর দেব-দেবীরা যত খাবার খেয়ে থাকেন তা হজমের পরে বর্জ্য ব্যবস্থার যে শারিরিক প্রক্রিয়া তা কি তাঁদের নেই?

কী জানি! যদি তাঁরা মানুষের চেয়ে আলাদা আর উন্নত হয়ে থাকেন তাহলে তাঁদের সব কিছুই মানুষের মত কেন?

মেয়েটি পাঁচালিতেই আবার ফিরে গেল। সেখানে দেবর্ষি নারদ অত্যন্ত ক্ষুন্নমনে জানতে চাইছেন মর্ত্যের মানুষ কী করলে তিনি প্রসন্ন হবেন? তিনি যদি তাদের দয়া না করেন তাহলে তারা কীভাবে মা লক্ষীর পদছায়া পাবে?

Hindu 1নারদ করুণ কন্ঠে আরও বললেন, মা তুমি সৃষ্টি, স্থিতি আর প্রলয়ের দেবী। এই জগতের মাতা। মর্ত্যবাসীদের দুঃখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, তুমি এর একটা বিধান দাও যাতে তারা এ থেকে পরিত্রাণ পায়। দেবর্ষির আকুতি শুনে লক্ষ্মীর মন নরম হলো। তিনি তাকে মধুর স্বরে বললেন, আচ্ছা মর্ত্যবাসীদের দুঃখে তোমার অন্তর যখন এমন কাঁদছে, তখন আমি তা প্রতিকারের চেষ্টা অবশ্যই করবো, এই বলে নারদকে বিদায় করলেন।

মেয়েটি ভাবতে থাকে দেবর্ষি নারদ যেখানে মর্ত্যবাসীদের দুঃখে কষ্ট পাচ্ছেন সেখানে মা হয়ে কীনা শুধুমাত্র মেয়েদের কারণে সেখানকার গৃহগুলি লক্ষ্মীর কাছে পাপের আগার মনে হয়েছে এবং তাই তিনি চঞ্চলা হয়েছেন। এটা কি কোন দেবীর পক্ষে সম্ভব!

যাই হোক নারদ চলে যাওয়ার পরে লক্ষ্মীর অনেক ভেবে-চিন্তে স্বামী নারায়ণকে বললেন, ‘হে হৃদয়রঞ্জন, মর্ত্যবাসীদের দুঃখ আমি কীভাবে দূর করবো, সে ব্যাপারে তুমি আমাকে উপদেশ দাও। কীভাবেই বা তাদের দুষ্কৃতি মোচন করবো বলো।

মেয়েটির দুই চোখ এই জায়গাতে এসে আটকে গেল। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় যার হাতে, তিনি কীনা নিজে এই সমস্যার সমাধান করতে অপারগ। তাঁকেও কীনা ছোট্ট এই সমস্যা সমাধানের জন্যে স্বামীর কাছেই ছুটতে হয় উপদেশের জন্যে! হা! হা! হা! তাহলে আর মর্ত্যের মেয়েদের স্বাধীনতা কোথায়? স্বর্গ, মর্ত্য উভয় জায়গাতেই সে দেবী বা মানবী যেই হোক না কেন, দুজনেরই দেখছি একই সূত্রে গাঁথা জীবন।

তাহলে এ কোন শক্তির পুজো করছি আমরা? স্বামীর উপদেশ ছাড়া যার কিনা কোন কিছু করার ক্ষমতাই নেই!

লক্ষ্মীর কথা শুনে স্বামী নারায়ণ তাঁকে বললেন, তুমি এতো চঞ্চল হইও না। আগে মনটাকে স্থির কর।

তারপরে বললেন,

‘শুন সতী মন দিয়া বচন আমার

লক্ষীব্রত নরলোকে করহ প্রচার।।

গুরুবারে সন্ধ্যাকালে মিলি নারীগণে

পূজিয়া শুনিবে কথা আনন্দিত মনে।।

বাড়িবে ঐশ্বর্য তাহে তোমার কৃপায়

দারিদ্রতা দূরে যাবে জানিবা নিশ্চয়।

 

বাড়িবে ঐশ্বর্য তাহে তোমার কৃপায়!

কিন্তু কৃপা! সেতো একটা অনুভূতির ব্যাপার! লক্ষ্মীর কৃপা হবে কী হবে না তাও কি নারায়ণ বলে দেবেন? আচ্ছা লক্ষ্মীপুজো কি তবে এর আগে নরলোকে ছিল না? তাহলে লক্ষ্মী কী দেখতে নরলোকে এসেছিলেন? কেন তিনি তবে নারদকে বলেছিলেন, ”অচলা হইয়া সেথা থাকি কী প্রকারে?’

Hindu 2যদি আগে লক্ষ্মীপুজোর চল না থাকে তাহলে তো লক্ষীর বলার কিছুই নেই। আর যদি থাকে তাহলে প্রচারের কথা আসছে কেন? বরং বলা যায় পুনরায় প্রচার।

মেয়েটি জানে চতুর্বেদ আর বারোটি উপনিষদই একমাত্র স্বীকৃত ধর্মগ্রন্থ। এ ছাড়া বাদবাকি সব ধর্মগ্রন্থই ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা। তাহলে স্বয়ং মা লক্ষ্মীর চোখে এটা পড়লো না যে মর্ত্যে নারী আর শুদ্রদের জন্যে ধর্মগ্রন্থ পাঠনিষিদ্ধ করা হয়েছে!!

যেখানে ধর্ম গ্রন্থ পাঠ তাদের জন্যে নিষিদ্ধ সেখানে লক্ষ্মীর চোখে সেটা না পড়ে পড়লো মেয়েদের যত দোষ! স্বামীর প্রতি যতো অবহেলা, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ ধর্মগ্রন্থ তাদের জন্যে কেন নিষিদ্ধ করা হলো, কারাই বা এসব করলো তার ব্যবস্থা না করে তিনি কী করতে মর্ত্যে এলেন দেখা যাক!

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.