ঝাপসা হয়ে আসে বন্ধুর মুখ

শামীম রুনা: গতকাল যা ঘটে গেছে তার জন্য আমরা সবাই কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। সামনে আরো অনেকে খুন হবেন, গৃহহারা হবেন, দেশত্যাগী হবেন-আমরা তার জন্যও প্রস্তুত আছি। শুধু আমরা ক্রমানুসারটা জানিনা-কার পরে কার পালা আসবে। এরপর কে খুন হবেন? এরপর কে গৃহহারা হবেন অথবা ধর্ষিতা হবেন নয়তো বাঁচার জন্য দেশত্যাগী হবেন। এই দেশ এখন আর আমাদের দেশ নয়, এই দেশ যেন ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলের গণিমতের মাল, সবাই লুটে নিচ্ছে যে যেভাবে পারে।

যদি একটি খুনের বিচার হতো, কোনো ব্লগার না, কোনো নাস্তিকের না- শুধু সেসব মানুষের হত্যার বিচার হতো যারা কোপ খেয়ে টিএসসির চত্বরে, রাস্তায়, ঘরে বা অফিসে খুন হয়ে পড়ে থাকেন, তবে হয়তো এই নির্বিচারে মানুষ কোপানোর কালচার আমাদের দেশে প্রচলিত হতো না। এই মানুষ হত্যার যজ্ঞে সরকারের নীরবতা বা প্রধানমন্ত্রীর আশকারার আঁচ এখন কিন্তু সরকারি দলের মানুষদের গায়েও লাগতে আরম্ভ করলো।

যদিও কলাবাগানের এই যুগল খুনকে জায়েজ করার জন্য সরকার অস্ত্র হাতে পেয়ে গেছে, এরা দু’জন ‘রূপবান’ নামক সমকামিদের পত্রিকার সম্পাদক জুলহাস মান্নান ও তাঁর বন্ধু তনয়। মানুষ পরিচয় ছাপিয়ে ওরা সমকামি যুগল এই পরিচয় এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে। এরা মানুষের সুক্ষ্ম অনুভূতিতে আঘাত করার মতো কাজ করে সমাজে বাস করবে আর আমাদের ধার্মিক জেহাদিরা চুপচাপ তা বরদাস্ত করবে, এ হতে পারে না।

Runa collageসমকামিতা বা সমকামিতাকে সমর্থন কোনো অপরাধ হলে এই জেহাদিরা সেইসব মাদ্রাসা শিক্ষক বা মোল্লাদের কেনো হত্যা করছে না, যারা মাদ্রাসার অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রদের ওপর যৌন নির্যাতন করছে? মাদ্রাসাগুলো তো সমকামিতার মূল সূতিকাগার। আর এটাও তো সত্যি, এই ধর্মান্ধ জেহাদিরা পরকালে বেহেস্তে অসংখ্য হুরীদের সঙ্গে গেলমানদের স্বপ্নেও বিভোর হয়ে এইসব হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে।

জেহাদিদের অনুভূতি আছে, ধর্মান্ধ সরকারের অনুভূতি আছে, শুধু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কোনো অনুভূতি নাই। আমাদের ‘মাইরা-কাইটা’ রাস্তায় ফেলে রাখলেও আমাদের কোথাও কোনো আঘাত লাগে না। আমাদের নারীদের জনারণ্যে হিংস্র জন্তু এসে ধর্ষণ আর খুন করে যায়-আমাদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে না।

দেশের মুক্তিযোদ্ধা স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে চাপাতির নিচে জীবন দেয়-আমাদের অনুভূতি কই? আমাদের শিক্ষকরা মরে পড়ে থাকে রাস্তায়, মৃত্যুর আগে জানতেও পারেন না কী অপরাধে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে-আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হতে থাকে। যুদ্ধাপরাধীও জানে, তার শাস্তির কারণ, কিন্তু স্বাধীন দেশের পরাধীন নাগরিক কিছুই জানে না।

দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, কখনো বলছেন সব চাপাতিওয়ালাদের ধরা হয়েছে! ধরা যদি হলো,ওরা কোথায়? তিনি নিজেই কি ওদের লুকিয়ে রেখেছেন, সময় হলে বদলি খেলোয়াড়ের মতো মাঠে নামাচ্ছেন কাজ শেষে আবার উঠিয়ে নিচ্ছেন!

আবার কখনো বলেন, উন্নত দেশের তুলনায় এসব হত্যা-গুম-ধর্ষণ কিছুই না তাহলে তার কাছে সবিনয়ে জানতে চাই, ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের একটি রাষ্ট্রের জন্য হত্যা-গুম-ধর্ষণের পরিসংখ্যানের হিসাব কতটা হওয়া উচিত?

মন্ত্রীর কাছে সবিনয়ে আরো বলতে চাই, আমাদের আর উন্নত রাষ্ট্রের প্রয়োজন নাই, তার চেয়ে আমাদের একটি অনুন্নত রাষ্ট্রই থাকুক, আর সে রাষ্ট্রের মানুষগুলো স্বাধীনতা নিয়ে, জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে, স্বাভাবিক মৃত্যূর গ্যারান্টি নিয়ে বেঁচে থাকুক। মানুষ তার বাঁচার অধিকারে বেঁচে থাকুক। নিজের জীবন নিজের মতো করে উপভোগ করুক। নারী তার অধিকারে বাঁচুক, অধিকারে হাঁটুক; ইচ্ছা নিয়ে বেঁচে থাকুক।

এবার আমি আমার একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতি শেয়ার করি। ২০১৫তে ‘শুদ্ধস্বর’ থেকে ‘রূপবান’ গ্রুপের একটি কবিতা সংকলন বের হয়। বইটি বের করার ব্যাপারে শুদ্ধস্বরের অফিসে তখন নিয়মিত তনয়কে আসতে দেখতাম। অত্যন্ত ভদ্র, অসম্ভব অমায়িক, মৃদুভাষী আর সুদর্শন প্রানবন্ত এক তরুণ। দু’একবার এসেছিলো জুলহাস এবং আরো কেউ কেউ। এখনো আমার চোখের সামনে ওদের চেহারা ভাসছে। এরকম সতেজ প্রাণগুলো হুট করে খুন হয়ে গেল এই ভাবনা কিছুতেই মানতে পারছি না। স্বল্প চেনা তনয়-জুলহাসের জন্য ভেতরটা খুব হাহাকার করছে, কিন্তু কাঁদতে পারছিনা। আমি ৩১ শে অক্টোবরেও খুব কাঁদিনি.

এত নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে ভেতরটা ক্রমশ আবেগ শূণ্য হয়ে যাচ্ছে হয়তো, তাই আর কাঁদতে পারি না।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.