পাঁচালির প্যাচাল-৬

অনুপা দেওয়ানজী: সে তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে ভাবতে লাগলো মেয়েদের হাতিয়ার করে পুরুষদের এই স্বার্থ উদ্ধার বা লাভবান হওয়া, মেয়েদের শোষণ, নিপীড়ন, এতে নারী শক্তি বা দেবী শক্তিগুলির কোনো ভূমিকা নেই কেন? আমরা তো কম দেবী শক্তির পূজো করি না! দুর্গতির জন্যে দুর্গা, শক্তির জন্যে মা কালী, বিদ্যার জন্যে সরস্বতী, ধনের জন্যে মা লক্ষ্মী, চামুন্ডা, বিপদনাশিনী, জগদ্ধাত্রী আরও কত শত নাম!

Anupa Dewanji
অনুপা দেওয়ানজী

তাঁরা প্রতি বছর বর্ষ পরিক্রমায় পৃথিবীতে আবির্ভূত হন ভক্তের পূজো গ্রহণের জন্যে। কিন্তু কই শোষিত, বঞ্চিত নারীদের উদ্ধারের জন্যে কোনো দেবী কেন নারী নারায়ণী রুপে জন্ম নেন না? নর নারায়ণের রুপ ধরে জন্ম নিতে হয় কেন রাজা রামমোহন, পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরদের মত পুরুষদের! কেন ? কেন?

আচ্ছা মর্ত্যের নারীদের এত অনাচার দেখে মা লক্ষ্মী ক্ষুব্ধ ও চঞ্চল। তিনি তাতে কষ্ট পাচ্ছেন তা সত্বেও তিনি দিব্যি নারায়ণের সঙ্গে প্রেমালাপ করছেন কী করে?

লক্ষ্মীর অনুযোগগুলির সঙ্গে সে কিছুতেই একমত হতে পারছে না। দিবানিদ্রা, অনাচার, ক্রোধ, অহংকার, আলসেমি, কলহ, মিথ্যা, এসব স্বর্গ ও মর্ত্য উভয় জায়গাতেই বিদ্যমান। বরং স্বর্গেই কথায় কথায় অভিশাপ বেশি দিতে দেখা যায়।

দয়া-মায়া ,লজ্জা কি শুধুই মেয়েদের জন্যে? ছেলেদের তার দরকার নেই? মেয়েদের গালে রঙ মাখা এটা আবার কী ধরনের অপরাধ? জোরে হাসতে পারবে না, জোরে কথা বলতে পারবে না, অথচ আজকাল মুখে রঙ মাখার জন্যে যে বিউটি পার্লার খোলা হয়েছে তাতে মেয়েদের আয় সংস্থানের ব্যবস্থা হওয়াতে তারা সংসারে দু পয়সা আনতে পারছে।

হাসলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে এ জন্যে ‘লাফিং ক্লাব’ খোলা হয়েছে। মেয়েরা বক্তৃতা দিচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় এজন্যে জোরালো কন্ঠের দরকার আছে বৈকি। আবৃত্তি, অভিনয়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্যে কন্ঠের নানা ব্যবহার শিখছে মেয়েরা। সন্ধ্যে কেন আজকাল যে দিনের বেলাতেও ঘরে আলো জ্বলে এবং সে আলো জ্বালাবার জন্যে আগে থেকে কোন প্রস্তুতির দরকার আছে কি?

Hindu 2হা হা হা ভোরবেলায় ফ্লাট বাড়িতে গোবরের ছড়া দিয়ে পূণ্য সঞ্চয়? অবশ্য সে একবার এক বাড়িতে দেখেছিল জলের সাথে সামান্য গোবর মিশিয়ে এক গৃহিণীকে ঘরে স্প্রে করতে, কেননা এটা নাকি পাঁচালিতে আছে তাই সে এটা করছে।

সে ভেবে পাচ্ছে না লক্ষ্মীর কেন শুধু স্বামীর আত্মীয়দের অনাদরটাই চোখে পড়লো? স্ত্রীর আত্মীয়রা কি ফেলনা? তাদের তিনি নিজে নারী হয়ে হিসাবেই ধরলেন না! অদ্ভুত বিচার তো! স্বামীর আগে স্ত্রীর ক্ষিদে লাগুক আর না লাগুক, সে অসুস্থ থাকুক আর না থাকুক খাওয়া তার বারণ!

না; মাথাটা তার রীতিমতো ঘুরছে। এই পরিবারের প্রথম শিক্ষিত বউ সে। মা তাকে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চাননি, কিন্তু পরিবারটির ঐকান্তিক আগ্রহে মা এই শর্তে তাকে বিয়ে দেন যে বিয়ের পরে সে মায়ের কাছে থেকে গ্র্যাজুয়েশন করবে এবং তারপরে পাকাপাকিভাবে শ্বশুর বাড়ি যাবে।

কিন্তু সে তার বড় ভাশুর আর তার শাশুড়িকে আলাপ করতে শুনেছে বাড়ির বৌ সে। এখন আর কলেজে গিয়ে পড়ার মতো সময় নেই। প্রাইভেটে পরীক্ষা দিলেই হবে। এই বাড়িতে তার শাশুড়ি আর ভাশুরের মতামতই চূড়ান্ত। তাঁদের দুজনের মুখের ওপরে বাড়ির আর কারো কোনো কথা চলে না। ভাশুর আরও বলেছেন, বউমা কলেজ করবে আর আমার ভাই একা থাকবে তার কোয়ার্টারে? এ হতে পারে না। বিয়েতে ও রকম কথা অনেকেই দিয়ে থাকে, সব মানতে হবে বলে কথা নেই।

কী করবে সে? শেষ ভরসা স্বামী। কিন্তু সেও তো বড় ভাই এর মুখের ওপরে কথা বলে না। তাকেও কি তবে শেষ পর্যন্ত ব্রত, উপবাস, পাঁচালি পড়া এসব নিয়েই থাকতে হবে? এটা ভেবে সে নিজেই শিউরে উঠলো।

তবে মার ওপরে তার অগাধ আস্থা আছে। মা নিশ্চয় কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। মাঝে মাঝে সে ভাবে মা তাকে কী দেখে বিয়ে দিলেন, যেখানে শ্বশুর, ভাশুরের নাম নেয়া যাবে না, তাঁদের ছোঁয়া যাবে না ! ঠাকুর দেবতার মতো দূর থেকে তাঁদের সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে হয়। কথাও বলা যাবে না! মামা শ্বশুরকে দেখলে আড়ালে থাকতে হয়!

একদিন তো এই নিয়ে সে মহা বিপদেই পড়ে গিয়েছিল। একটিই মাত্র দেবর তার। বাড়ির ছোট ছেলে।একদিন আবদার ধরলো সে তার কয়েকজন বন্ধু নিয়ে আসবে, বউদিকে গান শোনাতে হবে। শাশুড়ি তাঁর এই ছেলেটিকে কেন জানি একটু প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। মুখে কিছু না বললেও মনে মনে তিনি এটা সমর্থন করলেন না। দেবরের বন্ধুদের সামনে দুটি গান গাওয়ার পরে সে যখন নজরুলের ‘আজো মধুর বাঁশরী বাজে’ গানটি গাইতে শুরু করলো, সাথে সাথে তার শাশুড়ি সেখানে এসে তাঁর হাত দুখানা জোড় করে বললেন, ‘এ গান বন্ধ কর বাছা। অনেক হয়েছে এবারে ওঠো’।

থতমত খেয়ে সে গান বন্ধ করলো আর সেই সাথে পরিবেশটাও হয়ে গেল ভারী। পরে এ নিয়ে মা আর ছেলের এক দফা ঝগড়াও হয়ে গেল। তার অপরাধ ছিল, মধু হচ্ছে তার মামা শ্বশুরের নাম, বারণ করা সত্বেও সে কোন সাহসে এই নাম উচ্চারণ করছে?

আসলে তার মামা শ্বশুরের নাম মধুসূদন। শ্বশুর বাড়িতে তাকে বলে দেয়া হয়েছিল মামা শ্বশুরের নাম তো দূরের কথা, মধুর দরকারে মধুও বলা যাবে না, বলতে হবে মৌচাকের রস। কিন্তু তাই বলে সে এই শব্দের গানও গাইতে পারবে না! কী অদ্ভুত! (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.