অত:পর আরও একটি শোকসংবাদ

উইমেন চ্যাপ্টার: ‘রাজধানীতে দুজনকে কুপিয়ে হত্যা’-প্রথমে এই ছিল শিরোনাম। পরবর্তীতে বিস্তারিত এলো, কলাবাগানের লেকসার্কাসের একটি বাড়িতে ঢুকে দুজনকে কুপিয়ে হত্যা, একজন গুরুতর আহত।

Xulhaz-Mannan‘কে খুন হইছে? LGBT? সে আবার কী?’ ‘ওহ, সমকামি? তাই কও। ‘সমকামি’ শব্দটা কানে যেতেই কেমন জানি চোখ বড় বড় টসটসে হয়ে উঠলো একটি নামকরা পত্রিকার সম্পাদক সামাদ সাহেবের। মূহূর্তেই মনের মধ্যে শরীরের কিছু গোপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেসে উঠলো তার। সামাদ সাহেবের অনেকদিনের শখ ‘জিনিসটা কী একটু জানার। কিন্তু কাউকে বলতে পারেননি। পরক্ষণেই ভাবেন, ‘হায় আল্লাহ, কেয়ামতের আর দেরি নাই বুঝি। এসব আপদ সমাজে না থাকাই ভালো। ভালো হইছে মাইরা ফালাইছে’। সমকামি, তাও আবার সম্পাদক, মনে মনে ক্রুঢ় হাসি হাসেন সামাদ সাহেব। পত্রিকা তার ভালোই রমরমা। ধর্ষণের খবর ছাপা হয় ছোট করে ভিতরের পাতায়, তাও আবার সব ধর্ষণ বা নারীঘটিত ব্যাপার-স্যাপারগুলো কোনাকাঞ্চিতে জায়গা পায় তার পত্রিকায়। এসব কী কোনো খবর? ভাবেন তিনি, সমকামি লোকজনের আবার পত্রিকা! 

আরও এককাঠি সরেস হয়ে মনে মনে বলেন, ‘আমি তো ঠিকই আছি, বউ এর সাথে আছি, সন্তান জন্ম দিতেছি, মাঝে-সাঝে এদিক-সেদিক যাওয়ার অভ্যেসও আছে। ওইসব এলজিবিটি বিদেশ থাইক্যা কীসব অধিকার আদায়ের নামে আকাম-কুকাম আমদানি করতেছে, দেশটারে একেবারে রসাতলে পাঠাইলো’।

ফোনটা হাতে নিয়ে নম্বর টিপে ওপাশ থেকে হ্যালো বলতেই সামাদ সাহেব বলে উঠেন, ‘দুইদিন পর পর কীসব লোকজন খুন হয়, আর দোষ হয় সরকারের। আরে মিয়া, সরকার কি খুন করতাছে? মানুষের ভাবখানা এমন যে, সরকার সব উন্নয়ন কাজ ফালাইয়া মানুষ খুন কইরা বেড়াইতেছে’। সামাদ সাহেবের মনের ভিতরটা এ যাত্রায়ও সঠিকভাবে পড়া না গেলেও, নিহতের নতুন পরিচয়ে কৌতূহলিই দেখা গেল তাকে। দেশজুড়ে এরকম সামাদই বেশি।

খবরে জানা গেল, যিনি খুন হলেন তিনি এলজিবিটি অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। ‘রূপবান’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন। অন্যদিকে মার্কিন দুতাবাসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপুমনির খালাতো ভাইও ছিলেন।

এ যাত্রাতেও নিশ্চয়ই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একে বিচ্ছিন্ন ঘটনাই বলবেন। একদিনে পাঁচজন খুন, সন্ধ্যা পর্যন্ত চারজন ছিল, রাতে আরও একজন বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে। সকাল হতে হতে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে, আবার নাও পারে। তাতে অবশ্য কিছু আসে যায় না। সবাই উপরের ওই সামাদ সাহেবের মতোন স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলতে পারেন নিজে ওই কমিউনিটির না বলে, আবার অভিশাপও দিতে পারেন তার এই হরমোন-গত বৈচিত্র্যের জন্য। ফলে তার হত্যাটা জায়েজও হয়ে যাবে। যেমন কিছু কিছু মিডিয়া এরই মধ্যে’ সমকামি পত্রিকার সম্পাদক খুন’ লিখে হত্যার সপক্ষে মোটামুটি জনমত দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

এবারও কিছুই হবে না। সোশাল মিডিয়ায় কিছু লোকজন অহেতুক শোরগোল তোলা ছাড়া কিছুই করতে পারবে না। কাল আবার অন্য এক বা একাধিক হত্যাকাণ্ডে সবাই সেদিকে দৌড়াবে।

যেমন সরকার, তেমনি তার প্রশাসন, তেমনি তার মিডিয়া। জনগণও তথৈবচ। সবই একইসূত্রে গাথা।

ব্লগার নূর নবী দুলাল এক প্রতিক্রিয়ায় যথার্থই লিখেছেন, ‘অন্যান্য সংবাদপত্রের সম্পাদকগণ যদি ভেবে থাকেন জুলহাস একটা নোংরা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, ওকে মারছে আমাদের মারবে না। ভুল করবেন তাহলে। প্রিয় সম্পাদকগণ, ধরে নিতে পারেন জুলহাস দিয়েই শুরু। আপনারাও আপনাদের ঘাড়টা প্রস্তুত রাখুন। ‘রূপবান’ এর সম্পাদক হিসাবে জুলহাস অবশ্যই যেকোনো সম্পাদকের চেয়ে অনেক বেশি সাহসী। জুলহাসদের মত সাহসী এক্টিভিস্টরাই পারে এই পৃথিবীটা সবার বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য কাজ করতে, জীবন দিতে। মেরুদণ্ডহীন সম্পাদক আর বুদ্ধিজীবীদের পক্ষে এতটা ত্যাগ সম্ভব নয়। কিন্তু সন্ত্রাসের ধর্ম ইসলামের কাছে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়। সুবিধাবাদীদেরও একদিন ইসলামের তরবারির নিচে পড়তে হবেই। বিশ্ব LGBT আন্দোলনে জুলহাস প্রেরণা হয়ে থাকবে’।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.