রুখবো তোমার সচল দৃষ্টি তাও কি হয়…

ইশরাত জাহান ঊর্মি: রঞ্জন বললো, ভদ্রলোক চলচ্চিত্রে অগাধ জ্ঞান রাখতেন। আকিরা কুরোশায়া থেকে বার্গম্যান দেখতে শিখিয়েছিল ওকে। হিচককও। রশোমন, বাইসাইকেল থিফ, সিটিজেন কেন-ক্লাসিকগুলো পদ্মাপাড়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলেদের ভিতর ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন।ঋত্বিক ঘটক খুব নাকি প্রিয় ছিল তাঁর। কোমলগান্ধার নামে একটা ছোট কাগজ সম্পাদনা করতেন। আবৃত্তির দল পরিচালনা করতেন। একটু নিভৃতচারী। বাজাতেন সেতার।

Urmiএইসব সেতার, সিনেমা, কোমলগান্ধার নিয়ে থাকতেন বলেই হয়তো টেলিভিশনের টক শোর দুর্গন্ধ টেবিলে তাকে কখনও দেখিনি। নিজেকে দুর্লভ রেখেছিলেন বলেই কোথাও পড়িনি তার সম্পর্কে। না চেনায় তাঁর কোন ক্ষতি হয়নি। কখনও কখনও নিজেকে দুর্লভ রাখাও খুব জরুরী।

কিন্তু এইবার যে আমাদের ক্ষতি হয়ে গেল! রেজাউল করিম সিদ্দীকি আপনি সেই মানুষ, যিনি রাজধানীতে এসে টিভিতে মুখ দেখাননি সংস্কৃতির কর্নধর হিসেবে, আপনি সেই মানুষ যিনি নীল-সাদা-সবুজে নিজেকে কলুষিত করেননি। ওসব কলুষ কিনা তা নিয়ে কথা বলে বা বক্তব্য দিয়েও আপনি সময় নষ্ট করেননি। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা কক্ষ নিয়ে কবিতা পড়িয়েছেন ছেলেমেয়েদের, আপনি চলচ্চিত্রর রিভিউ লিখেছেন।
আপনাকে ডেকেছে ইটালি আর ফ্রান্সের চলচ্চিত্রের ভাষা, আপনাকে বুঝেছে ঋত্বিক ঘটক। দুনিয়াদারির এইসব খামচাখামচি, এইসব ক্লেদ আর রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে আপনি একলা বাজিয়েছেন সেতার। আপনি সেই মানুষ, যিনি আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের মতো সারাক্ষন নিজেকে শান দিয়ে খাপ খোলা তলোয়ারের মতো প্রতিপক্ষকে কাটতে যাননি। চুপচাপ নিজের সাধ্যমতো নিজের দায়িত্বটুকু করে গেছেন। আপনি হয়তো জানতেন, এই ভীষণ বিভ্রান্ত জনপদের কোণাকানি দিয়ে যতক্ষন নিজের শ্বাস আছে,ততক্ষন মানুষের মধ্যে আলো ছড়ানোর কাজটুকু করে যাওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।
জনাব রেজাউল করিম সিদ্দিকী, আমরা আপনার মৃত্যুর জন্য, আপনার মতো আরও যারা আছেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই জনপদের আনাচে-কানাচে, যাদের চেহারা দেখা যায় না টিভিতে, যারা দায়িত্বটুকু পালন করে যান আলো ছড়ানোর তাদের মৃত্যুর জন্য ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছি। আমাদের অশ্নীল উন্নয়নের ফাঁকফোকর দিয়ে আপনার মতো সেতার বাজানো মানুষ ঘাড়ে কোপ খেয়ে পড়ে থাকবেন পথের ধারে এবং শুয়োরের বাচ্চা রাষ্ট্র সেইসব কোপ দেওয়াদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাবে।
আর আপনার সেতারের তারে হঠাৎ একটা মাছি বসে ধা করে সুর তুলবে।
আপনি নিশ্চয় মূর্তালা রামাতের কবিতা পড়েননি, কিন্তু শুনুন…
আমিতো এক করুণ মাছি
নিজের লাশের ওপর নিজে
ভনভনিয়ে মানুষ আছি !
নিজের ওপর অনেক ঘৃণা
খুন করবো তাও পারি না,
একটু মানুষ একটু মাছি
চাই না তবু হয়ে আছি !
চাইনা তবুও
মরে আবার মরে যাবার কথা
ভাবার মধ্যিখানে বেঁচে আছি !
নিজের ওপর হয় করুণা
তাড়িয়ে দেবো তাও পারি না,
পচে গলেও হেসে আছি
জ্যান্ত আমি করুণ মাছি!
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.