আমাদের মেয়েরা হবে রন্ডা মার্কোস

মারজিয়া প্রভা: প্রীতিলতা ব্রিগেড আত্মরক্ষা কৌশল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মেয়েদের। তায়াকোয়ান্দ শেখাচ্ছে। উইমেন চ্যাপ্টারে এই খবর প্রকাশের পর, ধীরে ধীরে অনেক অনলাইনে ছড়িয়ে গেল সেই খবর। একটা নামকরা অনলাইনে এই খবর ছাপানোর পর ভুরিভুরি কমেন্ট এলো। যার কয়েকটা এরকম: Self defence 2

১) আরে মেয়েরা তো ছেলেদের সাথে কিছুই পারবে না, এদের ধমক দিলেই চুপ হয়ে যায়। এরা দিবে আবার মাইর?

২) পর্দা করেন, ইসলাম ধর্মমতে জীবন যাপন করেন, আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে ধর্ষণ। এসব মারামারি শিখতে হবে না।

৩) এ কেমন অসভ্যতা! রাস্তার মধ্যে এরকম বিচ্ছিরিভাবে মারামারি শেখা?

কমেন্টগুলো যখন দেখলাম তখন মাথার তালু জ্বলছিল। সুন্দর করে স্ক্রিনশট দিলাম ফেসবুকেকিন্তু এতে লাভের লাভ কিছু হবে না জানি। এ মূর্খগুলোকে একদিনে চেঞ্জ করা যাবে না। জায়গামত মার খেলে নিজেরাই ঠিক হয়ে যাবে।

আমি যেহেতু লিখতে পারি, আমি একটা কাজই ভাল পারবো। সেটা হচ্ছে অনুপ্রাণিত করা। যেসব মেয়েরা তায়াকোয়ান্দোতে ফ্লেক্সিবল পা উঠাতে পারবে না, তারাও যেন এন্টি কাটার, চুলের কাঁটা, হলুদের গুঁড়ো কিংবা কালার স্প্রে দিয়ে আঘাত করে। হাতের বড় নক দিয়ে ছিলে দেয়, অণ্ডকোষ বরাবর জোরে লাত্থি যেন দিতে পারে! তাই আমি আজ তাদের শোনাবো রন্ডা মার্কোসের কথা।

r3
রন্ডা মার্কোস

আমাদের দেশে এমএমএফ ফাইটিং খুব বেশি জনপ্রিয় না। কিন্তু বিদেশে এই খেলা প্রচণ্ডভাবে জনপ্রিয়। ওদেশে ইউএফসি (UFC- Ultimate fighting Championship) বলে একটা প্রতিযোগিতা হয় এমএমএফ ফাইটিং এ। ছেলেদের খেলা বলে ভাবা হতো যে মিক্সড মার্শাল  আর্টকে, সে খেলায় রন্ডা খুব সহজেই চোখে পড়ে গেল।

ব্যক্তিজীবনে ফার্মাসিস্ট এই তরুণী ‘Being a Woman in MMF” নামে একটা ব্লগ লিখেছে। সেই ব্লগের লেখাটাই তুলে দিলাম এখানে।

“গুজব ছিল মেয়েরা নাকি এমএমএফ খেলতে পারবে না, ইউএফসি তে অংশগ্রহণ করা তো দূর কি বাত। তাই এমএমএফ এ নারীদের খেলতে আসা এবং জয় করা অনেক বড় একটা গল্প। আমরা বহু নারীরা মিলেই এমএমএফ মেয়েদের ভবিষ্যতের পথ গড়ে দিয়েছি। আমরা নারীরা লড়েছি জিমের বাইরে এবং ভেতরে আমাদের প্রকৃত সম্মান আদায়ের জন্য। আমরা লড়েছি ইউএফসির হেড থেকে শুরু করে এমএমএফর সমস্ত ভক্তদের মানসিকতা পরিবর্তন করার জন্য।

এমএমএফ ফাইটিংকে বলা হত ছেলেদের খেলা। তাই কোন মেয়ে একটা ছেলেদের খেলাকে ট্রেনিং হিসেবে নিচ্ছে এটা খুব সহজ বিষয় ছিল না। আমি প্রতিমুহূর্তে তাড়না অনুভব করতাম নিজেকে প্রমাণ করার। কারণ আমি জানতাম, নিজেকে প্রমাণ করতে পারলেই আমি সম্মান পাবো।

কিছুটা রেসলিংয়ের জ্ঞান ছিল বলেই বোধহয় এক রুম ছেলেদের মাঝে আমি অস্বস্তি বোধ করতাম না। বরং যেদিন আমি আমার ট্রেনিং পার্টনার হিসেবে কোন ছেলেকে পেতাম, সেদিন ভীষণ আনন্দিত হতাম। তবে ছেলেরা কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে পার্টনার হতে চাইতো না! কারণ মেয়েদের সঙ্গে ট্রেনিংয়ে তারা খুব সহজেই মেয়েকে পরাজিত করতে পারে এবং তাদের ওয়ার্ক আউট নাকি ঠিকমত হয় না!

তারা প্রথমেই বলে দিতো যে তারা আমাকে আঘাত দিতে চায় না। কারণ আমি মেয়ে, আমার শরীর নরম। বেশিরভাগ মেয়েরাই এসব কথা শুনে। আমি শুধু কঠোর পরিশ্রম করে যেতাম। যখন দেখতাম আমার পুরুষ পার্টনার একটু হাল্কাভাবে নিচ্ছে, ছাড় দিচ্ছে। তখন আমি তার উপর চড়াও হতাম। সর্বশক্তি প্রয়োগ করতাম। একসময় তারাও আমাকে মেয়ে বাদ দিয়ে ট্রেইনিং পার্টনার হিসেবে ভাবতে থাকে।

r1এটাতে সুবিধা হলো ছেলেরা ছিল ধ্বংসাত্মক, দ্রুতগামী এবং শক্তিশালী। আমি লড়তে শিখতাম। তবে এও ভয় লাগতো ক্ষণে ক্ষণেই, তারা আমাকে ছাড় দিচ্ছে না তো! একটা সময় আমি বুঝলাম, নারীদের সঙ্গে লড়াই করাটা একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা। আমার সেই অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন পড়লো।

নারীর শরীরটা ভিন্ন আকৃতির। আমরা প্রায় সবাই ভীষণ ফ্লেক্সিবল। কেউ কেউ ডাবল জয়েন্টেড। মাটিতে ফেলে আমাদের কাবু করাটা বেশ কঠিন। মেয়েদের সঙ্গে লড়াই করার সবচেয়ে বড় মজাটা ছিল আমি রিয়েল টাইম ফাইটের অনুভূতি পেতাম। আমার মনে হতো, এখনও প্রমাণের অনেক বাকি আছে। আমরা যারা প্রায় সমান ওজনের ছিলাম, তারা একে অপরের মাথা ধরে কাবু করতে চাইতাম।

আমার এখন মনে হয়, রেসলিং জুডোর মত স্পোর্টসগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ করা হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তের একটি। আমরা আমাদের সম্মান আদায় করেই ছেড়েছি। আজকাল বহু নারী এমএমএফ ফাইটাররা স্টেরিওটাইপ  বক্সিং জিম বা রেসলিং টিমে যোগদান করা বাদ দিয়েছে। যাতে করে তারা রিয়েল টাইম ফাইট করে সত্যিকারের কিছু সাফল্য অর্জন করতে পারে।

লোকে বলে, “মেয়েদের স্পোর্টস কোন দেখার মত মজার জিনিস না”। বলতে দেই না তাদের! বলুক ওরা! আজ যত বড় বড় বিখ্যাত নারী অ্যাথলেটরা এসেছেন পৃথিবীতে, তারা কেউই একদিনে এই পর্যায়ে আসে নাই। একজন নারী হিসেবে আমি মাত্র চ্যালেঞ্জ নেওয়া শুরু করেছি। আমাকে কিংবা আমাদেরকে আরও বহু বহু বাঁধা পার করে যেতে হবে”।

রন্ডা মার্কোস সাধারণ এক মেয়ে, যে এমএমএফ ফাইটিং এর মত কঠিন শারীরিক কসরত খেলার মধ্য দিয়ে নিজেকে মেলে ধরেছে। ডব্লিউডব্লিউই এর মতো অনুষ্ঠানগুলোতে ডিভা হয়ে মনোরঞ্জন করেনি। খেলেছে সত্যিকার ফাইটিংয়ের খেলা। সে যদি এতোটা পারে, আমাদের মেয়েরা আত্মরক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে না তাই কখনও হয়?

মনে রেখ মেয়ে, Fight is in our DNAজাস্ট আগপিছু না ভেবে এবং সময় নষ্ট না করে ঝাঁপিয়ে পড় লম্পটগুলোর উপর। চিৎকার দাও। প্রতিবাদ করো।

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.