ক্রিটিক্যাল থিংকিং বনাম নেগেটিভিটি -৩

ধর্মীয় মৌলবাদ ও এর বিরোধিতা

শাশ্বতী বিপ্লব: আমাদের জন্মের শত সহস্র বছর আগে এই মহাবিশ্বের কোন এক প্রান্তে ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে মিলিত হয়েছে দুটি কৃষ্ণগহ্বর। আমাদের মৃত্যুর শত সহস্র বছর পরে হয়তো তার প্রভাব এসে পৌঁছাবে এই পৃথিবীতে। আর এর মাঝে মিলে যাবে বা তৈরি হবে, হতে থাকবে আরো কত সহস্র কৃষ্ণগহ্বর। আমরা তা জানতেও পারবো না। অনুভব করতে পারছেন কি এই মহাযজ্ঞের বিশালতা! ধর্ম বা বিজ্ঞান কেউই এখনো এই কর্মযজ্ঞকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারেনি।

Shaswati 4এই বিশাল সৃষ্টি ও ধ্বংসের যিনি কারিগর, তাকে ঈশ্বরই বলুন আর মহাজাগতিক শক্তিই বলুন, তাতে তার কিছু যায় আসে কি! এই বিশালতার তুলনায় ক্ষুদ্র বালুকণার চাইতেও ক্ষুদ্র, তুচ্ছাতিতুচ্ছ পৃথিবী নামক একটি গ্রহের মানুষ আপনি ‘উলু’ দিলেন, কি ‘সিজদা’, ‘ক্রুশ’ আঁকলেন, কি ‘গেরুয়া’ পরলেন তাতে সেই মহাশক্তির কিইবা এলো গেলো। তাকে বিশ্বাস করা তাকে অহংকারিত করে না, তাকে অবিশ্বাসেও তার মহিমা তিল পরিমাণ ক্ষুন্ন হয় না।

তবু যুগে যুগে ধর্ম এসেছে এই পৃথিবীতে। সেইসাথে এসেছে বিরোধিতাও। সবচেয়ে দুঃখজনকভাবে এসেছে ধর্ম ব্যবসায়ীরা। আর আমরা কিছু বোকা মানুষ সুতোয় বাঁধা ঘুড়ির মতো কাটাকুটি খেলে গেছি, যাচ্ছি।  এর লাটাই হাতে ধান্দাবাজ ধর্মের লেবাসধারী হায়েনার দল আমার আপনার লাশের উপর পা রেখে পৌঁছে গেছে, যাচ্ছে তাদের অভিষ্ঠ লক্ষ্যে। আর এই ডামাডোলে কিছু মানুষ মামু বাড়িতে লাগা আগুনে মনের সুখে আলুপোড়া খাচ্ছে।

মানুষের প্রয়োজনে পৃথিবীর বুকে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, ধর্ম তার মধ্যে অন্যতম। যতদিন জীবনযাপনের ফর্মুলা আকারে ধর্ম আসেনি, তখনও পৃথিবীতে ধর্ম ছিলো। ধর্ম এক না জানা, না চেনা শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ। যা কিছুরই আমরা তল খুঁজে পাই না, তার জন্যে আমরা সেই শক্তির উপর নির্ভর করি। তাঁর কাছে নিদান চাই, ভরসা করি।

যে মানুষটির ধর্ম বিশ্বাস আছে, তার কেউ না থাকলেও এই একটি জায়গায় সে আশ্রয় খুঁজে পায়; বিশ্বাস করে তিনি সব দেখলেন, শুনলেন। তিনি বিচার করবেন।

আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিটি ধর্মের মোদ্দাকথা কিন্তু একইরকম। কিছু জিনিস এদিক-ওদিক করে দিলে আপনি নিজেই মেলাতে পারবেন অংকটা। শুধু খুঁজে দেখার, ভেবে দেখার কষ্টটা আমাদের সয় না।

ইসলাম শান্তির ধর্ম। শুধু ইসলাম কেন, খুঁজে দেখলাম সকল ধর্মই শান্তির কথা বলে, বলে অহিংসা, পরমত সহিষ্ণুতার কথা। কিছু উদাহরণ দিলাম, আপনি চাইলে আরো খুঁজে নিতে পারেন।

And make not Allah by your swearing (by him) an obstacle to your doing good and guarding (against evil) and making peace between men, and Allah is hearing and knowing

Islam 
Qur’an 2.224
Victory breeds hatred, for the defeated live in pain. Happily live the peaceful, giving up victory and defeat.
Buddhism, 
Dhammapada 201
Blessed are the peacemakers; for they shall be called the children of God.
Christianity

Matthew 5:9

King James Version

As rivers flow into the ocean but cannot make the vast ocean overflow, so flow the streams of the sense world into the sea of peace that is the sage.

Hinduism

Bhagavad Gita 2.70

How beautiful upon the mountains are the feet of him who brings good tidings, who publishes peace.

 Judaism

 Isaiah 52:7 (partial verse)

মোটামুটি সকলেই মানে ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। দেখুন:

One God and Father of all, who is above all, and through all, and in you all.

Christianity, Ephisians 4:6

New American Standard Bible

He is the one god hidden in all beings, all pervading, the Self within all beings, watching over all works, dwelling in all beings, the witness, the perceiver, the only one, free from qualities.

Hinduism

Servasvatana Upanishad 6:11

Say, He is God, the One!

God, the eternally Besought of all!

He neither begets nor was begotten.

And there is none comparable unto Him.

Islam

Qur’an 112

Have we not all one Father?  Has not one God created us?

 Judaism

 Malachi 2:10

Amplified Bible

ধর্মহীন মানুষ হয়না। ধর্ম হচ্ছে তাই, যা মানুষ ধারণ করে। ধর্ম একধরনের বিশ্বাস, জীবনাচরণ। এমনকি নাস্তিকতাও ধর্মই বটে। একদল মানুষের বিশ্বাস। নাস্তিকরাও আদতে শান্তির কথাই বলেন। আপনার ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য আপনার  হিংস্র হবার প্রয়োজন নেই। সূর্যের আলো আপন গুণেই উজ্জ্বল।

আবার এর বিপরীতে ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে আপনার ধর্মের বিরোধিতা করারও দরকার নেই। ধর্মীয় মৌলবাদ একধরনের রাজনীতি – যার জাল ছড়ানো আছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর। খুব সযতনে যার প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয় আর সেই ফাঁদে যাতে আটকা পড়ে সাধারণ ধর্মভীরু অগুনতি মানুষ।

আপনি মানুন নাই মানুন, ধর্ম যদি অসাড় হয় এর পতন যেমন আপনি রুখতে পারবেন না; যদি সত্যি হয় এর জয়যাত্রাও আপনি থামাতে পারবেন না। ধর্মানুভুতি নামক যে বিষধর সাপ নিয়ে আপনি খেলছেন সেই সাপই একদিন আপনাকে গিলে খাবে।

আমি জানি, আপনি চাইলে যেকোন ধর্মের ভিতর থেকে, যেকোন মতবাদের ভেতর থেকে, বিশ্বাসের ভিতর থেকে কিংবা অবিশ্বাসীদের বিশ্লেষণ থেকে হিংসা- কদর্যতা খুঁজে বের করতে পারবেন। ধর্মকে ব্যবহার করে কিংবা এর বিরোধিতা করে ছড়িয়ে দিতে পারবেন হিংসার বীজ। আর ঠিক তখনই আপনি সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে আনেন। যেকোনো বিষয়ে ধর্মের দোষ দেখতে পাওয়া, ধর্মের বিরোধিতা করাও একধরনের মৌলবাদ।

ভালো ফসল ফলানোর জন্য যেমন ক্ষেত প্রস্তুত করা জরুরি, তেমনি যেকোন মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যও ক্ষেত্র প্রস্তুত করা জরুরি। বিশেষ করে সেটার সাথে যদি মানুষের বিশ্বাস, তার অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। নইলে সবই পণ্ডশ্রম, কাঙ্খিত ফসল ঘরে ওঠে না। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে ধর্মহীনতার সার ছিটালে, না হয় দুষ্টের দমন, না হয় শিষ্টের পালন। মহাবিশ্বের মহাযজ্ঞ এগিয়ে যাবে আর আপনি আস্তাকুড়ে পরে রইবেন। ধর্ম মানাতে কোন ক্ষতি নেই, নেই না মানাতেও। কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য সৎ হওয়া চাই।

“ধর্ম” ও এর “বিরোধিতা” নিয়ে খেলাটা চলছে, চলবে। এর শুরু আছে, শেষ নেই। যতদিন না পর্যন্ত আপনি আপনার মনের জানালা খুলে দিবেন, ভিন্নমতকে স্বাগত জানাবেন। আপনি সঠিক হলে সকল সমালোচনা, কটুক্তি খড় কুটোর মতো ভেসে যাবে। আপনার ধর্মের গায়ে আঁচড়টিও লাগবে না। বিশ্বাস করুন।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

উত্তর লেখাতেই আছে। আপনি যাদের চেনেন তাদের বাইরেও অনেকে আছেন, যারা অসাধারণ একেকজন মানুষ, অত্যন্ত মানবিক। আবার ধার্মিক মানুষও আছেন যারা সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে। আপনি যাদের দেখেছেন তারা বেশিরভাগই ফেইম/ এটেনশান সিকার। আবার ধর্ম নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করেন তারাও কম যান না। ধর্ম বা অধর্ম যে কোন কিছু নিয়েই বিতর্ক, আলোচনা চলতে পারে। উদ্দেশ্য সৎ হলে অতো গোল বাঁধে না।

নিঃসন্দেহে ভাল লিখেছেন। আমার প্রশ্ন, নাস্তিকতা এক অর্থে ধর্ম এবং তারাও শান্তির কথা বলে। এর সত্যতা আমি তথাকথিত নাস্তিকদের মাঝে খুজে পাইনি। দু একজন ছাড়া বেশিরবাগেরই ধর্ম ভিত্তিক তাত্বিক জ্ঞানও কম। যদিই তারা শান্তির কথাই বলত, তবে কেন অহেতুক আস্তিকদের বিশ্বাস নিয়ে কটু কথা বলে। আমার যেহেতু গুটিকয় বাংলাদেশী নাস্তিক মানুষের সাথে পরিচয় হয়। তাদের কাছে তাদের নাস্তিকতাবাদের চাইতে অন্য ধর্ম, বিশেষত ইসলামকে ছোট করে তাদের মতামত দিতেই তারা বেশী আগ্রহী। এবং এসব মতামতের বেশিরভাগই তারা দিয়েছেন ইসলাম বিষয়ে যথেষ্ট না জেনে।
মানুষ সর্বোপরি বিশ্বাসী প্রানী, বিশ্বাস শুধুই ধর্মেই সীমাবদ্ধ হতে পারেনা। মানুষ থেকে মানুষের প্রতিও আমরা বিশ্বাস রাখন বিশ্বাকেই কল্পনা সর্বশ্ব ভেবে নিব তখন মানুষের অস্তিত্বই থাকেনা। কেন থাকবে, তবে কোথা থেকে এলো মানুষ?

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.