দেশচালকদের বলছি

সুরঞ্জনা চৌধুরী: তোমরা হিন্দুদের ভিটে মাটি ছাড়া করবা, তোমরা আমাদের আদিবাসীদের উচ্ছেদ ও মেয়েদের ধর্ষণ করবা, তোমরা তনুদের হত্যাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালাবা, তোমরা মুক্তমনাদের হত্যা করবা, তোমরা প্রকাশকদেরও সেই সাথে মারবা, তোমরা সাগর রুনির হত্যাকেও বেড রুমের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে স্বাভাবিক বলে চালাবা, তোমরা পেট্রোল বোমায় মানুষ পোড়াবা, তোমরা নারীকে গণধর্ষণ করবা, তোমরা কেন্দ্রীয় ব্যংকের টাকা গায়েব করে দিবা, তোমরা খুনি শামীম ওসমানকে সম্মানিত করবা আর টাকা খরচ করে কিছু রাষ্ট্রীয় কবি সাহিত্যিক বানাবা, তোমরা দাবির মুখে আন্দোলন কারীদের পাখীর মত গুলি করে হত্যা করবা। আর কতো কি?

এক সময় তৃণভোজি প্রাণীও কিন্তু বিস্ফোরকের মত হয়ে ফেটে জেগে উঠে। কেউ তখন তোমাদের রক্ষা করবে না। অত্যাচারী সিংহকে কেউ আর পাহারা দিয়ে আজীবন অন্যায় করার সুযোগ করে দেবে না। অন্যায়েরও একটা সীমানা থাকা উচিত।

নিজের পেটের সন্তানকে বেশী যত্ন করতে নেই কারণ তার গায়েই লেগে আছে পরিচয়ের দাগ। এই কথাটি অনেকেই জানেন। তবে এই কথাটার গুরুত্ব আজ অনেক বেশী। নিজের ঘরের লোকের কাছে যেমন নিজের পরিচয় দেওয়া যায় না। এই পরিচয় দিতে হয় অন্যের কাছে কিছু দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে। তবে তা একটু বেশী দেখানো লাগে যা নিজের সন্তানের বেলায় লাগে না। আবার ঘরের লোকের কাছেও সেই পরিচয় হয় না। কিন্তু আমরা নিজের সন্তানকেই বেশী যত্ন করে থাকি। তেমনি ঘরের লোকের কাছেই সব পরিচয় দিয়ে শেষ করছি। অন্যের জন্য কোন জায়গাই রাখছি না।

এতোটাই বেশী করি যে অন্যের সন্তানকে ঠিক মানুষ ভাবতে শিখিনি। অন্য ঘরের মানুষকে এতোটাই পর ভাবছি যে সে খুন হলেও স্বাভাবিকভাবে নিয়ে অন্য পথে হাঁটছি আর ভাবছি, এরা আমার কেউ না। তাই এই সন্তানগুলো শুধু লেখালেখির কারণে চাপাতির আঘাতে মারা পড়ছে তবুও কেউ ফিরেও তাকায় না। অথচ এরা এই বাংলাদেশেরই সন্তান।

তাহলে কেন এই নীরবতা? জন্মদিলেই সন্তানের মা-বাবা হওয়া যায় না। এই বোধটি আমাদের আজও আসেনি। যাদের আজ মারা হচ্ছে এরাই আমাদের দেশে গর্বিত সন্তান। এদের সরিয়ে নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানের যতোই খেদমত কর পরিচয় মিলবে না। জন্ম দেবার অধিকার বলেই নিজের সন্তানের প্রতি যে কর্তব্য চলে আসে তা তার পরিচয় না।এটা প্রকৃতির দেওয়া মাতৃত্ব ছাড়া আর কিছু নয়।

Abhijit allদেশ নেতৃত্বে যারা আছেন তাদের দায়িত্ব কী ছিল? তারা আজও দেশের মানুষকে নিজের মানুষ ভাবতে শিখি নাই। তারা তনুকে নিজের মেয়ে ভাবে না, তারা সামান্য লেখালেখির কারণে ব্লগার হত্যাকে ইনিয়ে বিনিয়ে জায়েজ করে দিয়েছে, এরা ক্ষমতার কাছে দাসত্ব স্বীকার করে, এরা দেশের মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করছে শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে, এরা দেশদ্রোহীকে আশ্রয় দিয়ে দেশপ্রেমিককে দেশ ছাড়া করছে এবং ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হয়েছে এই অজুহাতে কুপিয়েও মারছে।

আজ এরাই আমাদের দেশ চালনার মহান দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে।শাসক আর শাসিতের ব্যবধান আজ এতো বেশী, এত বৈপরিত্ব যে, কোন মানুষ আজ ন্যায় বিচার পাচ্ছে না। অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাবানরা।  দেশে জন্ম নেওয়া গর্বিত সন্তানদের বাঁচানোর জন্য দেশ মাতার যা করা উচিত তার কোন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। গর্বের সাথে কোলে তুলে নিয়েছেন সব কুসন্তানগুলোকে।

ব্লগাররা কি শুধু ধর্ম নিয়েই লিখছে? সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার পথে বাধা কি কি আছে, রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মকেই ব্যবহার করছে কিভাবে, সাধারণ মানুষ সামাজিক কী কী অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এই সবই এখন ব্লগেই বেশী আলোচনা হচ্ছে। এখন এই সব ব্লগারদের বিদেশে পাঠাতে পারলে বা চিরতরে সরাতে পারলে কাদের বেশী লাভ?

দেশীয় স্বৈরাচারী শাসকরা স্বাধীনভাবেই তাদের কার্য পরিচালনা করতে পারবে। এখন উন্মুক্ত পৃথিবীতে সব খবর মানুষের কানে চলে যাচ্ছে। এই তথ্যের স্রোত কি এইভাবে বন্ধ করা যাবে? আমি এই টরোন্টোতে বসে যে সামাজিক সুযোগ পাচ্ছি তা আমি দেশ বাসীকে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিচ্ছি। যাদেরকে এর থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে তারা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবে? না তারা জেগে উঠবে ন্যায় সঙ্গত অধিকার আদায়ে।

একটি মানুষ সহজে দেশ ছাড়ে না। বিশেষ করে দেশ প্রেমিকের ক্ষেত্রে তা কখনোও কাম্য না। আমেরিকায় আসার জন্য অনেকেই অনেক কিছু করবেন। কুরান হাদিসের পড়াও বহু গুণ বেড়ে যাবে। আর কিভাবে ধর্ম বিদ্বেষী ব্লগার হওয়া যায় সেই চেষ্টাও অনেক হবে শুধু আমেরিকা আসার জন্য।

এর মাঝে দেশ প্রেমিক সৈনিক যারা চায় আমার দেশ সুন্দর হবে, সবাইকে নিয়ে ভাল থাকবো, আমার দেশের তনুরা যেন আর ধর্ষিত না হয় সেই আকাঙ্ক্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করে যাবে। এরা সাহসী সৈনিক। দেশে প্রতিষ্ঠিত লেখক বুদ্ধিজীবিরাও সরকারের সঠিক সমালোচনা করে সেই সাহসিকতা দেখাতে আজ ব্যর্থ।

তাই কে কী লিখেছে শুধু তাই দেখে এই সব দেশ প্রেমিক ব্লগারদের মারা খুব সহজ হয়ে গেছে। তবে এর পরিণাম ভাল হবে না। অধিকার আদায়ের যুদ্ধ অন্য পথে বের হবেই। সময়ের দাবি সময় মতো পূরণ না হলে খোলা হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে আঘাত আনতে বাধ্য।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.