এবারের বৈশাখ হোক আমাদের, নপুংসকদের নয়

ইশরাত জাহান ঊর্মি: সেদিন আমার এক বান্ধবী ফেসবুকে লিখেছে, এবার পহেলা বৈশাখে কে, কী পরবেন? ওর একটা বুটিক শপ আছে। সেখানকার প্রমোশনালের জন্য এই স্ট্যাটাস। আমি মজা করে  লিখলাম, তুমি যা বলবে!

কিন্তু এরপর থেকেই মাথায় ঘুরছে প্রশ্নটা। প্রশ্নটা আমারও নারীকূলের কাছে। এবার বৈশাখে কে কি পরবেন? গতবছর পহেলা বৈশাখে যে ঘটনা ঘটলো, আপনাদের কি মনে হয়, এটা এই প্রথমবারের মতো বৈশাখে ঘটলো? আসলে প্রতিবারই ঘটে।

লিটন নন্দীর মতো শিড়দাঁড়াওয়ালা মানুষ খুব বেশি নেই এ সমাজে, এবং নিতান্তই ওই সময় লিটন নন্দী তার সহকর্মীদের নিয়ে ওই জায়গায় উপস্থিত ছিল বলে আমরা ঘটনাটা জেনেছি। না হলে, এরকম ঘটনা প্রতিবারই ঘটে, হলফ করে বলছি। আমরা –“মিডিয়াপার্সন” নামে যাদের গালভরা ডেজিগনেশন আছে তারা জানি না, কারণ আমরা ক্রিম খাই, আমাদের হাতে মাইক্রোফোন থাকে। আরও জানি না, কারণ, জানতে দেওয়া হয় না। কারণ কেউ চিল্লায়ে উঠি না, কারণ কেউ ঘুরে দাঁড়াই না।

এখন প্রশ্ন হলো, কে কি পরবেন? পুরুষের সেক্স যে কখন কীসে উঠবে আপনি তো তা জানেন না! কারো হয়তো আপনার খোলা পিঠ দেখে সেক্স উঠবে, কারো খোলা বাহু, কারো হয়তো বুক (উন্নত হোক বা অনুন্নত), কারো শাড়ি, কারো কামিজ, কারও বা হিজাব দেখলেও উঠতে পারে। মোদ্দা কথা, সেক্স তাদের উঠবেই।

কারণ আপনি আদতে একটি সেক্স উপকরণ, একটা সত্ত্বা নন। আপনাকে এভাবেই দেখতে শিখেছে বড়লোক হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের আপামর পুরুষসমাজ।

ট্রাস্ট মি, মিথ্যা বলছি না। আপনি যখন সাধারণ সালোয়ার কামিজ আর সূতি শাড়ী কিংবা কলারওয়ালা অতি শালীন ব্লাউজ পড়ে পহেলা বৈশাখ করেছেন, তখনও আপনার দিকে তাকিয়ে যেসব পুরুষরা যেমন লাাল টানতো, এখন যে আপনি স্লিভলেস ব্লাউজ পড়েন, অথবা বড় গলার কামিজ, এখনও ঠিক একইভাবে তারা লালা টানে। মিলিয়ে দেখুন কথাটা সত্যি বলেছি কি না? লাালটানা যাদের অভ্যাস তারা টানবেই।

অতএব কি পরবেন তা প্লিজ ঐ পুরুষের চোখ আর লালাটানাকে মাথায় রেখে পরবেন না। আপনি নিশ্চয়ই আমার চেয়ে ভালো জানেন যে আপনি পিঠখোলা বা স্লিভলেস ব্লাউজ পরে পহেলা বৈশাখের মেলায় যান, অথবা গলাবন্ধ সালোয়ার কামিজ, পরের দিন আপনার নিজেকে আবারও প্রমাণ করতে হবে জীবনের সকল প্রতিযোগিতাতেই। নারীর সকল লড়াই আপনাকে পরের দিন কি, সেদিন থেকেই লড়তে হবে পুনরায়। একাই।

Urmiঅতএব আপনি আপনার মতোই পোশাক পরেই বৈশাখ পালন করুন। হিজাব বা গলাবন্ধ আপনাকে বাঁচাবে না, আবার খোলা পিঠের ব্লাউজ একদিন পড়ে ফেললেই যে আপনি খুব বিপ্লব করে ফেললেন তাও কিন্তু না। আবার ওরকম পড়লেই অধিক বিপদের মুখে পড়বেন তাও বলছি না।

এখন কথা হলো, আপনি কি আসলেই যাবেন বৈশাখে, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অথবা কোন ভিড়ভাট্টায়? কিংবা প্রাণে ধরে পাঠাবেন আপনার কিশোরী বা তরুণী মেয়েটাকে? গতবছরে সামনে আসা এই ঘটনার পরেও? ভেবে দেখুন। শুধু যৌন নির্যাতন নয়, আপনি কিন্তু বোমা হামলার শিকারও হতে পারেন, অথবা চাপাতির কোপ।  

দ্বিধায় পড়ে গেলেন তো? আমি বলি কি, দ্বিধা ঝেড়ে ফেলুন। আপনার মেয়েকে যেতে দিন বৈশাখী মেলায়। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি আপনিও যান দৃঢ়ভাবে ওর হাতটি ধরে। আপনি বা আপনার পার্টনার দুজনই। যদি যেতে না পারেন, পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন করুন নববর্ষের আয়োজন, দরাজ গলায় গেয়ে উঠুন, ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো, আগুন জ্বালো…’।

যারা ভয় দেখাতে চেয়েছে আপনাকে তারা যেন কোনভাবেই এই বার্তা না পায় যে আপনি ভয় পেয়েছেন। আপনাকে যদি বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয় তবে দাঁড়াতে হবে একান্ত নিজস্বতা দিয়ে, আপনার সংস্কৃতির শক্তি দিয়েই। যতই আপনি বেতমিজ দিল এর সাথে দেশে-বিদেশে নাচেন, সিনেমা-নাটক দেখে পাশের দেশের নায়িকাদের মতো সাজার চেষ্টা করেন, আপনি পৃথিবীর যে দেশেই যান নিজের শেকড়কে তুলে না ধরলে আপনারে বেশিদিন পুছবে না কেউ।

তাই আপনার গর্বের এই আয়োজনটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডী থেকে বের করে ছড়িয়ে দিন পুরো শহরে, পুরো দেশে। কাটা গাছ থেকে যেমন আবারও কচি পাতা বের হয় কোন কোন গাছের, সেরকম। ইতিমধ্যেই সকল পাবলিক প্লেসে পাঁচটার মধ্যে নববর্ষের সবরকম আয়োজন শেষ করার সরকারি নির্দেশ এসেছে। এইসব নপুংসক নির্দেশ আপনি প্লিজ লাথি মেরে উড়িয়ে দিন। সভ্য মানুষের দেশে প্রধানতম উৎসব আয়োজনকে এরকম সীমার মধ্যে যারা আনতে চায় প্লিজ তাদের মুখ বরাবর কষে লাথি মারুন, মুখে না পারেন সিদ্ধান্তে মারুন।

girls 3এখন কি করবেন তা সত্যিই আপনার বিবেচনা। ভিড়ে বের হওয়ার সময় পারলে ব্যাগে আয়না, লিপিস্টক এর পাশাপাশি একটা ব্লেড রাখুন। আই মিন ইট! রাখুন। দুএকটা পোচ মারতে পারলে নারী মানুষ, না সেক্স উপকরণ, তা বুঝে যাবেন বীরপুঙ্গবরা।

আজকাল এইসব কথা আমি একা বলছি না, অনেকেই বলছেন। রাগে, দু:খে, যন্ত্রণায় বলছেন। কিভাবে ধর্ষকদের ঠেকাবেন তার শারীরিক কৌশল শেখাচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু এই যে বললাম, ব্লেড রাখুন সাথে, এই যে ধর্ষক ঠেকানোর শারীরিক কৌশল,  এভাবে কি কিছু পরিবর্তন করা যায়?

যায় না যে তা কি আমরা জানি না? জানি। এইরকম অদ্ভুত র‌্যাডিকেলবাদ দিয়ে কিচ্ছু বদলায় না। পরিবর্তনটা আসতে হয় সমাজের ভেতর থেকে। আসতে হয় মানুষের ভেতর থেকে। সত্যি বলছি, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের চেয়ে বড় শক্তি অন্য কোন বিপ্লব ধরে বলে জানা নেই। ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদেই শুরু হয়েছিল ছায়ানটের আয়োজন। মানুষের স্বত:স্ফূর্ত, যূথবদ্ধ যেকোনো প্রতিবাদই হতে পারে ইতিহাস।

সত্যি বলছি, আমি আপনার দিকে তাকিয়ে আছি। যে আপনি পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে একটা দেশী শাড়ী কেনেন, ছোট্ট সন্তানকে পরান শাড়ী অথবা ধূতি, যে আপনি ঘরে ঐদিন পান্তা আর ভর্তার আয়োজন করেন, যে আপনি রমনায় গান শুনতে যান, যে আপনি খুব সেজে প্রখর খরতাপেও সারাদিন আড্ডা দেন বন্ধুদের সাথে, যে আপনি চারুকলার মঙ্গলশোভাযাত্রায় অংশ নেন নেচে-গেয়ে। আপনি সবকিছু করেন।

এইবার উৎসবটা যে আমাদের সকলের- কতগুলি মৌলবাদী, ধর্ষক এবং নপুংসক প্রশাসকের নয়, এদের যে আপনি গোনায় ধরেন না তা প্রমাণের দায়িত্ব এইবার থেকে আপনারও।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.