এখনো বনের গান বন্ধু হয়নিকো অবসান-৩

লীনা হাসিনা হক: আমি জীব হিসাবে সামান্য, মানুষ হয়ে জন্ম আমার, কিন্তু যাপন করি প্রায় না-মানুষী জীবন। আফসোস আছে কি? তাও মনে হয় নাই। ভাবি আমি। আমার জানার পরিধি কম, এ কারণে ভাবনাও খুবই এলেবেলে সামান্য। আর অন্য কিছু করতে পারি না বলে ভাবতে থাকি।

ভাগ্যিস ভাবনার উপরে কারো কোন নজরদারি নাই।
Leenaফেসবুক নামক মাধ্যমে আমার পদার্পণ বেশ কয়েক বছর হয়ে গেলো। প্রথমদিকে তেমন কোন আগ্রহ না থাকলেও ধীরে ধীরে বেড়েছে। একটা বড় কারণ হলো ফেসবুকে নিজের বোকা বোকা কথাগুলো অনায়াসে পোস্ট করা যায়! এখানে যাই সেখানে যাই বন্ধুদের সাথে, সন্তানদের সাথে আর সেই সব জায়গার ছবি দেই। আর নিজের ছবি!

ঘন ঘন প্রোফাইল পিকচার বদল করি, নিজেই নিজের ছবির দিকে তাকিয়ে দেখি আমার বোকাপনা কেউ বুঝে ফেলবে কিনা। চশমার আড়ালে আমার চোখের ভাষায় কোন কুনো ব্যাঙের ছায়া দেখা যায় কি?

নিশ্চিত হতে পারি না! বারে বারে ছবি বদল করি। আমাকে স্মার্ট আর বুদ্ধিমান দেখতে লাগছে তো? নিশ্চিত হতে পারি না! আমার কাছের মানুষ বলেন, এটা নারসিজম এর লক্ষণ। সব কিছুতেই আমি, আমি।

তর্কে যাই না, বুঝতে দিতে চাই না যে আসলে এটা ভয় নামক বোকামির লক্ষণ। ভীতু মানুষেরা কেবলি চেষ্টা করে যায় তার জানার অপ্রতুলতা, চিন্তার অগভীরতা, স্বার্থপরতা, তার ভেতরের কুনো ব্যাঙটাকে যাতে কেউ টের না পায়। তা নিজের ছবি দিয়েই হোক আর নিজের হাবিজাবি লেখা পোস্ট করেই হোক।
আমি যে এতো সামান্য তাও আমার পরিবার, আমার বন্ধুরা, আমার সহকর্মীরা আমায় ভালোই বাসে। বাসে তো? আমার প্রাণের উজ্জ্বলতা, আমার প্রাণের অন্ধকার দিক সব মিলিয়েই আমাকে ভালবাসে তো? নিশ্চিত করে বলতে পারছি না কেনো? মনে হয় সবাই আমার ভালো আর উজ্জ্বল অংশটুকুকেই কেবল ভালবাসে না তো?

আমার সামান্যতা যখন দেখা যায় তখন প্রিয় মানুষদের চোখের তারায় কঠিনতা দেখে, মুখের ভাষায় তিরস্কার শুনে ভীতু আমি আরো কুঁকড়ে যাই। বুঝতে পারি এই ভীরুতা আমার উজ্জ্বলতাকে আরো ঢেকে দিচ্ছে। নিজের সামান্যতা ঢাকতে আরো বোকা বোকা কাজ করতে থাকি, প্রিয়জনেরা আরো ক্ষিপ্ত হতে থাকে আর আমি কুঁকড়ে কুঁকড়ে প্রায় না মানুষে পরিণত হই।

ভেবে ভেবে ক্লান্ত হই কেন আমার ভেতরের অন্ধকার, আধা অন্ধকার দিকটাসহ আমায় ভালোবাসা যায় না? আমি তো এমনই। অর্ধেক আমায় ভালবেসে না তারা পূর্ণ হয়, না আমি!
আবার আমিই বা আমার প্রিয়জনদের মধ্যে পারফেক্ট মানুষ খুঁজি কেন? মানুষ কেন পারফেক্ট হবে, মানুষ তো মানুষ! মানুষ ভালো করে, মন্দ করে, হাসায়, কাঁদায়, বিপদে পাশে দাঁড়ায়, আবার বিপদে ফেলেও।

এই মানুষকে কেন আমি মহা মানুষ হিসাবে দেখতে চাই সব সময়? প্রিয় মানুষের চরিত্রের সাদা কালোর বাইরে যে ধূসর জগত, সেই জগতকে কেন স্বীকার করতে দ্বিধা আমার? যে কোনও সম্পর্কের প্রিয়জনকে স্পেস দিতে চাই না বেশীরভাগ সময়। কেন আমার শুধু দখলদারী মনোভাব? আমার মত করেই হতে হবে সবকিছু, আমিই ঠিক, আমিই সত্য।

আমার ভেতরকার ধূসর আমিকে, কালো আমিকে ঢেকে কেবলই উজ্জ্বল আমি’র প্রচার! স্বপ্ন দেখি জীবন নিয়ে, আমার স্বপ্নই সত্য, আমার স্বপ্নের অংশীদার যারা, আমার পরিবার কী সন্তান, কী ভাবে সেটা ধরার মধ্যেই পড়ে না।

আসলে দখল করতেই দেখে এসেছি প্রায় সারা জীবনভর, দখল করে নেয়াকেই জিত ভেবেছি। কিন্তু বুঝতে চেষ্টা করি নাই কখনো যে কাছের জনদেরকে স্পেস দিলে সেই স্পেস আসলে আমাকেই গভীরভাবে বাঁচার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এতোটুকু জায়গা যদি আমার প্রিয়জনকে দেই, সেই জায়গা আমার জন্য প্রেইরির বিস্তীর্ণতা নিয়ে আসে জীবনে।
জীবনের দ্বিতীয় ইনিংসেরও প্রায় বেশী ওভার বাকি নাই, এখন আমার আমিত্ব ছাড়িয়ে বোকা আমি বুঝতে পারি, আসলে সামান্য একজন মানুষ আমি। আমার ভেতরের সাদা দিকের সাথে কালো দিক আছে প্রবলভাবে, ধূসর অংশের অস্তিত্বও কম নয়।

কখনো কখনো সেই ধূসর প্রায় কালোর কাছ ঘেঁষে যায়। আমার ধূসরতাকে তীব্রভাবে অপছন্দ করে মানুষ, আমার ক্ষুদ্রতাকে সমালোচনা করে মানুষ, তারপরেও আছে কিছু মানুষ এই মায়ার পৃথিবীতে, যারা ভালবাসে আমায় নিঃশর্তভাবে আমার সাদা কালো আর ধুসরতাসহ।

আমার গর্ভধারিণী, আমার গর্ভজাতরা। আছে আরো কেউ কেউ, বন্ধু, ভাই, প্রিয়জন। যারা আমায় দেখতে পায় অসীম ক্ষমায় আমার ভালো-মন্দ মিলিয়ই।

আমি শিখি তাদের কাছে- নিঃশর্ত ভালবাসার ব্যাপকতা। আমি ক্রমাগত চেষ্টা করি আমার কাছের পাশের সাথের মানুষদের ভালবাসতে, তাদের জায়গা দিতে, সবসময় ঠিকঠাক মতোন পেরে হয়তো উঠি না।

কিন্তু এটাও জানি, এই না পেরে ওঠার সীমাবদ্ধতা সহই তারা আমায় চায়, ভালবাসে। এই জানাটা আমায় প্রবলভাবে জাগিয়ে তোলে, বাঁচিয়ে রাখে, ভালবাসতে শেখায়। এখনো বনের গান বন্ধু হয়নিকো অবসান……

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.