পাঁচালীর প্যাচাল-৪

অনুপা দেওয়ানজী: দুর্বা দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। কারণ দুর্বা সহজে মরে না। তাই দুর্বাকে সব মঙ্গল কাজে ব্যবহার করা হয়।মেয়েটি ভাবলো, ধন আর স্বামীর মঙ্গলের জন্যে যদি লক্ষ্মীর পুজো, তাহলে মেয়েরা নিজের জন্যে ধন প্রার্থনা করে না কেন? স্বামীর কাছ থেকে তো তাহলে আর হাত পাততে হতো না।

এ কথা ভাবতে ভাবতে সে পাঁচালিটা উলটে-পালটে দেখে বহুদিনের ব্যবহৃত জীর্ণ, মলিন আট পাতার একখানি চটি বই। এর নামই তাহলে পাঁচালি! বইটির প্রথম পাতায় পুজো পদ্ধতি লেখা আর বাকি সাত পাতা জুড়ে পাঁচালির বিবরণ। এজন্যেই কি পুরোহিত পাঁচালি নিজে না পড়ে এর ভার বাড়ির মেয়ে বা বউদের দেন! কারণ বাকি সাত পাতা পড়তে গেলে তাঁর অনর্থক সময় নষ্ট। ওই সময়টাতে আরও সাত বাড়ির আয় যে তাঁর ঝুলিতে যাবে না।

Hindu 1বইটির রচয়িতা শ্রী জনার্দন ভট্টাচার্য্য। তাঁর দাবি, তিনি বিবিধ পুরান থেকে তা সংকলন করেছেন। কিন্তু ধর্ম গ্রন্থ বলতে তো চতুর্বেদ আর বারোটা উপনিষদই প্রাচীন ও বৈদিক বলে স্বীকৃত। এ ছাড়া বাকি সব গ্রন্থ তো ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা।

কে এই জনার্দন ভট্টাচার্য্য? কি লেখা আছে এতে?

মেয়েটি মাকে কখনো পাঁচালি পড়তে দেখেনি সে তাই ওটা নীরবে পড়তে লাগলো। প্রথমেই লেখা আছে দোল পূর্ণিমার রাত। পরিস্কার, মেঘমুক্ত নীল আকাশ। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে স্বামী আর স্ত্রী মানে লক্ষ্মী আর নারায়ণ রত্ন সিংহাসনে বসে একান্তে আলাপ করছেন। ভারি সুন্দর একটা ছবি। কিন্তু একি! নারদ নামে একজন বীণা বাজিয়ে গান করতে করতে সটান ওদের দুজনের মধ্যে উপস্থিত। এটা কেমন ধরনের ভদ্রতা হলো? স্বামী-স্ত্রীর একান্ত আলাপের মধ্যে তৃতীয় একজন না বলে কয়ে ঢুকে পড়া!

এমন সময়ে সবাই বলে উঠলো, ও কিগো, বউ তুমি চুপ কেন? পাঁচালীটা পড়ো!

মেয়েটি বুঝলো, পাঁচালি তাহলে নীরবে নয়, সরবে পড়তে হয়। সে কেন কখনো এটা লক্ষ্য করেনি? মা না পড়ুক, সে তো অন্যান্য বাড়ির পুজো দেখেছে। যাই হোক, সে তখন পাঁচালিটা কবিতার ঢঙে পড়া শুরু করতেই সেখানে উপস্থিত সবাই বিস্ফারিত নয়নে এ-ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে করতে এক সময়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।সে হাসির আওয়াজ শুনে তার রাশভারি শাশুড়ি সেখানে এসে উপস্থিত হয়ে সব বৃত্তান্ত শুনে বললেন, অনেক হাসিয়েছো বাছা, এবারে আসন ছেড়ে ওঠো।

তারপরে বড় বউকে বললেন, বড় বউমা তুমিই পাঁচালিটা পড়ো। সকাল থেকে সবাই উপোস। আর দেরি করো না। আর মেয়েটিকে বললেন, কান খুলে শোন বাছা, এবারে বাবার বাড়ি গিয়ে মাকে গিয়ে বলবে, পাঁচালি পড়াটা যেন তোমাকে শিখিয়ে দেয়। শুধু গা ভর্তি সোনা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দিলে হয় না, এসবও শিখিয়ে পড়িয়ে পাঠাতে হয়।

একঘর লোকের সামনে শাশুড়ির এমন রুঢ় ব্যবহার মেয়েটির বুকে তীরের মতো বিঁধল। তার চোখ দুটি জলে টলমল করতে লাগলো। কিন্তু সেইসাথে তার জিদ চেপে গেল সে আজ পাঁচালি না পড়ে এখান থেকে উঠবে না।বড় জা’কে সে বললো, দিদি পাঁচালি কিভাবে পড়তে হয় তুমি আমাকে একটু দেখিয়ে দাও, যদি না হয় তাহলে তুমিই পড়ো।

Anupa Dewanji
অনুপা দেওয়ানজী

এই বলে পাঁচালিটা বড় জা’এর হাতে দিতে গেলে বড় জা সেটি না নিয়ে তাঁর মুখস্ত থেকেই চার লাইন পড়ে তাকে শোনালেন। মেয়েটির মুখে হাসি ফুটে উঠলো। পাঁচ বছর বয়স থেকে সে রীতিমতো গানের শিক্ষকের কাছে তালিম নেয়া মেয়ে। জন্মের পর থেকেই মায়ের গান শুনে বড় হয়েছে। নজরুল সংগীত ও কীর্তনে সে পুরস্কার ছিনিয়ে এনেছে যেখানে, সেখানে কিনা সে পাঁচালি পড়তে পারবে না! ঘোমটার আড়ালে চোখ দুটি মুছে সে পাঁচালিটা পড়তে শুরু করলো।

“দোল পুর্নিমার নিশি নির্মল আকাশ।

মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস।।

রত্ন সিংহাসনে বসি লক্ষী নারায়ণ।

কহিতেছে নানা কথা সুখে আলাপন।

হেন কালে শ্রী নারদ ধরি বীণা তান

আসিলেন তথা করি হরি গুণ গান।“

তার চর্চিত কণ্ঠের অপূর্ব মিষ্টি স্বর সাথে সাথে যেন সৃষ্টি করল এক মাদকতা। পুজোর ঘরের বাইরে যারা ছিল তারাও ছুটে আসলো হাতের কাজ ফেলে। মুগ্ধ হয়ে সবাই তার পাঁচালি শুনতে লাগলো। মেয়েটি পাঁচালি পড়তে পড়তে বড় জা এর দিকে মুখ তুলে তাকাতেই তিনি সস্নেহে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।

শাশুড়ি তার পাঁচালি পড়া শুনে ভাবলেন, নাহ, মেয়েটিকে তিনি বোধহয় একটু বেশি বকা দিয়ে ফেলেছেন।

পূজোর ঘরের পরিবেশটি এখন সম্পূর্ণ পালটে গেছে। নিস্তব্ধ ঘরে অগুরু, চন্দন, পুষ্প, নৈবেদ্য আর ঘি এর পঞ্চপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত পরস্পর দুই নারীর মুখ। একজন স্বর্গের লক্ষ্মী আর আরেকজন মর্ত্যের গৃহলক্ষ্মী। মর্ত্যের গৃহলক্ষ্মীটি তার সুললিত কন্ঠে পাঁচালির মাধ্যমে স্বর্গের লক্ষ্মীর বিবরণ ও বন্দনা করছে আজ।

মেয়েটির মন এখন পুরোপুরি পাঁচালিতে। তার মনে খটকা লাগলো স্বামী-স্ত্রীর একান্ত আলাপের মধ্যে এমন অনাহুতভাবে নারদ প্রবেশ করলেন আর লক্ষ্মী বা নারায়ণ তাতে এতটুকু বিরক্ত বা আশ্চর্য হলেন না! এ কেমন কথা! মর্ত্যে তো এটা ভাবাই যায় না। কী জানি এটা হয়তো স্বর্গের ভদ্রতা!

যারা শুনতে বসেছে তাদের সবার হাতেই দুর্বা। আচ্ছা সধবারা না হয় স্বামীর মঙ্গল আর স্বামীর জন্যে ধন কামনা করছে, কিন্তু বিধবা মেয়েরা কি স্বার্থে বসেছে? তাদের তো স্বামী নেই। আর অর্থ! সেও তো লক্ষী দেবেন সধবা মেয়েদের স্বামীদের। আসলে যেখানে মেয়েদের নিজের জন্যে অর্থ চাইবার সাহস হয় না লক্ষ্মীর কাছে, সেখানে কী সধবা আর কী বিধবা! তাতে লক্ষ্মীর কী ঠেকা! নিজের ভালো নিজে না বুঝলে স্বয়ং লক্ষ্মীও যে তাতে সায় দেন না এটা মেয়েরা আর কবে বুঝবে! (চলবে)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.