ক্রিটিক্যাল থিংকিং বনাম নেগেটিভিটি -১

শাশ্বতী বিপ্লব: আমার বন্ধুতালিকায়/পরিচিত জনের মধ্যে বেশ কিছু প্রতিবাদী ও সাহসী মানুষ আছেন, যাদের অধিকাংশই আমার খুব পছন্দের। তাঁদের একাগ্রতা আমাকে মুগ্ধ করে; লড়াই করার শক্তিকে আমি ভালোবাসি। এদের কেউ কোন পোস্টিং দিলে হামলে পরে দেখি;  ওঁদের মতো হতে পারি না বলে মাঝ মাঝে গোপনে দুঃখও করি।

কিন্তু কয়েকদিন যাবৎ আমার কেমন ক্লান্ত লাগে। মনে হয়, প্রতিবাদী হতে হতে, সংগ্রামী হতে হতে আমরা কি “নেগিটিভিটি” তে আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছি? সবকিছুতেই সন্দেহ, অবজ্ঞা – মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ, জীবনযাপনে বীতশ্রদ্ধ।

ক্রিকেট নিয়ে এতো আবেগ কেন? আপনি বিরক্ত।

কেউ বিয়ে খেতে যাবে কেন? আপনি বিরক্ত।

সন্তানের আব্দার মিটাতে শিশু পার্কে যাবে কেন? আপনি বিরক্ত।

সিনেমা দেখবে কেন? আপনি বিরক্ত।

জন্মদিন পালন করবে কেন? আপনি বিরক্ত।

কোন এক মেয়ে মন্ত্রীর কাছে কিছু চাইছে, আপনি বিরক্ত।

মন্ত্রী সেই চাওয়া পূরণ করছে, আপনি বিরক্ত।

তরুণ-তরুণীরা নির্মল আড্ডা দেয়, সেলফি তুলে আপলোড করে – আপনি বিরক্ত।

কেউ বৃষ্টিতে ভিজে হেরে গলায় গান গায় – আপনি বিরক্ত।

বৃষ্টির কারণে যে ফসলের কত ক্ষতি হবে, নগরে জলাবদ্ধতা হবে তা নিয়ে চিন্তিত না হয়ে কোন মানুষ কিভাবে বৃষ্টিতে মনের আনন্দে গান গাইতে পারে!!! আপনি তাকে গাড়ল ভাবছেন।

দেশের কত টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে অথচ এরা দৈনন্দিন জীবনের খোরাক জুটাতে ব্যস্ত! আপনি তাকে অসচেতন ভাবছেন।

Shaswati 4রাষ্ট্র দেশের জন্য সমূহ পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনছে সেটা নিয়ে রাস্তায় নামেনি, আশ্চর্য!!! আপনি তাকে মুর্খ ভাবছেন।

এরকম শত কারণে আপনি বিরক্ত। কারণ, তারা আপনার মতো করে সংগ্রামী নয়, আপনার কাঙ্খিত পথে সে প্রতিবাদ করে না।
আপনি ডানপন্থী হলে বামকে গালাগাল করছেন, বামপন্থী হলে ডানকে। আপনি কোন পন্থীই নন? তাহলে আপনি আরো উন্নত সচেতন মানুষ। আপনি স্বঘোষিত এক্টিভিস্ট? ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান? তাহলে কোন কথাই নেই।

আপনি ভুলে গেছেন, সবাই একইরকমভাবে প্রতিবাদ করে না; প্রত্যেকের সংগ্রামের নিজস্ব পথ থাকে।যে নারী রাস্তায় নামেনি, কিন্তু নিরন্তর ঘরের ভেতরের বৈষম্যের সাথে সে যুদ্ধ করে চলেছে। সে আপনার-আমার চাইতে কম সংগ্রামী নয়।

যে কৃষক শত বিপর্যয়ের মাঝেও টিকে থাকার চেষ্টা করছে;  যে শ্রমিক হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে নিজে একটা রুটি ও এককাপ চা খেয়ে সন্তানের বই কিনে বাড়ি ফিরছে, কিংবা যে কর্মজীবী মানুষটা বাসের ধাক্কা সামলে আবার কিছুটা হেঁটে পয়সা বাঁচানোর চেষ্টা করছে – এরা সবাই একটি একটি করে ইট গেঁথে দিচ্ছে আপনাদের মুক্তির আন্দোলনে।

যুদ্ধের ময়দানেও একজন সৈনিক পূর্ণিমার চাঁদ দেখে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থায়ও মানুষ হাসে, শিশুকে ঘুমপাড়ানী গান শোনায়, ঝগড়া করে, প্রেমে পড়ে, সংসার বাঁধে, সন্তান জন্ম দেয়।

ক্রিটিক্যাল থিংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ চর্চা। কিন্তু আপনি বেশি ক্রিটিক্যাল হতে গিয়ে জীবনের স্বাভাবিক রূপ, রস, গন্ধকে যদি গ্রহণ করতে না পারেন তবে আপনি “নেগেটিভিটি”তে আক্রান্ত। আপনি মনে করেন, আপনার মত ও পথই সঠিক, অন্যরা যা বলছে বা করছে সেটা ভুল, জ্ঞানের অভাব বা দলীয় দাসত্ব – “নেগেটিভিটি” আপনাকে গ্রাস করেছে, আপনি বেঁধে দেয়া ফ্রেমে আটকা পড়েছেন।

আপনি গণমানুষের কথা ভাবেন, তাদের মুক্তির জন্য কাজ করেন, অথচ তাদের স্বাভাবিক আবেগকে ধারণ করেন না। শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলছি, আপনার নিজেকে আগে মুক্ত করা প্রয়োজন হয়তো। জোর করে মানুষকে আন্দোলনমুখী করা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাউকে জোর করতে হয়নি। আপনারা আপনাদের মতো চেষ্টা করুন। অন্যরা তাদের মতো চেষ্টা করছে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.