পাঁচালির প্যাঁচাল – ৩

অনুপা দেওয়ানজী: ওইতো পুরোহিত মশাই ঘরের দাওয়ায় উঠে এলেন। পরনে তাঁর হেঁটো ধুতি। ন্যাড়া মাথায় শোভা পাচ্ছে লম্বা টিকি যার আর এক নাম নাকি শিখা! তাতে আবার একটা ফুল বাঁধা। খালি গা। তিনি যে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ প্রজাতির সেটার চিহ্ন স্বরুপ গায়ে শোভা পাচ্ছে উপবীত।! কাঁধে উত্তরীয় আর হাতে যজমান বাড়ি থেকে পাওয়া চাল, কলা। সন্দেশ,নাড়ু, মুড়কি ইত্যাদির বিশাল বোঁচকা।

Hindu 2আচ্ছা আজকাল ছেলেমেয়েদের নামাবলী দিয়ে নানা ধরনের ফতুয়া বা পাঞ্জাবি বা ওড়না করে পড়তে দেখি কিন্তু পুরোহিতদের চুলের এই স্টাইল কাউকে করতে দেখিনি। এই স্টাইল কি তবে তাদের পছন্দ নয়?

পুরোহিত মশাই এসে তাড়াহুড়ো করতে লাগলেন পুজোয় বসার জন্যে। তাঁকে আরও যজমান বাড়ি যেতে হবে। হাতে তাঁর সময় নেই ইত্যাদি। কিন্তু তার কোনও দরকার ছিল না, বাড়ির সবাই তাঁর প্রতীক্ষাতেই ছিল।

আচ্ছা, লক্ষী পুজো তো ধন প্রাপ্তি আর সধবা রমণীদের পুজো। এক্ষেত্রে পুরোহিতের ভূমিকায় একজন নারী পুরোহিত হলে ভলো হতো না? হা! হা! হা! তা কী করে হয়! তাহলে যে আয় বা রোজগার বা অর্থনৈতিক মুক্তি মেয়েদের হাতে চলে যাবে! আর আসল অস্ত্রটা যে হাতছাড়া হয়ে যাবে ছেলেদের হাত থেকে! সে তথাকথিত উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণ রমনী হলেও নয়। অথচ করছে কিন্তু লক্ষ্মী দেবীর পুজো। লক্ষ্মী তো একজন মেয়েই।নয় কি!

পুরোহিত মশাই পুজোয় বসতে না বসতেই পাঁচ মিনিটের মাথায় পুজো শেষ করে সবাইকে ডাকলেন অঞ্জলি দেবার জন্যে। অঞ্জলির পরেই আসে প্রণাম মন্ত্র।

মন্ত্রটি এইরকম: “ওঁ বিশ্বরুপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে সর্বত্র পাহিমাং দেবী মহালক্ষ্মী নমোহস্তুতে”

পুরোহিতের পাশেই বাড়ির বারো বছরের মেয়েটি মন্ত্রটি পাহিমাং দেবীর জায়গায় না বুঝে বললো, তসিমাং দেবেন্দ্র। আসলে তার খেলার সাথীদের একজনের নাম দেবেন্দ্র, সে তো আর অত-শত বোঝে না। পুরোহিতও কিছু বললেন না। বাড়ির সবাই সে মন্ত্র শুনে সে কী হাসি!

পুরোহিত এইবাড়ি থেকেও তাঁর প্রাপ্য চাল-কলা-মিষ্টি ইত্যাদি আর দক্ষিণা নিয়ে পাঁচালি্টা বাড়ির কোনো বউকে পড়বার নির্দেশ দিয়ে প্রস্থান করলেন।

পুরোহিত তো নির্দেশ দিয়ে চলে গেলেন, কিন্তু পাঁচালিটা পড়বে কে? পুজোর ঘরে উপস্থিত সবার দৃষ্টি গেল সদ্য বিবাহিতা বৌটির দিকে। সবার ইচ্ছে নুতন বৌটি পাঁচালি পড়ুক।

বৌটির বয়েস তখন মাত্র ষোলো। বাবার বাড়িতে মাকে সে লক্ষীপুজো করতে দেখেছে ঠিকই, কিন্তু সে পুজো মা নিজেই করতেন, কোন ব্রাহ্মণ পুরোহিত দিয়ে নয়। তবে মাকে সে পাঁচালি পড়তে কখনো দেখেনি। বাবাও তাঁর ছোট ছোট মেয়েদের উপোস থাকা একেবারেই পছন্দ করতেন না। হটাৎ সে ভাবতে শুরু করলো, আচ্ছা মা পুজো করতেন, কিন্তু পাঁচালি পড়তেন না কেন?

Anupa Dewanjiমেয়েটি বেড়ে উঠেছে এক রাবীন্দ্রিক পরিবেশে। ঠাকুরদা ছিলেন শান্তিনিকেতন থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত। বাবা সাহিত্যের অধ্যাপক। মাকে সে দেখেছে পঞ্চকবির গান গাইতে গাইতে ঘরের কাজ করতে, ইয়োরোপিয়ান এক নারীর কাছ থেকে নানা ধরনের সেলাই শেখা দিদিমা মাকে শিখিয়েছেন ড্রন থ্রেড, এমব্রয়ডারি, ক্রসস্টিচ, ঊল্ বোনা, ক্রুশের কাজ, ইত্যাদি নানা ধরনের সেলাই। মা সেই সব সেলাই করেন, ফুলের বাগান নিয়ে ভাবেন, ভালবাসেন শৈল্পিক সব রান্না করতে। ভালোবাসেন গল্পের বই পড়তে।

কো-এড স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে সে কো-এড কলেজে মাত্র ঢুকেছে। কলেজ-কোয়ার্টারের বিভিন্ন ধর্মের অন্যান্য অধ্যাপকের ছেলেমেয়েদের সাথে এক উন্মুক্ত আবহাওয়ায় সে বড় হয়েছে। একসাথে সবার খাওয়া-দাওয়া, নাটক করা, গান-বাজনা, সাঁতার কাটা, ম্যাগাজিন বের করা, ব্যাডমিন্টন খেলা, এমনকি ক্রিকেট পর্যন্ত। বড়রাই তাদের এসব নিয়ে নানা উৎসাহ দিতেনও সহযোগিতা করতেন।

কিন্তু সেই মেয়েটিকেই তার বাবা-মা হটাৎ করে গোঁড়া ও রক্ষণশীল এই পরিবারের সেরা ছেলেটির সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। জলের মাছকে ডাঙ্গায় তুললে সে যেমন খাবি খেতে থাকে, মেয়েটির দশা হলো ঠিক তেমন।

এখানে কেউ দেবতার সামনে নির্দ্দিষ্ট দু’একটি গান ছাড়া আর কোন গানের চর্চা করে না, মেয়েরা তেমন লেখাপড়া জানে না, ধর্ম গ্রন্থ বলতে পুঁথি, পাঁচালি, ঘরের চারিদিকে বিস্তর ঠাকুর- দেবতার ছবি।

বউরা উপবাস, ব্রত এসব নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত। ভাশুরের সামনে আধ হাত ঘোমটা দিয়ে হাঁটে, মামা শ্বশুরকে দেখলে লুকিয়ে থাকে। শ্বশুর, ভাসুর, স্বামীর নাম মুখে আনে না।

স্বামী যদিও তাকে বলেন, আর কিছুদিন পরেই তাকে তার চাকরিস্থলের কোয়ার্টারে নিয়ে যাবেন, কিন্তু মেয়েটির মন পড়ে থাকে ছেড়ে আসা ভাইবোন, বাবা-মা, খেলার সঙ্গী-সাথীদের জন্যে। এমন সময়ে তার বড় জা তাকে বললেন তুমি শাড়িটা বদলে এই শাড়িটা পড়ে পাঁচালি পড়তে বসো। মেয়েটি তাকিয়ে দেখলো ঘিয়ে রঙের জমিতে লাল টকটকে পাড় আর আঁচলের এক পট্ট বস্ত্র। সবে স্কার্ট ছেড়ে সে শাড়ি ধরেছে। শাড়ির শৈল্পিক রুপের ব্যবহার সে এখনো রপ্ত করে উঠতে পারেনি। বড় জা তাকে আদর করে আটপৌরে করে শাড়িটি পরিয়ে দিলেন। সবাই বলে উঠলো, বাহ্ আমাদের বউকে দারুণ মানিয়েছে তো!

মেয়েটি আসন পেতে পাঁচালিটা হাতে নিয়ে বসলো পড়বার জন্যে। কে যেন বললো, হাতে দুর্বা নিয়ে বসো। (চলবে)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.