ধর্ষকামী রাষ্ট্রে তনুরা বার বার মরে

ইশরাত জাহান ঊর্মি:  “তনু আমার বোন, বোন আমার ক্ষমা করিস…”এই সমস্ত আজাইরা কথা আমি বলি না। তনু আমার বোন না। তনু গান, নাচ আর নাটক করতো, আমিও গান আর নাটক করতাম, তাই বলে তনু আমার সহযোদ্ধাও হয়ে যায়নি। তনু আমার বোন বা সহযোদ্ধা না, কিন্তু সে একটা আস্ত মানুষ ছিল, তারে ধর্ষণ করে গলা কেটে মেরে ফেলা হয়েছে। অতএব তার এই হত্যার বিচার চাই আমি। আমি তনু না, কিন্তু…তার আগে ঘটনা শোনেন।

Urmi
ইশরাত জাহান ঊর্মি

১৯৯৭ সাল। আমি কলেজে পড়ি। তার বেশ আগে থেকেই চুরি হয়ে গেছে স্বত:স্ফূর্ততা। সারাক্ষণ ওড়না টানাটানি। বুক ঢাকতে ঢাকতেই এবং ঠিকঠাক ঢাকতে পারছি কিনা তা ভাবতে ভাবতেই দিনের অর্ধেক চলে যায়। আমাদের ছোট্ট থানা শহর, যে শহরে বেড়ে উঠা, এক লহমায় ক্লাস সেভেন কী এইটে উঠতেই সে শহর, শহরের মানুষগুলো কেমন অচেনা হয়ে গেল।

‘দশের ফোরাম’ নামে একটা সংগঠন করেছিল আমার খালাতো ভাইয়া আর তার বন্ধুরা। ওরা একসময় খেলাঘর, কম্যুনিস্ট পার্টি করতো, ততদিনে পুঁজির পুঁজ সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ায় ওরাও সেসব ক্ষান্ত দিয়েছিল। কিন্তু বসে তো আর থাকা যায় না,  তাই ‘দশের ফোরাম’ নাম দিয়ে একটা সংগঠন। আমিও সদস্য। সেই ফোরাম থেকে নানান আয়োজন হয়, আমরা দলবেঁধে রিহার্সেল করি ছেলেমেয়েরা। গান করি, নাটক করি। রিহার্সেল হয় আমাদেরই কারও না কারও বাসায়।

বাসায় যতক্ষণ এই ছেলেমেয়েগুলোর সাথে আছি ততক্ষণ কী যে স্বস্তি! বাকিটা সময় যখন ছোট্ট থানা শহরের রাস্তায় হাঁটি, কলেজে যাই বা কোন বান্ধবীর বাড়ি অথবা প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে- ঠিকঠাক করি বুকের ওড়না। বিকেল বেলা বাড়ির পাশের রাস্তাটায় হাঁটতে বের হই কয়েক বান্ধবী।

সেখানেই শুরুটা।  

আমাদের বাসার পাশেই মাদ্রাসা। সেখানে ইসলামী ছাত্র শিবিরের তরুণ সেনাদের মজমা বসতো। খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা আমাকে বা আমার মতো আরও অনেককে পছন্দ করতো না। আমাকে সামহাউ বেশিই অপছন্দ করতো। কী ছাত্র শিবির, আর কী মুক্তিযুদ্ধ তা কেউ ইতিহাস ঘেঁটে আমাকে শিখিয়ে দেয়নি, না পরিবার অথবা শিক্ষালয়। সম্ভবত: বাড়ির পরিবেশের কারণেই আপনা আপনিই পাকিস্তান ঘৃণা, রাজাকার ঘৃণা ভেতরে চলে আসছিল। তো এই শিবিরের ছেলেগুলা আমাকে একেবারে স্কুল থেকেই নানান ভাবে উত্যক্ত করে আসছিল। আমিও নানাভাবে প্রতিবাদ করি আর আব্বু-আম্মুর গালি খাই।

“আর কারো সঙ্গে লাগে না, তোমার সঙ্গে কেন লাগে?”-এই প্রশ্ন শুনতে শুনতে জেরবার। কিন্তু এতো জঘন্য ছিল সেইসব উত্যক্তের ধরন যে আমি বিস্তারিত লিখতে গেলে ইতিহাস হবে।

তারপর সেই রাত্রি। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল প্রান্তর। আমার খালাতো বোন, ওর বাচ্চা, আমি আর বাড়ির একজন সহকারি মিলে কাছেই এক আপার বাসায় বেড়াতে যাচ্ছিলাম। সেই পথ যে পথে রোজ বিকেলে হাঁটতে বের হই, আর শিবিরের ছেলেদের বাজে মন্তব্য শুনি- সেই পথ। ওইদিনও ওরা ছিল। দুটো ছেলে যথারীতি বাজে কথা বলছিল।

কিন্তু ওইদিন আমার কী হলো, প্রতিবাদটা জোরেই করে ফেলেছিলাম। সামনে এসে একটা ছেলে এবার এতো বাজে একটা কথা বললো, আমি আর আমার ভেতর ছিলাম না, সপাটে চড় লাগিয়েছিলাম ওর গালে। হিংস্র জানোয়ারের ডেফিনেশন সেদিন শিখেছিলাম। আমার কামিজ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল ওরা। আমার বোন, কাজের বুয়া, বোনের বাচ্চার চিৎকার, আরও আশেপাশের বাড়ি থেকে জমে যাওয়া লোক, সব মিলিয়ে একটা বড় ধরনের জমায়েত হওয়ার কারণেই এক্ষেত্রে যা ঘটে তা আর ঘটতে পারেনি।

আপনাদের জানিয়ে রাখি, আমি সেই সৌভাগ্যের অধিকারী একজন যে ধর্ষণের সকল এলিমেন্ট থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণ থেকে রেহাই পেয়েছিলাম আমার কৈশোরে। এক চাঁদমাখা সন্ধ্যায়।

এরপরের ঘটনার জন্যই এতো কাহিনীর বর্ণনা। থানায় কেস হলো। আমার কলেজ শিক্ষক বাবা কেস করলেন। যতটা না আমার সাথে অপরাধ ঘটেছে তা প্রতিরোধ করতে, তার চেয়েও বেশি আমার বাবার মতো সম্মানী বাবার মেয়ের সাথে এমনটা ঘটেছে –এটা একটা মান-সম্মানের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আঁতে লেগেছিল আমার পরিবারের। আমার মা লজ্জায় বিছানায় পড়ে গেলেন, বাড়ি বয়ে আমাকে সমবেদনা জানাতে আসতে লাগলো অগুনতি মানুষ, ঠিক ঋতুপর্ণ ঘোষের দহন সিনেমাটার মতো। সেই কেস কোর্টে উঠলো যখন, সবচেয়ে গা ঢাকা জামাটা আর চওড়া করে ওড়না পড়ে আমি আব্বু- আম্মুর সাথে কোর্টে যেতাম।

আমার বাবা-মা উকিল, আর্দালি, পরিচিত -অপরিচিত সবাইকে আপ্রাণ বুঝানোর চেষ্টা করতো যে, এটা সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের কোন ব্যাপার না, এটা স্রেফ বখাটে কিছু ছেলে মেয়েটাকে মেরেছে মাত্র।

তারা কেন এমন করতেন? সেই কৈশোরেই আমি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতাম। শিবিরের ছেলেগুলো দিনের পর দিন আমাকে বিরক্ত করতো, পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করতো, শেষে এসে ধর্ষণ চেষ্টা হোক আর শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হোক- করেছে, অপরাধটা আমার কোথায়? কেন আমাকে কোর্টে, পরিচিত-অপরিচিত সবার কাছে প্রমাণ করতে হবে, ঘটনাটা সেক্সুয়াল নয়! কেন আমাকে, আমাকেই এতোটা লজ্জা পেতে হবে?

Shohagiতনুর ঘটনায় একটি লাইনও কোথাও বলিনি বা লিখিনি আমি। আজ তনুর বাবা-মা’কে পুলিশের জেরা করার খবর বিস্তারিত পড়ে আমার মাথার ভেতর আগুন জ্বলতে থাকে।  সেইদিনগুলোর মনে পড়ে গেল। কী অদ্ভুত ঊণতার সেসব কাল! তনু কেমন কাটিয়েছে তার ১৮/১৯ বছরের জীবন আমি জানি না। কিন্তু প্রায় ২০বছর পরেও একটুও কি বদলেছে আমাদের মানসিকতা?

সবই খারাপ আমি বলবো না। আমার ওই কেসে কার কার নাম থাকবে তা নিয়ে স্থানীয় নেতারা আব্বুকে অনেক পরামর্শ দিয়েছিল। চার্জশিটে যার যার নিজস্ব শত্রুদের নাম ঢোকানো, রাজনীতির প্রতিপক্ষ ইত্যাদি নানান কিছুতে যখন আমার শিক্ষক পিতা ঘেমে উঠছিলেন, তখন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেন। সিদ্ধার্থ শংকর রায়। নারায়ণগঞ্জের ছেলে। দেবদূতের মতো চেহারা (সবাই মেয়েদের গুণের কথা বলতে গিয়ে সুন্দরী বিশেষণ দেয়, আমারও দিতে ইচ্ছা করলো)। সিদ্ধার্থ সেই মামলা যখন হাতে নিলেন, আমাকে বা আমার পরিবারকে থানায় ডেকে কোনদিনও আপত্তিকর বা বিব্রতকর কোন প্রশ্ন করেননি।

তনু বাঁচেনি। কিন্তু এখন প্রতিদিন তার বাবা-মাকেও ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে। অস্বীকার করবেন কেউ? তনুর কার কার সাথে সম্পর্ক ছিল, পরিবারে কী কী সমস্যা, বিয়ে হয় নাই কেন…এইসব হলো প্রশ্ন। রাষ্ট্র আর প্রশাসন যখন এমন ধর্ষকামী হয়, তখন “ ক্ষমা করিস বোন” বলে যারা কাব্য করে, ঐ ধর্ষক, ধর্ষকামী প্রশাসনের মুখের মতো তাদের মুখেও আমার হিসু করতে ইচ্ছা করে।

আমি বলি কী, দাঁড়ান। সটান দাঁড়ান। এই সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধেই। এই বাংলাতেই ইয়াসমিনরে ধর্ষণ করে ফেলে রেখেছিল প্রশাসন, এই বাংলাতেই স্মৃতিকণাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ করে নগ্ন ছবি তুলে রেখেছিল প্রভাবশালীরা, এই বাংলাতেই পূর্ণিমার মা বলেছিল, ‘আপনারা একজন একজন করে আসেন আমার মেয়েটা ছোট’…।

এখন এইসব পড়ে যদি আপনার আবার বিশেষ যৌনসুখ অনুভূত হয় তাহলে অন্য কথা, না হলে দাঁড়ান ভাই, বুক বেঁধে দাঁড়ান। না হলে আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারবেন না কোনদিন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিজের মধ্যে ধর্ষক পুষে রাখবেন, নাকি দাঁড়াবেন, তা ভাবুন একবার।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ekta bhalo manush er joto bipod thakuk na keno kono kharap vasha taar mukh theke ber hobe na, ekta manush ke chinte etuku i onek shomai jothesto. apni jokhon jama poren tokhon ki bar bar tanen? na, karon ota shelai kore pora, apnar lojja lagbe oita khule porle, orna/hijab kintu aki bapar, ar er jobar apni kar kache chan? shahos thakle Allah ke bolen na hole Nastik hoe ja issa tai koren…apnar ischa, hya obosshoi SHOMAJ er kotha bolte paren, apni kon shomaje bash koren? apni jokhon jongole jaben nijeke protect korar chesta korben naki Animal der shatee ostro chara juddhe namben? nischoi eto boka apni na. tobe apni BOKA karon apnar lekha je porbe shee ekta jinsh clear bujhbe je apni Shibir ba porokkho vabe dhormer ke kottakho korchen…..Sister, jonglipona monovab Sibir ba onno shob celeder moddhe thakte pare, apni ba apnara jodi chesta koren deshe Islamic law ja ekmatro Shudi te ache, shekhaneo o dhorshon ache(oi je bollam jonglipona monovab…)tobe onek onek onek kom. Khamaka Allah’r biruddhe uthe pore legen na tate khoti i hobe, moron ke to thekate parchen na, parchen??? apni eka prothom shuru koren exactly islame ja boleche tai follow korte(ulta-palta koro kache na shune, nije Quran, hadid mane bujhe poren…ins sha Allah Allah apnake help korbe), Aj Tonu shudu eka na jara oi poshur haat theke bachte pareni tader kothao kothao golod chilo…Allah tader vul gulo khomo kore jannat bashi korun dua kori. Vul kichu likhle khoma kore dien.

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.