গাম্বিয়ায় নারী খৎনা নিষিদ্ধ

সুমন্দভাষিণী: নাইজেরিয়ার পর এবার গাম্বিয়ার নারীদের জয় হলো। শত শত বছর ধরে চলে আসা যৌনাঙ্গচ্ছেদ বা খৎনা (FGM)  থেকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে তাদের। নাইজেরিয়ার সরকার এই পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ ‘বেআইনী’ বলে ঘোষণা দেয়ার দিন কয়েকের মধ্যেই গাম্বিয়াতেও এটাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। আশা করা হচ্ছে, এই দুটো দেশের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আফ্রিকার অন্য দেশগুলোও নির্মম এই পদ্ধতি থেকে মুক্তি দেবে নারীদের।

FGMগত মঙ্গলবার গাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জামেহ এক ঘোষণায় মেয়েদের যৌনাঙ্গচ্ছেদনকে ‘বারবারিক ট্রাডিশন’ উল্লেখ করে অতিসত্বর একে ‘বেআইনী’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং যত দ্রুত সম্ভব একে কার্যকর করারও অঙ্গীকার করেন। মূলত এই এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া নারীদের বহুদিনের আন্দোলনের ফলেই আজকের এই সিদ্ধান্ত। জাহা ডুকরেহ তেমনই একজন, যার ছোটবেলায় এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। তিনি একে নিষিদ্ধ ঘোষণার আন্দোলনে নেমেছিলেন। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে একটি তথ্যচিত্র বানানোর জন্য অর্থ জোগাড় করেছিলেন।

গার্ডিয়ান পত্রিকাকে এক প্রতিক্রিয়ায় জাহা বলছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট যে শেষপর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে তিনি অভিভূত। একপর্যায়ে তিনি আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন নিজের দেশের জন্যই গর্ববোধ করছেন তিনি। জাহা আরও বলছিলেন যে, এই বিষয়টি হয়তো নজরেই আসতো না কখনও। কিন্তু এই মৌসুমটা হচ্ছে নির্বাচনের। প্রেসিডেন্টের জন্য এটা শাপে বর হবে। কারণ তিনি নারী ও মেয়েদের যেভাবে এগিয়ে রাখছিলেন তার কাজে, তাতে করে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারতো। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, তিনি জনগণের ভোট হারানোর চাইতেও নারীদের বিষয়ে বেশ যত্নশীল।

গাম্বিয়ার জাহা হয়তো তার আন্দোলনে সফল হয়েছেন, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার প্রায় ২৯টি দেশে এই প্রথা এখনও বিদ্যমান। কাজেই মাত্র দুটি দেশের সফলতা নিয়ে আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই নারী অধিকার কর্মীদের।১৩০ মিলিয়নেরও বেশি নারীকে এখনও এই নির্মমতার শিকার হতে হয়।

এই খৎনা করার প্রক্রিয়া অনেক কষ্টদায়ক। সাধারণত ছুরি অথবা ব্লেডের সাহায্যে মেয়েদের যৌনাঙ্গের পর্দা কেটে দেয়া হয়।এর ফলে প্রচুর রক্তক্ষরণ, মাতৃত্বের ক্ষমতা হারানো, এমনকি মৃত্যুও হয়।

FGM 2গত নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ফ্রন্টলাইন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্সদের এক সামিটে প্রায় ৮১টি দেশের ১১৮ জন কর্মী অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে আফ্রিকা থেকে আসা একজন কর্মী তাঁর বর্ণনায় বলছিলেন, কিভাবে কিশোরী বয়সে তাকে জোর করে খৎনা করানো হয়েছিল, এর ভয়াবহ যন্ত্রণা কেমন ছিল। বলতে বলতে তিনি কাঁদছিলেন, কাঁদছিল সব শ্রোতারাই। তিনদিন টানা রক্তপাত হয়েছিল তার, প্রায় রক্তের ওপরই তিনি পড়েছিলেন বলা যায়। সেই তিনি আস্তে আস্তে ক্ষত সেরে উঠলেও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি কোনদিনও। পরবর্তী জীবনে বিয়ে করলেও তার জন্য স্বামীসংসর্গ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তিনি তিষ্ঠোতে না পেরে তার মাকে জানিয়েছিলেন, লাভ হয়নি। এক পর্যায়ে নিজেই সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। গড়ে তোলেন এর বিরুদ্ধে আন্দোলন।

ইউনিসেফের মতে, এফজিএম হচ্ছে মেয়েদের মৌলিক অধিকার রঙ্ঘন, যা কিনা সামাজিক প্রথা হিসেবেই সিদ্ধ হয়ে আছে সমাজে। এটা যে একধরনের সহিংসতা, তা বোঝেই না অধিকাংশ পরিবার। এটা তারা করে থাকে মেয়েদের ভাল বিয়ে দেয়া, সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক সম্মান রক্ষার্থে। এসবই হয় নারীকে ঘিরে। কোনো পরিবার যদি এটা করতে অসম্মতি জানায়, তবে সামাজিকভাবে তাদেরকে হেয় করা হয়, একঘরে করা হয়, এমনকি নানারকম শাস্তির মুখোমুখিও হতে হয়।

নাইজেরিয়া এবং গাম্বিয়ার এই পদক্ষেপের খবরে চোখে ভাসছে ডাবলিনের সেই নারীর মুখটা। বর্ণনার সময় কেমন ব্যথা আর অসম্মানে কুঁকড়ে গিয়েছিলেন তিনি। পুরো অডিয়েন্সকে কাঁদিয়েছিলেন তিনি। আশা করি, একদিন মেয়েগুলো সবাই মুক্তি পাবে এই নরক যন্ত্রণা থেকে।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.