“নারীর পায়ের তলায় পুরুষের বেহেশত”

রুখসানা কাঁকন: মাথায় একটা দুষ্টামি চাপলো। ফেসবুকে স্ট্যাটাস  দিলাম ” নারীর পায়ের তলায় পুরুষের বেহেস্ত”। এক কথা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, তার কতটা ভিত্তি আমার জানা নেই। আর তাই মনে মনে কোন বিশ্বাস নেই। সেজন্যই দেয়া।

আল্লাহর ভয় আমার ভিতর আছে, খারাপ কাজ করলে আল্লাহ দেখেন এটা আমার মাথায় ঢুকেছে। বা বিপদে পড়লে বা কান্নাকাটি করলে আমি আল্লাহকে ডাকি, সত্যি বলতে কি ইসলাম ধর্ম ক্লাসে আমি যাও শিখেছি, হুজুরের কাছে আরবি বইয়ের এ মাথা- ও মাথা পড়েও আমি তার মানে বুঝিনি ।
তাই বলে আমি নাস্তিক? না আস্তিক? আমি নিজেই বুঝি না আমি আসলে কী! তবে আমি যে মানুষ এটা বুঝতে আমার বহু পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আমি ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু কখনও লিখি নাই ।
আমাদের মুসলমানরা এ বিষয়ে ভীষণ রকম সংবেদনশীল তা আমি জানি। ‘পুরুষের পায়ের তলায় নারীর বেহেশত’ এই কথাটি আমি শুনতে শুনতে হয়রান। ধর্মের বই তা লিখলেও আমার মানা সম্ভব … আর বানানো কথা হলে আমি এটা বুঝি যে, পুরুষের মনের ভেতর একথাটা বেশ ভালোভাবেই আছে বলে তা তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর আমাদের অশিক্ষিত, আধাশিক্ষিত, ধর্মান্ধ নারীরাও তা মেনে নিয়ে দিব্যি চলছে-ফিরছে।
নারী উচ্চতায়, আয়ে, কথায়, কাজে, সব সময় নিচু থাকবে, তাদের স্থান পায়ের তলায়।
সে পায়ের তোলা ফাটা হোক, বা গন্ধ ছড়াক, বা ময়লা-কুষ্ঠ হোক, পতিত-পাবন হোক, চরিত্রহীন, চোর হোক, তাতে কী !

Rukhsana Kakonপুরুষ নির্ধারণ করবে নারীর গতি। তাই নারীর ডিভোর্স হলে বা বর মরে গেলে বাবা-মা, পাড়া, প্রতিবেশী বা বন্ধু-সবারই এককথা, এখন কী হবে? কী নিয়ে বাঁচবে ও? সংসার চলবে কী করে?
বাচ্চা থাকলে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়, আহারে বাবা নাই, এতিম বাচ্চাটা!
আর মা, তুমি ওদের নিয়ে বাঁচো। আর যদি মারা যায় স্ত্রী? তাহলে এই লোকগুলোই সেই পুরুষটিকে বলে, আর কতকাল একা থাকবি বাবা? একটা সঙ্গী তো লাগে। আর যদি সেই ঘরে সন্তান থাকে, তাহলে তার জন্যও ‘নতুন মা’ আনার বন্দোবস্ত করা হয় স্ত্রী বিয়োগের ৪০ দিন না পেরোতেই। দুর্বিষহ করে তোলা হয় সেই সন্তানদের জীবন।  
অনেক পুরুষ তার উত্তেজনা কমানোর জন্য বউ চলে যাওয়া মাত্রই বউ খুঁজতে থাকে, তার কাছে স্ত্রী’র প্রয়োজন ওই যৌন সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ।

স্বামী তাদের বন্ধু হয় না কোনোদিন। এখন বলুন তো, আমার মত বেত্তমিজ আর কয়টা নারী আছে !!! কার পায়ের নিচে কার বেহেশত বাক্যটি উল্টে দিয়ে আমি মজা দেখলাম, কেউ কেউ বেশি কথা বলতে নিষেধ  করলো, কেউ বললো, মায়ের পায়ের নিচে ছেলেদের বেহেশত।
লজিক দেখালো এক মেয়ে, মেয়েরা মায়ের জাত। সুতরাং আমি মোটেও ভুল লেখি নাই।
এক পুরুষ যে কাজলা দিদি পড়ে, সে নাকি নারীদের আধুনিকতায় বিস্মিত !
আমরা যে সবাই মানুষ আরেকজন মনে করিয়ে দিলেন।

আসলে আমরা সবাই মানুষ। মেয়ে মানুষ শব্দটা শুনলে আমার জানি কেমন লাগে। অনেক ভদ্রলোকের মুখে শুনি, আরে ভাই ঘরের মেয়ে মানুষ নিয়ে ঝামেলায় আছি। আমাকে একজন উপদেশ দিলো, এসব না বলাই ভাল। কিন্তু আমি তো জানি, আমি যা লিখেছি, তা কেন লিখেছি?
পৃথিবীতে পুরুষের করা নিয়ম-কানুন উল্টে আমাদের কাছে এলে তোমাদের কেমন লাগবে? আমাকে এরপর বহু ধার্মিক মানুষ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে শুরু করলো। কারণ তারা ভাবলো আমি ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছি। আমাকে নসিহত করা দরকার।

আমি কী পরবো, আমি কী খাবো, কার সাথে মিশবো, আমি ভাল, না খারাপ, আমার বাচ্চা হবে কী হবে না, আমি চাকরি করবো নাকি ঘরে থালা ধোব, আমাকে হাতের ময়লা ভাববে না পায়ের ময়লা ভাববে! এভাবে বহু পুরুষ তার সংসার জীবনে কলকাঠি নাড়ছে। নিজ ঘরও হয়তো মুখ বুঁজে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

কিন্তু আমার স্ট্যাটাস উল্টে দিয়েছি বলে তাদের গা জ্বলে যাচ্ছে। তাই বলছিলাম কী, এখনো সময় আছে নিজেদের বদলাও। যেসব পুরুষ নারীকে সম্মান করে তাদের কিছু বলার নাই। আর যেসব পুরুষের রমনী বশীকরণের জন্য চিন্তার শেষ নাই,  তাদের জন্য বলি, একদিন ভয়ে আপনি চোখে অন্ধকার দেখবেন। এই দিন দিন না আরো দিন আছে।
আমিও মানুষ।
তুইও মানুষ।
বুঝলি পুরুষ?

রুখসানা কাঁকন ,টেলিকমুনিকেশন এক্সিকিউটিভ, ভিজবাডেন, জার্মানি

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাঁকন লেখাটা পড়ে ভাল লাগল । আমার নিজের মনের কথাগুলোই আপনি লিখেছেন। আমি পারিনি, আপনি পেরেছেন। পুরুষ বিশ্বাসঘাতক, প্রবঞ্চক ছাড়া বেশি কিছু নয়।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.