সুন্দরবনকে রক্ষা করতেই হবে, সাফ কথা

কাকলী তালুকদার: খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত এই সুন্দরবনকে ঘিরে আজ এক মহা ধ্বংসযজ্ঞের পরিকল্পনা চলছে। সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন আমাদের যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মায়ের আদরে আগলে রেখেছে, শত বিপর্যয়ে নিজের ক্ষতি মেনে নিয়েও সে বাঁচিয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষকে। ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরি সিডরই তার প্রমাণ। একইভাবে জীববৈচিত্র্য দিয়ে লাখো মানুষের জীবিকার আয়োজন করে দিয়েও দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।

Sundarbanসেই সুন্দরবন, যাকে আমরা প্রাকৃতিক প্রাচীর বলে থাকি, তাকে নি:শেষ করে দেয়ার পাঁয়তারা আজ প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। এখন শুধু তা কার্যকর হওয়ার বাকি। এতো প্রতিবাদ, এতো বিক্ষোভ, এতো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের পরও সরকারি মহলের টনক নড়ছে না।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে হাত দেয়া মানে শুধু বর্তমানের ক্ষতিই হয়, ধ্বংস হয়ে যাবে একটা পুরো জনপদ। প্রকৃতির ওপর হাত দিলে প্রকৃতিও তার প্রতিশোধ নিতে ভুলে না। কাজেই আমরা এক বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের দ্বারপ্রান্তে আজ।

দশ হাজার কিলোমিটার সুন্দরবন ভাগ হয়ে ৬২ ভাগ পড়েছে বাংলাদেশে, বাকী ৩৮ ভাগ ভারতে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে আমাদের সুন্দরবনকে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে সুন্দরবন হয়ে উঠেছে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রে।

২০০৪ সালের হিসেব মতে, সুন্দরবন প্রায় ৫০০ রয়েল বেঙ্গল টাইগার এর আবাসস্থল যা বিশ্বের বাঘের একক বৃহত্তম অংশ। রয়েছে ৩০হাজার চিত্রা হরিণ, কুমির, সাপসহ অনেক প্রাণী। এই প্রাণী বৈচিত্র্যের মধ্যে দুই প্রজাতির উভচর, ১৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৫ প্রজাতির পাখি এবং ৫ প্রজাতির স্তনপায়ী বর্তমানে হুমকির মুখে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে বুনো মহিষ, পারা হরিণ, বুনো ষাঁড়, ছোট ও বড় এক শৃঙ্গি গণ্ডার, বার শিংগা, চিতা বাঘ। আরো লুপ্ত হয়েছে সাদা মানিক জোড়া কান ঠুনি, বোঁচা হাঁস, গগন বেড়, জলার তিতিরসহ বিভিন্ন পাখি।
অব্যবস্থাপনার কারণে, জেলেদের কারেন্ট জাল ব্যবহার ও নিয়মিত পোনা ধরার কারণে অনেক মাছের বংশ বৃদ্ধি কমে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পরপর কয়েকটি তেলভর্তি ট্যাংকার ডুবে যাওয়ায় ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস তেলে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পরিমাপের কোনো যন্ত্র যেমন আমাদের নেই, তেমনি জাতীয়ভাবেও কোনো উদ্যোগ নেই। শোনা যায়, এসব তেল ট্যাংকারডুবির পিছনেও আছে রাজনৈতিক শক্তি।

আবারও বিপর্যয়ের আশঙ্কায় বন কর্মকর্তাসহ তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ,প্রাণ-প্রতিবেশ বিশেষজ্ঞরা  সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে এ নৌরুটটি বন্ধের দাবি জানিয়েছিলেন। লাভ কতটুকু হয়েছে, তা কারও অজানা নয়।  

kakoliসুন্দরবন যখন আমার রক্ষক
২০০৭ সালে সিডরের বহুমাত্রিক ক্ষয়ক্ষতি থেকে অনেকগুণ বাঁচিয়েছিল বাংলাদেশকে। নিজেকে তখন সে রক্ষা করতে পারেনি, একেবারে ন্যাড়া হয়ে গিয়েও মায়ের মতোন আগলে রেখেছিল আমাদের। পরবর্তীকে আবার সে নিজে থেকেই আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। এটাই এধরনের বনের বৈশিষ্ট্য। আর সেই প্রকৃতির ওপরই এখন আমরা আঘাত হানতে যাচ্ছি মানুষেরা। তৈরি হতে যাচ্ছে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২০ কিমি এর মধ্যে এ ধরণের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার বিধান নেই। অথচ রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবস্থান সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ।

আর এটা নির্মিত হলে গোটা এলাকার পরিবেশ, কৃষি, মৎস ও পানি সম্পদের উপর যে সকল নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা আমাদের চিন্তায় আনতে হবে।
বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করা হবে। এর ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নি:সরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নি:সরণ ইত্যাদি পরিবেশ আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম এর উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে ।
যা কিনা খোদ সরকারি ইআইএ রিপোর্টেই আশংকা করা হয়েছে।
প্রকল্পের জন্য ব্যবহ্রত যন্ত্রপাতি, যানবাহন, জেনারেটর, বার্জ ইত্যাদি থেকে তেল পুড়িয়ে ক্ষতিকর সালফার ও নাইট্রোজেন গ্যাস নির্গত হবে। নির্মাণ কাজের  সময় শব্দ দূষণ, কঠিন বর্জ্য তৈরি হবে যা সঠিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে পরিবেশ এর উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
এরপর আসি কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে। যদিও ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হবে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।

বাস্তবতা হলো, একটি ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পর্যায়ে ৪ হাজার অস্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিচালনা পর্যায়ে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে। যেখানে সুন্দরবনকে ঘিরে বর্তমানে ৪০ লক্ষ লোকের বসবাস এবং জীবন-জীবিকা।
কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনায় মূলত কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন লোকের কর্মসংস্থান হয় বলে এসব কর্মসংস্থানের খুব কমই স্থানীয় জনগণের জন্য নির্ধারিত হবে।
চার থেকে সাড়ে চার বছরের নির্মাণ পর্যায়ে বড় জোর মাটি কাটা, মালামাল পরিবহন, নির্মাণ কাজের শ্রমিক ইত্যাদি কিছু অস্থায়ী মজুরি ভিত্তিক কর্মসংস্থান জুটতে পারে স্থানীয় কিছু মানুষের।
কিন্তু পরিচালনা পর্যায়ে যে ৬০০ কর্মসংস্থান হবে তার বেশিরভাগই কারিগরী হওয়ার কারণে সেখানে খুব কম সংখ্যক স্থানীয় মানুষেরই কাজ জুটবে। তখন স্থানীয় বাকি মানুষগুলো উদ্বাস্তু হয়ে শহরকেন্দ্রিক হবে, সেই চাপ নেয়ার মতো কোনো শক্তিই মনে হয় আর শহরগুলোর নেই।

Sunderbans38ক্ষতিগুলো যদি একটু দেখি, তাহলে দেখবো, সাপমারী ও কৈগরদাসকাঠী মৌজায় ৮টি ইউনিয়নের ৪০টি গ্রামের ২ হাজার পরিবার এই প্রকল্পের কারণে ইতিমধ্যেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি জমি থেকে যাদেরকে উচ্ছেদ করা হয়েছে তাদের জীবন, জীবিকার পরবর্তী অবস্থান কী হবে?
বহু কৃষক জমি হারিয়ে আজ দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। যার নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে তাদের পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে।

বলা হচ্ছে, দূষণ প্রভৃতি রোধ করা সম্ভব হবে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে।

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে যার ফলে পরিবেশ আইন ১৯৯৭ এ বেঁধে দেয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার (প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এইসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে (প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি) যার ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতিসহ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে।

সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রে যেমন ১৪ কি.মি. দূরত্বের কথা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা চলছে, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফায়েত্তি কাউন্টিতে ১৯৭৯-৮০ সালে ১২৩০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সময়ও স্থানীয় মানুষকে এভাবে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো। এমনকি কিছুদিন পরে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ১৬৯০ মেগাওয়াটে উত্তীর্ণ করা হয়। ফলাফল সাথে সাথে বোঝা না গেলেও ৬৬ থেকে ১৩০ ফুট উঁচু বিশালাকৃতি পেকান বৃক্ষগুলো যখন একে একে মরতে শুরু করলো ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।
এবং এই ক্ষতিকর প্রভাব কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এমনকি ৪৮ কিমি দূরেও পৌঁছে গেছে।( তথ্যসূত্র-রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র যে কারণে সুন্দরবনের জন্য বিপদজনক, কল্লোল মোস্তফা, ইস্টিশন)

কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৪৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূতি ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে, কারণ এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। (সূত্র: রামপাল ইআইএ)
river-in-sundarbansভয়ংকর ব্যাপার হলো, একদিকে বলা হয়েছে এই বিষাক্ত ছাই পরিবেশে নির্গত হলে ব্যাপক দূষণ হবে, অন্যদিকে এই ছাই দিয়েই প্রকল্পের মোট ১৮৩৪ একর জমির মধ্যে ১৪১৪ একর জমি ভরাট করার কথা বলা হয়েছে! এই বর্জ্য ছাই এর বিষাক্ত ভারী ধাতু নিশ্চিতভাবেই বৃষ্টির পানি সাথে মিশে, চুইয়ে প্রকল্প এলাকার মাটি ও মাটির নীচের পানির স্তর দূষিত করবে যার প্রভাব শুধু প্রকল্প এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
উৎপাদিত বর্জ্য ছাই সিমেন্ট কারখানা, ইট তৈরি ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা ইআইএ রিপোর্টে বলা হলেও, আসলে কোন কারখানায় এর আদৌ কোন ব্যবহার হবে এরকম কোন নিশ্চিত পরিকল্পনা করা হয়নি।

বড় পুকুরিয়ার মাত্র ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেই উৎপাদিত ছাইয়েরই উপযুক্ত ব্যবহার বাংলাদেশে হচ্ছে না। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত দৈনিক ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্য ছাই কোন সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহারের বদলে ছাইয়ের পুকুর বা অ্যাশ পন্ডে রেখে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটানো হচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য যে ছাইয়ের পুকুরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এটি পশুর নদীর তীরেই তৈরি করা হবে। যার কারণে মাটি, পানি, বাতাস মারাত্মক দূষিত হয়ে সুন্দরবনের সকল প্রাণীজগত, মানুষ ও  উদ্ভিদ এর উপর ধংসযজ্ঞ নেমে আসবে।
তার চারপাশের জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জেলে, কৃষক, বাওয়ালী, মৌয়াল সহ কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকা ধ্বংস হয়ে যাবে, সেই সাথে দূষিত হবে তাদের জীবন।

অন্যান্য দূষণকারী শিল্প স্থাপনা ও ভূমি দস্যু-
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আরেকটি ক্ষতিকারক দিক হলো, এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে আরো বিভিন্ন ধরণের দূষণকারী শিল্প স্থাপনা গড়ে উঠবে। এরই মধ্যে একটি প্রকল্প সুন্দরবন থেকে মাত্র ১২ কিমি দূরে ওরিয়ন গ্রুপের ৫৬৫ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়ে গেছে, যা কিনা সুন্দরবনকে ক্ষতির দিকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দিচ্ছে।
আমাদের আরেকটি ক্ষতিকারক কার্যক্রম ভূমি দখল। সরকারী, বেসরকারী, রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ সিদ্ধহস্তে এই কাজটি করে থাকেন। বাংলাদেশের পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, বিধর্মীদের সম্পত্তি দখল এখন সংস্কৃতির চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ভূমি দখলের মহোৎসব এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে সুন্দরবনকে ঘিরে।

সুন্দরবন ও ভারত  সরকারের অবস্থান-
ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চাচ্ছে, সেই ভারতেরই পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ইআইএ গাইড লাইন, ২০১০ এ স্পষ্ট বলা আছে-  ভারতের পরিবেশ মন্ত্রাণলয়ের গাইড লাইন অনুসারে নগর, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণি অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কিমি সীমার মধ্যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ এড়িয়ে চলতে হবে।
অথচ সেই ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকেই বাংলাদেশে সুন্দরবনের এত কাছে পরিবেশ দূষণকারী কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে।
যে বিষয়টি তাদের নিজের দেশে প্রয়োগ করা যাবে না ক্ষতির কারণে সেই বিষয় প্রয়োগ করা হচ্ছে পাশের দেশ বাংলাদেশে।
একমাত্র মুনাফার বিষয়টি এখানে মূল বিষয় হয়ে কাজ করছে।

বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান-
এই সুন্দরবন বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ। যেখানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় রাম পাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর দিকগুলো সরকারকে অবহিত করার পরও সরকার সেই মন্ত্রণালয়কে তোয়াক্কা করছে না।

এদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ‘ম্যানগ্রোভ বন’ সুন্দরবনের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর আশংকা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। সরকারের বরাবরে দেয়া এক চিঠিতে ইউনেস্কো বলেছে, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল ও বনসংলগ্ন এলাকায় দূষণকারী শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে ‘অসামান্য এবং বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ’ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ বিপন্ন হবে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে শ্বাসমূলীয় এই বনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকার ব্যর্থ হলে বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান হারাবে সুন্দরবন। বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা থেকে এর নাম গিয়ে উঠবে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যে’র তালিকায়।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা কমিটির ব্যানারে দেশের সর্বস্তরের জনগণ, বিভিন্ন সংগঠন একাত্মতার মাধ্যমে প্রতিটি  সরকারের দেশ বিরোধী কাজের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখছে।
বর্তমানে সরকারের রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান পরিবর্তনসহ সুন্দরবনকে ঘিরে উঠা ওরিয়ন গ্রুপের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান পরিবর্তনের কমিটি তার আন্দোলন অব্যাহত রাখছে।
আগামী ১৫ মে-এর মধ্যে সুন্দরবন ধ্বংসকারী বিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধের জন্য সরকারকে সময় দিয়েছেন তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

অথচ বিশ্বের বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একক বৃহৎ স্থান হিসেবে সুন্দরবন হতে পারে প্রাণী কূলের অভয়ারণ্য।
ডলফিন,পাখি, উদ্ভিদ, সকল প্রাণী, ও মৎস বিষয়ক পর্যবেক্ষণ, পাঠ ও গবেষণার ক্ষেত্রে সুন্দরবন হয়ে উঠতে পারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পাঠশালা।

অথচ আমরাই নিজ হাতে নদীনালা ভরাট করে, বনাঞ্চল ধ্বংসের মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংস করে কংক্রিটের দেশে পরিণত করছি আমাদের সবুজ শ্যামল দেশকে।
সাফ সাফ কথা হলো, দেশের এত বড় সম্পদ  ধ্বংস করে সুন্দরবনে আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চাই না। যেকোনো মূল্যে এটা রোধ করতেই হবে।
ঘর যদি আমাদের চার দেয়ালের নিরাপত্তার প্রতীক হয়, সুন্দরবন আমাদের দক্ষিণের জানালা অথবা প্রাকৃতিক প্রাচীর। এই দেশ আমাদের,এই সুন্দরবন আমাদের, ভাবতে হবে আমাদেরকেই।
(তথ্যসূত্র- সুন্দরবন উইকিপিডিয়া, কল্লোল মোস্তফা-ইস্টিশন, বাঁচাও সুন্দরবন-ফেইসবুক)

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রাকৃতি সৌন্দর্যের অপূর্ব লিলাভুমি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। এর পাশেই সাতছড়ি চা বাগান। কয়েক বছর আগেও চা বাগানে ছিল বড় বড় ছায়াবৃক্ষ আর চায়ের সবুজ পাতায় ভরপুর। প্রকৃতি প্রেমিরা সাতছড়ি চা বাগান এলাকায় ঘুরতে গেলে এক নজর ঘুরে আসত চা বাগান। চা বাগানের আশপাশ ঘিরে গড়ে উঠেছিল পিকনিক স্পষ্ট।

কিন্তু সম্প্রতি চা বাগানের শর্ত ভঙ্গ করে চায়ের বদলে সবজি চাষ শুরু করার ফলে বদলে গেছে চা বাগানের দৃশ্যপট। সবুজে আচ্ছাদিত চা গাছগুলোও যেন হারিয়ে গেছে। এখন বাগানের সেকশন ধ্বংস করে তৈরী করা হচ্ছে কৃষি জমি। তৈরীকৃত কৃষি জমিগুলো দেওয়া হচ্ছে গোপন উপ-ইজারা।

বাগান কর্তৃপক্ষ কে ম্যানেজ করে বাইরের লোকজন সাতছড়ি চা বাগানের ১নং সেকশনের প্রায় অর্ধশত বিঘা জমিতে চা গাছ ধ্বংস করে সবজি চাষের জমি তৈরী করছে। প্রতি বিঘা জমি গোপনে অর্থের বিনিময়ে ইজারা দিচ্ছে বাগান কর্তৃপক্ষ। নীতিমালা অনুযায়ী চা বাগানের ভিতর অন্য কোনো ফসল করার নিয়ম না থাকলেও বাগান কর্তৃপক্ষ নীতিমালা ভঙ্গ করে এ কার্যক্রম চালিয়ে আসলেও স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে করে বাগান কর্তৃপক্ষ আরো বেপরোয়া হয়ে পড়েছে।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.