আগল ভেঙে বেরিয়ে আসো সব নারী

সাকিনা হুদা: সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে- এরকম একটা ভ্রান্ত প্রবাদ শুনে বড় হয়েছি। যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন এটি আমাদের ক্লাসে লিখতে দেয়া হয়েছিল। সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলাম। অনেকের বাড়িতে দেখতাম কথাটি সুন্দর করে ফুল-লতা-পাতার মাঝে সূচিশিল্পের মাধ্যমে বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে। সেই শিল্পটি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম।

Sakina Huda
সাকিনা হুদা

বড় হয়ে মনে হয়, আদৌ আমি এই কথাটির প্রতি বিশ্বস্ততার জন্য লেখার মধ্যে তার প্রমাণ দেই নাই। লিখতে ভালোবাসি বলেই মিথ্যে কথাটির ভাব সম্প্রসারণ করেছিলাম। আবার এও ঠিক যে, এতো কিছু বিশ্লেষণ করার মতো বয়স আমার তখন হয়নি। তাই একটি ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বড় হয়েছি।

বড় হয়ে আমি দেখলাম, এর চেয়ে ভুল কথার ভাব সম্প্রসারণ আর নেই। আত্মীয়-পরিজন বন্ধুবান্ধব কারো জীবনের কোথাও এই দর্শনের যথার্থতার প্রমাণ পেলাম না। জীবনের পথপরিক্রমায় দেখলাম, নারীর ঔদার্য্যে, নারীর শ্রমে সংসার রমণীয় হতে পারে ঠিকই, কিন্তু পুরুষ নারীর কোমলতার সুযোগ নিযে জীবনকে বিষময় করে তুলতে পারে।

পুরুষ শৈশব থেকেই একটি ভুল ধারণা নিয়ে বড় হয় যে, সে কর্তা। সংসারে তার দাবি, তার অধিকার আগে। পুরুষ প্রভু, স্ত্রীর ভূমিকা অনেকটা সেবাদাসীর মত।

কিছুদিন আগেও মেয়েরা সেভাবে বাইরে কাজ করতো না। তারা সম্পূর্ণ গৃহিনী হয়ে থাকত। এখনও ঘরের যাবতীয় কাজ শেষ করে বাইরেটা সামাল দিতে হয় মেয়েদের। যেসব স্ত্রীরা ঘরে থাকেন, বেশিভাগ ক্ষেত্রে স্বামীরা মনে করেন, তিনি আয় করেন, তাই সংসার সামলানোর দায়িত্ব স্ত্রীর। ছুটির দিনে স্বামী ছুটি ভোগ করেন ঘুমিয়ে, বই পড়ে, গান শুনে, টিভি দেখে, বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিয়ে। স্ত্রীর জন্য স্বামীর ছুটির দিন কোন আনন্দ বয়ে আনে না। এদিনে তাকে অনেক বাড়তি কাজ করতে হয়। তার জীবনের কিছুটা সময় তার নিজের জন্য ব্যয় করার সময় হয় না। কারণ সে উপার্জনে অক্ষম একজন গৃহবধূ মাত্র।

মেয়েরা ছোটবেলা থেকে মা-চাচী-দাদী এদেরকে এভাবেই দেখে আসে। এবং পুরুষকে ভয় করতে শেখে। মেয়েটি বিয়ের পর স্বামীকে ভয় পায়। এই দুর্বল মানসিকতা নিয়ে সে সংসারে পা রাখে, তার উপরে নেমে আসে দায়িত্ব পালনের খড়গ। স্বামীকে সন্তষ্ট করার কৌশল।
গায়ের কালো রং, পরিবারের আর্থিক দৈন্যতা, মেয়েদের বিয়ের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা এই সমাজে। আমাদের দেশে খুব কম পরিবার আছে, যেখানে যৌতুকের মাধ্যমে বিয়ে হয় না। যৌতুকের ওপর নির্ভর করে মেয়ের বিয়ে ভাগ্য। আজকাল ধনী অভিজাত পরিবারগুলো্য় যৌতুক দেয়া হয় কৌশলে। মেয়ের বাবা মা বলেন, মেয়েকে খুশি করতে দিয়েছি। ছেলেপক্ষ বিগলিত সুরে বলে, আদর করে দিয়েছে।

লক্ষ টাকা যৌতুকের বিনিময়ে কালো মেয়ের বিয়ে হয়। কিন্তু কালো মেয়ের ভাগ্যে কখনও আলো জ্বলে না। শিক্ষিত উচ্চপদস্থ স্বামীর মনেও দুঃখ থেকে যায়, বউ তার কালো। কালো রংয়ের জন্য স্ত্রী নিগৃহীত হয়। গোপনে চোখের পানিতে বালিশ ভেজানো ছাড়া কালো মেয়ের আর উপায় কী?
আমি দেখেছি, বেশিরভাগ পুরুষের মধ্যে কর্তা হয়ে থাকার একটি কুৎসিত অভিলাষ লুকিয়ে থাকে। যখনই তার ব্যতিক্রম হয়, কোন স্ত্রী যদি স্বাধীনচেতা হয়, প্রতিবাদ করে, তখনই শুরু হয় নির্যাতন। একটি হৃদয়হীন পুরুষ আর তার অভব্য আত্মীয়-স্বজন জানে নির্যাতন কত প্রকার হতে পারে। অনেক মেয়ে নির্যাতন সহ্য করে। যৌতুকের জন্য, কালো রংয়ের জন্য, সংসারের কাজ ঠিকমতো না করার জন্য, পিতামাতা দরিদ্র হওয়ার জন্য, এসব নানা কারণ থাকে নির্যাতনের। এটি তার বহিরাবরণ। ভিতরে মনের ক্ষত তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে।

সংসারের পুরুষরা অনায়াসেই চরিত্রহীন হতে পারে। এটি যেন তার জন্মগত অধিকার। বংশ পরম্পরায় পাওয়া। স্ত্রীর প্রতিবাদ করা চলবে না। স্বামীর অভিভাবকরা বলেন, পুরুষরা ওরকম একটু-আধটু করেই থাকে। তাই বলে কি ডিভোর্স দিতে হবে? কী চমৎকার যুক্তি!
আমি দেখেছি, কী সুন্দর সাজানো সংসার। স্বামী সময়মত অফিসে যাচ্ছে, ছেলেমেয়েরা স্কুলে কলেজে। স্ত্রী সংসারের কাজ সুচারুভাবে করে যাচ্ছেন। কোথাও কোন ছন্দপতন নেই। হঠাৎ সেই সংসারে শোনা গেল স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। কারণ স্বামীর চরিত্রহীনতা।
মেয়েদের মনে অনেক স্বপ্ন থাকে। মনের সমস্ত কোমলতাই নৈপূণ্য সে ঢেলে দেয় তার সংসারে। এটাকে সবাই কর্তব্য বলে মনে করে। তার কোন মূল্যায়ন হয় না। কর্তব্যের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় তার ওপর। তখনই শুরু হয় মানসিক দ্বন্দ্ব। শুরু হয় শারিরীক নির্যাতন। এভাবেই ভেঙ্গে যায় মূল স্তম্ভটি।
আমাদের দেশে চিকিৎসকরা যখন জানতে পারেন গর্ভবতী নারীর মেয়ে সন্তান হবে, তখন আত্মীয়স্বজনদের কাছে তা গোপন রাখা হয়। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে। প্রথম সন্তান মেয়ে জন্মালে অনেকের মনে দু:খ বয়ে আনে।
এরকম হাজারো সমস্যার সমাধান খুঁজি আমি। সমাধান কখনও সোজা পথে আসে, কখনও বাঁকা পথে। সমাধান পেতে হলে নির্ভীক হতে হয়। স্বাবলম্বী হতে হয়। শিক্ষিত হতে হয়।
এ জীবন আমার। সেই জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার আর কারো নেই। মেয়েদের জীবনের এ লড়াই সবচেয়ে বড় লড়াই। এ লড়াইয়ে যে জিততে পারবে, সে মানুষের মত সুন্দরভাবে বেঁচে থাকবে। এ কথাটি সব নারীর জীবনের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।

শেয়ার করুন:
  • 22
  •  
  •  
  •  
  •  
    22
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.