সুশীলা নারীর সুশীল জীবন

রুখসানা কাঁকন: বড় হওয়ার সাথে সাথে আমার চারপাশের মানবকূল এমনকি বহু রমনীকূলের কাছে গল্প শুনতাম, জানিস অমুকের বউ খুব ভাল, আর তমুকের বউ খুব খারাপ। মানে বুঝতে বুঝতে আমার নিজের একদিন বউ হবার সময় হয়ে গেল।

একদিন আমি এই সমাজ সংসারে ভালো বৌ এর সংজ্ঞা বুঝে ফেললাম।
এক কথায় ভাল বউ সুকুমারের কবিতার মতো করে বলা যায় :

Rukhsana Kakon
রুখসানা কাঁকন

“কাউকে যে কাটে না
করে নাকো ফোঁসফাঁস
মারে নাকো ডুসডাস “

মানে ভালো বউ হতে হলে আওয়াজ কম হতে হবে।

” আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে ” -এই লাইনটির একরকম মানে করলে স্বামীর পদতলে থাকার কথা ধরা যায়।
আমার এক কলিগ ছিলেন স্কুলে যে সকালে উঠে তার স্বামীকে প্রণাম করতেন। একদিন স্বামী তাকে এক লাথি দিয়ে অন্য মেয়ে নিয়ে চলে গেছিল। আমি যখন বলেছিলাম এসব কী দিদি, তার ইগোতে আঘাত লেগেছিল।  

ভাল বউ রান্না করে, সেলাই করে, স্বামীর কথা মতো বাইরে যায়, নামাজ-পূজা করে, আরে রাতে  লাইট অফ করে স্বামীর বিশেষ অঙ্গ উত্তোলিত হলে তাকে ঠাণ্ডা করে, সকালে নাস্তা বানায়, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠায়, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।  

এমন ভাল বউ যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশী মাতৃভক্ত কিছু পুরুষকূল খুঁজে  ফিরেছেন।  কবি সাহিত্যিকরা “সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে লিখে ” নারী জাতিকে সুপার গ্লু দিয়ে ট্যাগ করে গেছেন, আর এই ট্যাগ ছুটাতে যে পথ নারী জাতিকে পাড়ি দিতে হচ্ছে, আর কিছু সুবিধাবাদী পুরুষকুল ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানিতে’ থেকে তথাকথিত ভাল বউ খুঁজে বেড়াচ্ছে।  
ভাল বউ মানে সুশীলা ভদ্র হবে, আক্ষরিক অর্থে বলি যে বউ কোনো দিন সেক্স করেনি মানে বউ হতে হবে কুমারী। অথচ একজন মানুষ কুমারী থাকবে কী থাকবে না সে তার নিজস্ব  স্বাধীনতা।  

“ঘুমিয়ে থাকে সতী নারী বাঙালি পুরুষের অন্তরে”। আর কিছু পুরুষ হয়তো তাদের সতীত্ব  ১৮ বছর বয়সে কাজের মেয়েটিকে জোর করে ধর্ষণ করে বিসর্জন দিয়েছে।  
এই অভাগা পুরুষ জাতি তাই ডিভোর্সি নারী দেখলে তাকে গন্ধ নারী বলেই ভাবা শুরু করে। আর তাদের সাথে কিছু নারী সেই সুশীলা নারী হবার চেষ্টা করে যায়।   
“মারো পিটাও তুমি যাই কর ” তাদের ভাব হল আমি তো সুশীলা নারী হয়ে আছি , আমি তোমার লক্ষী পক্ষী সোনা বউ।  
আমাকে অনেক পুরুষ বলেছে, “বাইরে যত মজা মারি, ঘরে আমার ভাল বউ আছে সে শুধু আমার”। আর সেই বউটি যে একটি মানুষ রোবট নয়, এই পুরুষ চক্রটি যেন ইচ্ছা করেই তা ভুলতে চায়। এই সব পুরুষেরা বাইরে নারী জাতিকে তাদের ভাষায় নষ্ট-গন্ধ করে নিজের ঘরে দেবী-সরস্বতী চায়।
আগের দিনে কুমারীত্ব পরিক্ষা করা হতো রক্ত মাখা চাদর দেখে, এখন কিছু পুরুষ স্পর্শ করেই নাকি বুঝে ফেলে সে মেয়েটি কুমারী নাকি। কোনো বৌ এর সেক্স তাড়না বেশি হলে তো বিপদ।  তারা নারীর বুক, দন্ত আর মুখের মাপ দেখে বুঝে ফেলে সে আগে কারো বিছানায় গেছে কীনা।
পুরুষের গর্ভধারণের সম্ভাবনা নাই, তাই তাদের যেখানে-সেখানে ঘুমিয়ে কুমার সাজার দরকার পরে না।

বউ থাকবে বিছানায়, তার নিজের অধিকারে সে তাকে রাত দুপুরে ঘুম থেকে তুলুক, পেটে বেবি থাকা অবস্থায় হোক,  না হয় সারাদিন খেটে ঘুমিয়ে যাওয়া মানুষটাকে জাগিয়ে হোক, এমনকি অসুস্থ থাকলেও .. সুশীলা বৌ, তোমার স্বামীর শিশ্ন দাঁড়িয়েছে, তাকে ভাল রাখার দায়িত্ব তোমার। তোমার স্বামী ঘুমাতে পারছে না, তাকে শান্ত (?) করে ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব তো স্ত্রীরই। নাহলে সে স্ত্রী কেন? বজ্জাত এসব পুরুষের হৃদয় থাকে না, থাকে এক সদা উত্তেজিত শিশ্ন।
বহু নারী আছে যারা বিছানায় অরগাজমের অভিনয় করে। বৌ এর আত্মতৃপ্তি বলে যে  কিছু আছে, তা অনেক পুরুষই বোঝে না। এমনকি তাদের শিশ্নের আকার বড় না ছোট, তা স্ত্রীকে কতোটা আনন্দ দিতে পারছে, সেই ধারও ধারে না, তাদের কাজ শেষ তো পাশ ফিরে নাক ডেকে ঘুমাক।
মানসিক কষ্টে ভুগতে ভুগতে সন্তানের সংখা বাড়ে সুশীলা নারীর, আর জীবনও চলতে থাকে। অনেকটা ব্যাঙের জীবনচক্রের মত। সুশীলা নারীর জীবন নিয়ন্ত্রিত।

কেমন আছেন আপনি? উত্তর আসতে হবে, ভাল আছি। আমার মনে হয় ঐ তথাকথিত সুশীলা নারীদের জন্যই পুরুষজাতি আজ আস্কারা পেয়ে মাথায় উঠেছে, তারা না বলতে শেখেনি. খারাপ জেনেও দিনের পর দিন তা সুনিপূণভাবে একই নিয়ম পালন করে যাচ্ছে জীবনভর। যেন এটাই জীবন, এর বাইরে আর কোনো পৃথিবী নেই।
নারী যতো আধুনিকই হোক না কেন, ঐ সুশীলা ভাবের বাইরে যেতে পারবে না। এমন মেয়ে জানি সে তার নিজের আয় করা টাকা স্বামীর হাতে তুলে দেয়, তার একদিন সাহসও হয় না তার গরীব বাবাটিকে সাহায্য করার। ওদিকে তার স্বামী নির্দিষ্ট করে, কোন টাকা কোথায়, কোন খাতে ব্যয় হবে।  
অথচ এমন বিয়ে করার চেয়ে বিয়ে না করা যে ভালো, তা এখনও ঠিক মেনে নিতে পারছে না বাঙালি মেয়েরা। ২০ বছর পার হওয়া মেয়েটি আইবুড়ি নামক কুৎসিত বিশেষণে ভূষিত হয়।
যে মা তার ছেলেকে গল্প বলে, তোর জন্য লাল টুকটুকে বউ আনবো, আর একই  মা মেয়েকে বলে, রাজপুত্র তোকে নিয়ে চলে যাবে। অথচ সেই মা-ই চাপে পড়ে মেয়েকে টাকাওয়ালা, বুড়া, কুৎসিত দর্শন পুরুষের হাতে তুলে দেয়। সে থলথলে হোক, আর যৌন ক্ষমতা থাকুক বা না থাকুক, গাড়ি আর বাড়ি হলেই চলে। সে হচ্ছে বাঙালি মা-বাবার রাজপুত্তরের বাংলা ভার্সন।

বিদেশে এক ছেলে মদ খেয়ে পড়ে থাকতো রাস্তার মোড়ে, বাংলাদেশ থেকে সুশীলা নম্র মেয়ে বিয়ে করে আনলো। কেমনে? কেমন করে তার মা-বাবা ওই কুৎসিত দর্শন ভয়ঙ্কর রাজপুত্রের হাতে তুলে দেয়? আমাকে সব সময় ভাবায়।
বিদেশে থাকার সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে দেশী ছেলে বিয়ে করে আনে এমন হাজার সুশীলা নারী।  বাপ-মা তাদের পরিচয় জানতে চায় না, শুধু বিদেশে থাকতে পারাটাই তার এতো দিনের  যোগ্যতা হিসাবে ধরা হয়।

অনেক পুরুষকে বলতে শুনেছি, আমি আমার বউকে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছি। তাদের কাছে আসলে তাদের বউ তাদের স্বাধীনতা বিক্রি করে দেয়। তারা বিকিনি পর্বে, না হিজাব পর্বে, একটা করে করে নিজে চিন্তা স্বামীর উপর ছেড়ে দেয়।
অনেক মেয়ে আমাকে বলে, তারা নাকি জীবনে প্রেম করে নাই, বিয়ের আগে পুরুষ দেখা যেন পাপ।

বিদেশের এসে আলো বাতাসে কোনো মেয়ের চোখ খুলে গেলে “আমি যে আন্ধারের বন্দিনী ” থেকে মুক্তি পেলে সে হয়  রাস্তার  মেয়ে পুরুষের  চোখে।
লন্ডন গিয়ে দেখলাম সুশীল  শিক্ষিত নারীরাই কুটনামি করছে কোন রমনী  তালাকপ্রাপ্ত  তা নিয়ে। তাদের কাছে ফেসবুক ব্যবহার খুব খারাপ কাজ। শুঁটকির গন্ধে কেউ কেউ  জীবনের  আরেক দিক ভুলতে বসেছে।

আগে চাল ধোয়া হাতের নারী ভালো লাগতো, এখন লাগে জিন্স পরা আয় করা বউ। কিন্তু   পুরুষের আসল রিমোট কন্ট্রোল তাদের হাতে।
তবে পুরুষ কী ভাবে না ভাবে, তাতে কী আসে যায় হে সুশীলা নারী…..সবার আগে নিজেকে মানুষ ভাবো। ভাবো তোমার আত্মসম্মান আছে কিনা?

রুখসানা কাঁকন

টেলিকমুনিকেশন এক্সিকিউটিভ

ভিজবাডেন, জার্মানি

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.