স্যানিটারি প্যাড এবং আমরা

তামান্না স্বর্ণা: হলে থাকায় একা চলাফেরায় রীতিমত অভ্যস্ত হতে হয়। এ নিয়ে আমার কখনো অস্বস্তি কাজ করে না। এমনও হয়েছে একা আমি মেয়ে আশেপাশে কোন মেয়ে নেই আমি বিনা দ্বিধায় কাজ করে গেছি। অস্বস্তিটা হয় স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গেলে। এখনও এই যুগে এসেও আমাদের মুখ-মাথা কাঁচুমাচু করে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই জিনিসটি কিনতে হয়। 

Napkinকেনার সময় দোকানদার ও আশেপাশের লোকজনের চেহারা বদলে যায়। তারা যেন ব্যাপক বিনোদনের উৎস খুঁজে পায়।

একদিনের ঘটনা মেট্রোর opposite এ একটা ওষুধের দোকান আছে। এক আংকেল প্যাড কিনছে, আমিও কিনছি। আংকেলকে দোকানি স্বাভাবিকভাবে প্যাড দিল, আমি চাইতেই তার কী জানি হলো কতো কিছু মনে পড়ে গেল এবং আমার সামনে বলে গেল।

আমি প্রাণপণে চেষ্টা করছি স্বাভাবিক থাকার, আর সে তার মতো পাশের জনের সাথে রসালো আলাপ করেই যাচ্ছে। আমি কোনো মতে সেখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচি।

রিকশায় উঠে মনে হলো, আমি কেন লজ্জা পাচ্ছি? এ লজ্জা তো আমার নয়। যে রজঃস্রাব এ আবৃত থেকে যে পৃথিবীর মুখ দেখেছে তার প্রতি এত অবজ্ঞা, এত হীনতা!!!! তারা নপুংসক নয়তো কি?????

কেস ২: আমার রুমমেট,  মেধায়, বুদ্ধিতে কারও চেয়ে কোন ছেলের চেয়ে কোন অংশে কম না। ঝামেলা বাঁধে তার ঋতুস্রাবের সময়। একে তো থাকে হলে, আর প্রচণ্ড মুখচোরা।  তাই স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সময় সে অকুল পাথারে পড়ে। আশেপাশের দোকানে যেতে লজ্জা পায়, তাই রিক্সা নিয়ে অন্য কোন জায়গা থেকে প্যাড কিনে নিয়ে আসে। তার যুক্তি হলো, ওই লোক তাকে বাজে ইংগিত করলেও তাকে তার প্রতিদিন দেখতে হবে না, তাই এই অপমান ভুলে থাকতে পারবে। এক-একদিন সে ফেরত এসে প্রায় কেঁদেই ফেলে। মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ার লজ্জায় সে মাটিতে মিশে যায়।

কেস ০৩: ক্লাস শেষ। আমার অনেকদিন পর পর  পিরিয়ড হয় তাই অনেক দিন থাকে, আর প্রচুর ব্লিডিং হয়। স্বাভাবিকভাবেই আমি খুব দুর্বল হয়ে পড়ি। তো আমি আস্তে আস্তে হাঁটছি। আমার এক ক্লাসমেট কোন এক কারণে আমাকে দেখে অতি উৎসাহিত হয়ে উঠলো।  কিরে তোর কী হইসে, আস্তে আস্তে হাঁটতেছিস কেন? আমি বললাম, এমনি। সে বলে, কেন কিছু হইছে নাকি? তার কন্ঠে কৌতুক ঝরে পড়ছে।

সেইদিন বুঝলাম অর্ধেক শিক্ষিত দোকানদার আর বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ এর এই জাতীয় শিক্ষার্থীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তাদের একটাই পরিচয়, তারা পুরুষ। নারীদেহ তাদের প্রধান আকর্ষণ।  

নারীর নারীত্বকে সম্মান দেয়ার সামর্থ্যহীনতাকে তারা অবজ্ঞা দিয়ে ঢেকে রাখতে চেষ্টা করে। তারা কি জানে তারা নিজেও নিজের অস্তিত্বকে অপমান করছে?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.