বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যর্থতার প্রামাণ্য দলিল

15-august-1975লীনা পারভিন: সাংবাদিক, লেখক এবং আমার স্বল্প দেখার অনেক প্রিয় একজন বড় ভাই জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল ভাইয়ের লেখা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে বইটি কিনেছিলাম বইমেলা থেকে। গতকাল বাসায় ফিরেই সময় নিয়ে বসেছিলাম বইটি পড়ার জন্য।

আমি বিশেষ কোন সমালোচক বা বিশ্লেষক নই। একজন নগণ্য পাঠক হিসাবেই যদি বইটি পড়ার একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই তাহলে এক কথায় আমি বলতে পারি, লেখকের টার্গেট পাঠক ছিলো নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে যারা ৭৫ এর পর জন্ম নিয়েছে এবং জাতির জনকের ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানে না, কিন্তু জানার একটি ঐতিহাসিক দায় তাদের উপর বর্তায়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি সম্পূর্ণ সার্থক বলেই মনে করি। অত্যন্ত সরল এবং সাবলীলভাবে তিনি কিছু ফ্যাক্টস এন্ড ফাইন্ডিংস তুলে ধরেছেন। নিজের কোনো পাণ্ডিত্য তিনি জাহির করার চেষ্টা করেননি। এমনিতে আমাদের ছোটরা বই পড়তে চায় না, কঠিন কিছু হলেতো আরো না তার মধ্যে ইতিহাস পড়তে গেলেই সবার যত কষ্টের কাহিনী।

একটি ভূখণ্ডের জন্মের মাত্র চার বছরের মাথাতেই জাতি দেখেছে সর্বকালের সবচেয়ে নিষ্ঠুরতা, হারিয়েছে তাদের প্রাণপ্রিয় জনক ও নেতা শেখ মুজিবর রহমানকে।

বইটি পড়ার পরই আমি আমার দুই ছেলেকে বলেছি, বাবা বইটি তোমরা পড়তে পারো, তাহলে জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনেক কিছু জানতে পারবে। আমি নিজেও অনেক কিছু জেনেছি এর থেকে।

অনেক বছরের কিছু সুপ্ত প্রশ্ন ছিলো মনে এই বইটি পড়ার পর সেই প্রশ্নের ভিত্তি আরো শক্ত হয়েছে আমার। একজন দেশপিতা যিনি এ জাতিকে একটি দেশ উপহার দিয়েছেন তার নেতৃত্ব দিয়ে, তার নিরাপত্তায় কতটা গাফিলতি থাকলে তিনি তার সবচেরে কাছের মানুষদের হাতে খুন হতে পারেন এ প্রশ্নের ভিতর লুকিয়ে আছে অনেক ইতিহাস এবং প্রশ্নের উত্তর, তার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যত এবং বর্তমানের প্রস্তুতি।

তখন প্রকাশ্যে খুনিরা মহড়া বা রেকি করেছিলো প্রস্তুতি হিসাবে, অথচ তখনকার সময়ের গোয়েন্দা বাহিনী তার কিছুই জানতো না। আসোলেই কি জানতো না? নাকি অন্য কিছু? প্রশ্ন থেকে যায় এখানে। শেখ মুজিব সেনাপ্রধানের কাছে সাহায্য চাইলেও মেলেনি তার প্রাপ্য নিরাপত্তা। কিন্তু কেন? সেনাপ্রধানের সামরিক দুর্বলতা না ব্যক্তিগত দুর্বলতা?

আরেকটি বড় প্রশ্নের সমাধান আজো পায়নি জাতি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরপরই সেনাপ্রধানের দায়িত্বে আসেন মেজর জিয়া। কেন? এমন হাজারো প্রশ্নের উদয় হবে এই বইটি পড়লে। একজন লেখকের দায়িত্বই হচ্ছে সমাজে প্রশ্নের আবহ তৈরি করা। মরা জাতিকে জাগিয়ে তোলা। পথের সুলুক সন্ধানে বাধ্য করা।

আমি মনে করি এই কাজটি লেখক অত্যন্ত ভালো এবং দক্ষভাবেই করতে পেরেছেন। আজকের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়গুলি নিয়ে যখন চারপাশে চলছে বিতর্ক, তখন নতুন প্রজন্মের কাছ একটি স্বচ্ছ ইতিহাস থাকাটা যেকোনো সমাজ এবং দেশের এগিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যতম জরুরি বিষয়।

সবশেষে জুয়েল ভাইকে আমি অবশ্যই ধন্যবাদ দিব যে তিনি ইতিহাস নিয়ে লিখার সাহস দেখিয়েছেন, চাইলে তিনি অনায়াসেই সুখ্যাতির অনেক শর্ট-কাট পথে যেতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই আমাদেরকেও আবদ্ধ করেছেন।

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.